জিনোমকে ল্যাং মেরে
শুধুমাত্র কথা দিয়ে কল্পিত বাস্তবতা তৈরির ক্ষমতা অনেকগুলো অচেনা মানুষকে একসাথে কাজ করার একটা অভাবনীয় ক্ষমতা এনে দিয়েছে মানুষের হাতে। কিন্তু এর আরও অনেক সুদূরপ্রসারী প্রভাবও আছে। যেহেতু বড় আকারের মানব সংগঠনগুলো কল্পিত গল্পের ভিত্তিতে চালিত হয়, গল্প পরিবর্তন করার মাধ্যমে মানুষের সাথে মানুষের আচরণের ধরনও পাল্টে ফেলা সম্ভব। কোনো কোনো সময়ে গল্পগুলো অনেক দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের জনগণ বলতে গেলে রাতারাতিই ‘রাজা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী’ এরকম গল্পে বিশ্বাস হারিয়ে ‘জনগণ সর্বময় ক্ষমতার উৎস’ এরকম একটি গল্পে বিশ্বাস করতে শুরু করে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পর থেকে মানুষ ক্রমাগত তার চাহিদার পরিবর্তন অনুযায়ী তাদের নিজেদের পারস্পরিক যোগাযোগ বা আচার-আচরণের পদ্ধতি পালটে ফেলেছে। এভাবেই সূচনা হয়েছে সাংস্কৃতিক বিবর্তন নামের একটি দ্রুতগামী প্রক্রিয়ার যা জিনগত বিবর্তনের মতো অত ঢিমেতালের নয়। এই দ্রুতগামী সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ট্রেনে চড়ে সেপিয়েন্সরা খুব দ্রুত পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে সেপিয়েন্সদের অন্যান্য প্রজাতি এবং অন্যান্য প্রাণীদের থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেল।
অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আচরণের অনেকটাই জিনগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তবে কেবলমাত্র ডিএনএ (DNA) প্রাণীদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায় এমনটা বলাও ঠিক হবে না। প্রাণীদের আচার-আচরণের পেছনে পরিবেশগত উপাদান এবং ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিরও প্রভাব বিদ্যমান। কিন্তু, তা হলেও, একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে একটি প্রজাতির সকল প্রাণী মোটামুটি একই রকম আচরণ করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে জিনগত পরিব্যক্তি (Genetic mutation) ছাড়া বড় কোনো আচরণগত পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায় না। যেমন, শিম্পাঞ্জির জিনগত স্বভাব হলো তারা একটি স্তরভিত্তিক গোত্র বা গোষ্ঠী আকারে থাকবে যার নেতৃত্ব দেবে ‘আলফা পুরুষ’। শিম্পাঞ্জিদের কাছাকাছি আরেকটি প্রজাতি হল বোনোবো (Bonobo)। এদের সমাজ অনেকটা সাম্যবাদী ও মাতৃতান্ত্রিক। নারী বোনোবোর একটি দল এদের নেতৃত্ব দেয়। সাধারণ বোনোবোরা কখনো প্রতিবেশীদের সাথে দল বেঁধে একটি নারীবাদী বিপ্লব গড়ে তোলে না। পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা কখনো একটি সংসদ ভবনে একত্রিত হয়ে আলফা পুরুষের অফিস ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় না এবং ঘোষণা করে না – আজ থেকে সকল শিম্পাঞ্জি সমান। সকলের অধিকার সমান। এরকম কিছু কেবলমাত্র তখনই ঘটতে পারে যদি শিম্পাঞ্জির ডিএনএতে কোন পরিবর্তন হয়।
ঠিক একই কারণে অনেক প্রাচীন কালের সেপিয়েন্সদের মাঝেও বিপ্লবের কোনো ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায় না। আমরা যতদূর জানি, তাতে মনে হয়, প্রাচীন মানুষের সমাজকাঠামোর পরিবর্তন, নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং নতুন নতুন অভ্যাসের পেছনে সাংস্কৃতিক উদ্যোগের চেয়ে বেশি দায়ী ছিলো জিনগত পরিব্যক্তি এবং পারিপার্শ্বিক চাপ। এই কারণেই, এসব কাজ করতে মানুষের হাজার হাজার বছর লেগে গেছে। দুই মিলিয়ন বছর আগে, জিনগত পরিব্যক্তির কারণে ‘হোমো ইরেক্টাস’ নামে একটি প্রজাতির উদ্ভব হয়েছিলো। এই প্রজাতির উদ্ভবের হাত ধরেই পৃথিবীতে এসেছিলো পাথরের হাতিয়ার তৈরির প্রযুক্তি। মূলত পাথরের তৈরি এইসব হাতিয়ার এবং সরঞ্জামকেই এই প্রজাতির সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য বলে ধরা হয়। যতদিন পর্যন্ত হোমো ইরেক্টাসের আর কোনো বড় ধরনের জিনগত পরিব্যক্তি না হলো, ততদিন পর্যন্ত এই পাথরের হাতিয়ারগুলোর প্রকৃতি এবং প্রযুক্তি মোটামুটি অপরিবর্তিত অবস্থায়ই ছিলো এবং এই অপরিবর্তিত থাকার সময়কাল ছিলো মোটামুটি ২০ লক্ষ বছর!
অপরদিকে, বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পর থেকে, সেপিয়েন্সরা খুব দ্রুত তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়; কোনো জিনগত বা পরিবেশগত পরিবর্তন ছাড়াই তারা পরিবর্তিত আচরণের বিধান পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। এর একটা বড় উদাহরণ হতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে কিছু সম্ভ্রান্ত মানুষের সন্তানহীন থাকবার প্রথা। ক্যাথলিক চার্চের পুরোহিত, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং বিধান অনুসারে নপুংসক হওয়া চীনের সম্ভ্রান্ত শাসকবর্গের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। প্রাকৃতিক বিবর্তনের মূলনীতি অনুসারে সমাজে এই ধরনের মানুষ যারা সন্তান উৎপাদন করে না তাদের যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবার কথা নয়। যেখানে শিম্পাঞ্জির ‘আলফা পুরুষ’ তার ক্ষমতা ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব নারী শিম্পাঞ্জির সাথে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হয় এবং নিজে দলের অনেক বাচ্চা শিম্পাঞ্জির বাবায় পরিণত হয়, সেখানে ক্যাথলিক ‘আলফা পুরুষ’ (ক্যাথলিক পুরোহিত বা যাজক) সম্পূর্ণরূপে যৌন সংসর্গ এবং সন্তান প্রতিপালনের মতো বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকেন। কোনো পরিবেশগত কারণে (যেমন খাদ্য সংকট) যে তিনি সন্তান উৎপাদন থেকে নিজেকে বিরত রাখেন এমনটা নয়। এমনটাও নয় যে কোনো জিনগত তারতম্যের কারণে তিনি এমনটা করতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্যাথলিক চার্চ শত শত বছর হলো টিকে আছে- সেটা বন্ধ্যাত্বের জিন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তর করে নয়, বরং টিকে আছে খ্রিস্ট ধর্মের নতুন নিয়ম (New Testament) এবং ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের আইন-কানুন (Catholic canon law) এর গল্প এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরের মাধ্যমে।
