কিন্তু শুধু নিয়ান্ডার্থালেই থেমে থাকলে চলবে কেনো? এরপর কী আমরা চাইব না ঈশ্বরের বানানো মানুষের নকশা তৈরির খেরোখাতায় হাত রাখতে আর সেই নকশার উন্নতি ঘটিয়ে উন্নততর সেপিয়েন্স তৈরি করতে? মানুষের সবরকম সামর্থ্য, চাহিদা এবং কামনার একটি জিনগত ভিত্তি বিদ্যমান এবং মানুষের জিনগত পরিচয় নেংটি ইঁদুরের থেকে খুব বেশি জটিল নয়। ইঁদুরের জিনোমে ২৫০ কোটি নিউক্লিওবেস থাকে, যেখানে মানুষের জিনোমে থাকে ২৯০ কোটি বেস, তার মানে মানুষের জিনভিত্তিক পরিচিতির তালিকা ইঁদুরের জিনভিত্তিক পরিচয়ের থেকে মাত্র ১৪ শতাংশ বড়।১১ বর্তমান শতকের মাঝামাঝি সময়ের দিকে অর্থাৎ আর মাত্র কয়েক দশক পরে জিনগত প্রকৌশল এবং জৈব প্রকৌশলের অন্যান্য শাখাগুলো কেবল যে আমাদের মনস্তত্ত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রত্যাশিত আয়ু বাড়ানোর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করবে তাই নয়, মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক এবং আবেগিক দক্ষতার পরিবর্তনেও এদের থাকবে উল্লেখযোগ্য অবদান। জিনগত প্রকৌশল যদি চৌকস ইঁদুর তৈরি করতে পারে তবে চৌকস মানুষ তৈরিতে বাধা কোথায়? আমরা যদি একজন সঙ্গীতে সন্তুষ্ট নেংটি ইঁদুর তৈরি করতে পারি, তবে একজন মানুষও তার একগামিতা নিশ্চিত করতে জিনগত পরিবর্তনের এই সুযোগ নেবে না কেনো?
বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব হোমো সেপিয়ন্সের মনস্তত্ত্ব কিংবা মস্তিষ্কের বাহ্যিক আকার আকৃতির কোনোরকম দৃশ্যমান পরিবর্তন ছাড়াই সেপিয়েন্সের মত একটি গুরুত্বহীন নরবানর প্রজাতিকে পৃথিবীর প্রভুতে পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে, এই বিশাল পটপরিবর্তনের জন্য মস্তিষ্কের কাঠামোর কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনই যথেষ্ট ছিল। এরকম আরেকটি ছোটখাটো পরিবর্তনই হয়তো একটি নতুন বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের সূচনা করবে, তৈরি করবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বুদ্ধিমত্তা বা চেতনা, আর হোমো সেপিয়েন্স নামক প্রজাতিটির খোলনলচে পুরোপুরি পালটে দিয়ে তৈরি করবে ভিন্ন ধরনের কোন প্রজাতি।
একথা সত্য, এইসব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধিভিত্তিক উৎকর্ষ আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি, কিন্তু ভবিষ্যতের ‘অতিমানব’ তৈরির পথে আমাদের সামনে দুর্লঙ্ঘ্য কোন প্রযুক্তিগত বাধাও দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। মূলত দার্শনিক এবং রাজনৈতিক যুক্তি-তর্ক এবং বাধাগুলোই মানুষকে নিয়ে গবেষণার গতিকে খানিকটা মন্থর করেছে। এ সংক্রান্ত দার্শনিক দাবিগুলো যতই যুক্তিসঙ্গত হোক, মানুষের সামনে যদি দীর্ঘতর জীবন, জীবনঘাতী রোগের চিকিৎসা এবং তার বুদ্ধিভিত্তিক এবং আবেগিক দক্ষতা বৃদ্ধির মূলা ঝোলানো থাকে, তবে এসব দার্শনিক বাধা মানুষ নিয়ে গবেষণাকে খুব বেশি বিলম্বিত করতে পারবে বলে মনে হয় না।
কী ঘটবে যদি আমরা যদি স্মৃতিভ্রষ্টতাজনিত অসুখ আলঝেইমার এর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এমন কিছু আবিষ্কার করে ফেলি যা সুস্থ মানুষকে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দিতে পারে ? মানুষের পক্ষে কি তখন এই সংক্রান্ত গবেষণা স্থগিত রাখা সম্ভব হবে? একবার যদি এই চিকিৎসা আবিষ্কার হয়েই যায়, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কি পারবে সুস্থ একজন মানুষকে এই চিকিৎসা নিয়ে অতিমানবীয় স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়া থেকে বিরত রেখে কেবল আলঝেইমার রোগীদের মাঝেই তার ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে?
