এইসব আলোচনা থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে, যেখানে আদিম মানুষের আচরণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন হাজার হাজার বছর ধরে অপরিবর্তিত ছিল, সেখানে সেপিয়েন্সরা তাদের কল্পিত বাস্তবতার ধারণার সাহায্যে মাত্র এক কি দুই দশকের মাঝে তাদের সমাজ-কাঠামো, তাদের মধ্যকার সম্পর্কের ধরন, তাদের অর্থনৈতিক কার্যপ্রণালী এবং আরো অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আমূল বদলে দিতে পেরেছিল। বার্লিনের একজন অধিবাসীর কথা ধরা যাক। ধরি, তিনি ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করে মোটামুটি ১০০ বছর বেঁচে ছিলেন। সেক্ষেত্রে তিনি সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেলম এর হোহেনজোলেরন রাজ্যে (Hohenzollern Empire of Wilhelm II) তাঁর বাল্যকাল অতিবাহিত করেছেন, তাঁর তারুণ্য এবং পরিণত বয়স কেটেছে উইমার প্রজাতন্ত্রে (Weimar Republic), হিটলারের শাসনাধীন জার্মান রাষ্ট্রে এবং পরে সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানিতে। অবশেষে তিনি মারা গেলেন গণতান্ত্রিক এবং একীভূত জার্মানিতে। তিনি তাঁর জীবনকালে অনেকগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশীদার হলেন, পরিবর্তিত হলো তাঁর আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কের ধরন, যদিও পুরো সময় ধরে তাঁর জিনগত পরিচয় ছিলো পুরোপুরি অপরিবর্তিত।
এই নতুন নতুন গল্প তৈরির মাধ্যমে দ্রুত বদলানোর ব্যাপারটিই ছিলো সেপিয়েন্সদের সফলতার মূলমন্ত্র। একজন সেপিয়েন্সের সাথে একজন নিয়ান্ডার্থালের সম্মুখ যুদ্ধে সম্ভবত সেপিয়েন্সই পরাজিত হবে। কিন্তু, শত শত নিয়ান্ডার্থালের সাথে শত শত সেপিয়েন্সের যুদ্ধ হলে সেখানে নিয়ান্ডার্থাল এর জয়ের কোন সম্ভাবনা নেই। নিয়ান্ডার্থালরা হয়তো সিংহ আসার সংকেত অন্যদেরকে জানাতে পারত, কিন্তু তাদের পক্ষে গোত্রের রক্ষাকারী দেবতার গল্প বলা এবং সে গল্প পরিবর্তন করে আবার বলা অসম্ভব ছিল। গল্প বানাতে না পারার কারণে, ‘কল্পিত বাস্তবতা’ তৈরি করতে না পারার কারণে নিয়ান্ডার্থালদের পক্ষে বড় গোষ্ঠী বা দল আকারে কাজ করা অসম্ভব ছিলো এবং একই কারণে তারা দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে তাদের নিজেদের সামাজিক আচরণ বদলে ফেলতেও অসমর্থ ছিলো।
যদিও কোন নিয়ান্ডার্থাল এর মাথার ভেতর ঢুকে বোঝা সম্ভব না যে তারা কীভাবে চিন্তা-ভাবনা করতো, তবু পরোক্ষ কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে সেপিয়েন্সদের তুলনায় তাদের বুদ্ধিভিত্তিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা খানিকটা আঁচ করা যায়। কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ ইউরোপের প্রাণকেন্দ্রে ৩০,০০০ বছর আগেকার সেপিয়েন্সদের বসতির জায়গাগুলোতে খননকাজ চালাবার সময় ঘটনাক্রমে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিছু সামুদ্রিক ঝিনুক এর সন্ধান পান। খুব সম্ভবত এই সামুদ্রিক ঝিনুকগুলো বিভিন্ন সেপিয়েন্স গোষ্ঠীর মাঝে দূরপাল্লার বাণিজ্যের ফলেই ইউরোপে আসে। নিয়ান্ডার্থালদের মাঝে এরকম কোনো দূরপাল্লার ব্যবসা বাণিজ্যের নজির পাওয়া যায়নি। তাদের প্রতিটা গোষ্ঠী বা দল নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেরাই তৈরি করে নিত হাতের কাছের উপকরণ দিয়ে।৪

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আরেকটি উদাহরণের কথা ধরা যাক। নিউ গিনির উত্তর দিকে, নিউ আয়ারল্যান্ডের একটি দ্বীপে সেপিয়েন্সদের একটি গোষ্ঠী বসবাস করতো। তারা আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা শীতল হয়ে তৈরি হওয়া ‘অবসিডিয়ান’ (obsidian) নামের একপ্রকার আধা-স্ফটিক পদার্থ (volcanic glass) দিয়ে অপেক্ষাকৃত শক্ত এবং ধারালো যন্ত্রপাতি তৈরি করতে জানতো। নিউ আয়ারল্যান্ডে প্রাকৃতিকভাবে কোন অবসিডিয়ানের মজুদ থাকবার কথা না। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় প্রমাণ মেলে যে তারা যেই ধরনের অবসিডিয়ান ব্যবহার করতো তা ৪০০ কিলোমিটার দূরে নিউ ব্রিটেনের একটি দ্বীপ থেকে আনা। তার অর্থ এই নিউ আয়ারল্যান্ডের দ্বীপের কিছু লোক অবশ্যই দক্ষ নাবিক ছিলো যারা সঠিকভাবে দিক নির্ণয় করে দূরের দ্বীপগুলোর সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারত।৫
ব্যবসা-বাণিজ্যকে একটি স্বাভাবিক দরকারি কাজ হিসেবেই মনে হতে পারে, যার জন্য কোন কল্পনা বা কল্পিত গল্পের দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইতিহাসে সেপিয়েন্স বাদে আর কোনো প্রাণীর ব্যবসা-বাণিজ্য করার কোনো নজির পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে বিস্তারিত সাক্ষ্য-প্রমাণ মেলে যে, সেপিয়েন্সরা সেকালে এমন জিনিসেরই ব্যবসা করত যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য নয় বরং যেসব দ্রব্যের সাথে সম্পর্ক আছে কেবল বানিয়ে তোলা গল্পের। দুই জন লোকের মাঝে ব্যবসার জন্য দরকার পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। মানুষের স্বভাব হলো একজন অচেনা লোককে সে সহজেই বিশ্বাস করতে পারে না। সে কারণে দুইজন অচেনা লোকের মাঝে আস্থা তখনই গড়ে ওঠে যখন তারা দুজনই তৃতীয় কোনো কিছুর কল্পিত অস্তিত্বে বিশ্বাস করে অর্থাৎ একই ‘কল্পিত বাস্তবতা’র অংশীদার হয়। আজকের দিনে দুনিয়াজোড়া চেনা, অচেনা এতসব মানুষের মাঝে এত ধরনের ব্যবসার ভিত্তি হলো ‘ডলার’, ‘ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক’ এবং ‘সংস্থার পরিচয়বাহী ছবি বা লোগো’- এসবের কল্পিত অস্তিত্বে বিশ্বাস। আদিমকালেও ব্যাপারটা অনেকটা এরকমই ছিলো। যখন দুটো আদিম গোষ্ঠী বা দলের দুইজন মানুষ একে অপরের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করতে চাইত তখন তাদের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি হতো একই ঈশ্বরে বা একই কল্পিত পূর্বপুরুষে, একই গোত্রদেবতায় বা একই পবিত্র প্রাণীতে স্থাপিত বিশ্বাস।