জৈব-প্রকৌশল সত্যিই পৃথিবীর বুকে আবার নিয়ান্ডার্থালদের ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা সে ব্যাপারটি এখনও অনেকটাই অস্পষ্ট, তবে এটি খুব সম্ভবত পৃথিবীতে হোমো সেপিয়েন্সের নাট্যমঞ্চের যবনিকা টেনে দেবে। না, হোমো সেপিয়েন্সের জিনগত পরিবর্তন যে তার দৈহিক মৃত্যু ঘটাবে এমনটা নয়। কিন্তু, জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা হয়তো হোমো সেপিয়েন্সকে এতটাই পাল্টে ফেলবো যে তখন আমাদেরকে হোমো সেপিয়েন্স বলে ডাকাটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
যান্ত্রিক জীবন
আরেকটি নতুন প্রযুক্তি জীবনের প্রচলিত নিয়মকানুনকে পাল্টে দিতে পারে, সেটা হলো- সাইবর্গ প্রকৌশল (cyborg engineering)। সাইবর্গ হলো মানুষ এবং যন্ত্রের মিশেলে গড়া একপ্রকার প্রাণী, যেমন ধরুন কৃত্রিম হাতওয়ালা মানুষ। আজকের দিনে আমরা সকলেই কমবেশি চশমা, কৃত্রিম হৃদযন্ত্র, পা সোজা রাখার যন্ত্র এমনকি কম্পিউটার আর মোবাইলের সাহায্যে (শেষের দুটি আমাদের মস্তিষ্কের উপর থেকে বাড়তি কাজের বোঝা কমায়) আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়েছি বা ইন্দ্রিয়গুলোর উপর চাপ কমিয়েছি। সে অর্থে আমরাও কমবেশি বায়োনিক (bionic) মানুষ। আমরা এখন সাইবর্গে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি, যখন অজৈব অংশগুলো আমাদের শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে এবং বদলে দেবে আমাদের কর্মক্ষমতা, ইচ্ছা, ব্যক্তিত্ব এবং স্বকীয় পরিচয়।
“ডিফেন্স এ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (DARPA)” নামে একটি আমেরিকান গবেষণা সংস্থা কীটপতঙ্গকে সাইবর্গ বানানোর চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো মাছি বা তেলাপোকার শরীরে ইলেকট্রনিক চিপ, সনাক্তকারী যন্ত্র এবং প্রসেসর বসানো যার মাধ্যমে মানুষ বা কোন যন্ত্রচালিত অপারেটরের পক্ষে দূর থেকে এসব কীটপতঙ্গের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এবং পতঙ্গগুলোকে তথ্য সংগ্রহ এবং সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এরকম একটি মাছি সহজেই শত্রুঘাঁটির হেডকোয়ার্টারের দেয়ালে বসে শত্রুদের গোপন পরিকল্পনার কথা শুনে ফেলতে পারবে এবং মাকড়সা বা অন্য কোন পতঙ্গ মাছিটিকে খেয়ে না ফেললে সেসব তথ্য সহজেই প্রতিপক্ষের শিবিরে সরবরাহ করতে পারবে।১২ ২০০৬ সালে আমেরিকার “নেভাল আন্ডার সি ওয়ারফেয়ার সেন্টার (NUWC)” সাইবর্গ হাঙর তৈরির ঘোষণায় জানায়- ‘NUWC মাছের মাথায় প্রতিস্থাপনের জন্য একটি ট্যাগ বা যন্ত্র বানাচ্ছে যার কাজ হবে মাছের মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।’ এ প্রকল্পের উদ্যোক্তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে তারা হাঙরের প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত চৌম্বকক্ষেত্র সনাক্ত করার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সাগরের তলদেশে সাবমেরিন এবং চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বোমা সনাক্ত করতে সক্ষম হবেন। হাঙরের এই সনাক্তকরণ ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে সেটা মানুষ নির্মিত যে কোন সনাক্তকারী যন্ত্রের থেকে অনেক ভালো ফলাফল দেবে।১৩
