ফলশ্রুতিতে, জিনগত প্রকৌশলের অপার সম্ভাবনার কণামাত্রই আমরা বর্তমানে ব্যবহার করতে পারছি। মূলত উদ্ভিদ, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং পোকামাকড়ের মত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন জীবগুলোকেই বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের অন্ত্রে বসবাসকারী ই-কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার কথা কথা ধরা যাক। অতীতে ই-কোলাই এর সংক্রমণে অনেক নানারকম রোগ-ব্যাধি দেখা গেলেও বর্তমানে এর জিনগত রূপান্তরের মাধ্যমে জৈব জ্বালানী তৈরিতে একে ব্যবহার করা হচ্ছে।২ ই-কোলাই এবং ছত্রাকের কিছু জাতকে রূপান্তরের মাধ্যমে ইনসুলিন তৈরি উপযোগী করে তোলা গেছে।৩ যার ফলে কমানো সম্ভব হয়েছে ডায়াবেটিস চিকিৎসার খরচ। মেরু অঞ্চলের মাছের একটি জিনকে আলুর জিনে সংযুক্ত করার ফলে সম্ভব হচ্ছে শীত সহিষ্ণু আলুর জাতের উদ্ভাবন।৪
এছাড়া কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীকে এই জিনগত প্রকৌশলের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিবছর ম্যাসটাইটিস (mastitis) নামের একটি রোগের কারণে গবাদিপশু শিল্পের কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়। ম্যাসটাইটিস রোগটি দুধ প্রদানকারী গাভীর ওলানের রোগ। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে রূপান্তরিত জিনের গরুদের নিয়ে গবেষণা করছেন যাদের দুধে থাকবে লাইসোস্ট্যাফিন (lysostaphin), একটি জৈব রাসায়নিক যা ম্যাসটাইটিস রোগের জন্য জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে।৫ ইদানীং সবাই শুকরের মাংসে থাকা অস্বাস্থ্যকর চর্বির ব্যাপারে সচেতন হওয়ায় শুকরের মাংসের ব্যবসায়ীরা বিপদে আছেন। তাদের জন্য সুখবর হলো, বিজ্ঞানীরা বর্তমানে একটি পরজীবী পোকা থেকে নেয়া জিন শুকরের শরীরে স্থাপন করে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। পরীক্ষা সফল হলে এই নতুন জিন শুকরের মাংসের ক্ষতিকর ওমেগা ৬ ফ্যাটি এসিডকে তার উপকারী জ্ঞাতিভাই ওমেগা ৩ এ রূপান্তরিত করতে পারবে।৬ আর মানুষের শুকরের মাংস খাওয়া নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা থাকবে না।
জিনগত প্রকৌশলের পরবর্তী প্রজন্মে উপকারী চর্বি সম্বলিত শুকর তৈরির ব্যাপারটি ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়াবে। জিন বিজ্ঞানীরা কেবল যে পরজীবীদের গড় আয়ু ছয় গুণ বাড়িয়েছেন তাই নয়, তারা চৌকস ইঁদুর তৈরিতেও সক্ষম হয়েছেন যাদের স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতা সাধারণ ইঁদুরের থেকে অনেক বেশি। নেংটি ইঁদুর হলো ছোট লেজ ওয়ালা, নাদুস-নুদুস ইঁদুরের একটি প্রকরণ এবং এদের বেশির ভাগ প্রজাতিরই যৌনতার ক্ষেত্রে কোন বাছবিচার নেই।৭ কিন্তু বিজ্ঞানীরা নেংটি ইঁদুরের এমন একটি প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন যারা বিপরীত লিঙ্গের মাত্র একজনের সাথে দীর্ঘস্থায়ী এবং বিশ্বস্ত যৌন সম্পর্ক বজায় রাখে। বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন তারা ইঁদুরের এই একজনের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য দায়ী জিনকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। একটি স্বেচ্ছাচারী, বহুগামী নেংটি ইঁদুরের শরীরে এই জিনটি সংযুক্ত করা হলে সে যদি একটি একগামী, স্ত্রী অনুরক্ত নেংটি ইঁদুরে পরিণত হয়, তখন ‘জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কেবল ইঁদুর ও মানুষ নতুন শারীরিক বৈশিষ্ট্যই অর্জন করে না বরং এর মাধ্যমে তাদের সামাজিক কাঠামোও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব’ এমনটা দাবি করাটা কি খুব বেশি অসংগত হবে?৮
ফিরে আসবে নিয়ান্ডার্থাল
কিন্তু জীনবিজ্ঞানীরা কেবল জীবিত প্রাণীকুলের পরিবর্তন সাধন করতে চান এমনটা নয়। তারা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদেরও উদ্ধারের চেষ্টা করেন। জুরাসিক পার্ক সিনেমার ডাইনোসরই যে উদ্ধার তালিকার একমাত্র সদস্য এমনটা নয়। রাশিয়া, জাপান ও কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি সাইবেরিয়ার বরফে জমে থাকা একটি প্রাচীন ম্যামথের জিনের সম্পূর্ণ গঠন জানতে পেরেছেন। বর্তমানে তারা আজকের দিনের একটি হাতির নিষিক্ত ডিম্বাণু নিয়ে, তার মধ্যে হাতির ডিএনএ কে নতুন তৈরি ম্যামথের ডিএনএ এ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চাচ্ছেন। এরপর এই প্রতিস্থাপিত ডিএনএ এর ডিম্বাণুকে তারা হাতির গর্ভে স্থাপন করবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২২ মাস পর গত ৫০০০ বছরের মধ্যে প্রথম ম্যামথের জন্ম হবে পৃথিবীতে।৯
কিন্তু, মানুষ কেবল ম্যামথেই সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জ চার্চ সম্প্রতি প্রস্তাব করেছেন, নিয়ান্ডার্থাল জিনোম প্রজেক্ট যেহেতু সম্পন্ন হয়েছে, আমরা এখন চাইলেই ম্যামথের মত একটি নবগঠিত নিয়ান্ডার্থাল ডিএনএ সংযুক্ত একটি ডিম্বাণু মানুষের গর্ভাশয়ে স্থাপন করতে পারি। আর এটা করতে পারলে গত ত্রিশ হাজার বছরের মধ্যে পৃথিবী প্রথমবারের মত একটি নিয়ান্ডার্থাল শিশুর মুখ দেখবে। চার্চ দাবি করেছেন মাত্র ত্রিশ মিলিয়ন ডলার পেলেই তিনি এই কাজের দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন। কয়েকজন নারীও এই কাজের জন্য স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে তাদের গর্ভাশয় ব্যবহারের সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।১০
কিন্তু এতদিন পর নিয়ান্ডার্থাল দিয়ে আমরা কী করব? অনেকে দাবি করেন, আমরা যদি সত্যিকারের, জীবিত নিয়ান্ডার্থাল নিয়ে গবেষণা করতে পারি তবে হোমো সেপিয়েন্সের স্বাতন্ত্র্য বা অসাধারণত্ব নিয়ে বহু বছর ধরে চলে আসা অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর আমরা দিতে পারব। একটি নিয়ান্ডার্থালের সাথে একটি হোমো সেপিয়েন্সের মস্তিষ্কের তুলনা করে আমরা হয়তো বুঝতে পারব কোন জৈবিক প্রক্রিয়া আমাদের অনুভূতি, চেতনা এসবের জন্য দায়ী। এবং এখানে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতারও ব্যাপার আছে। অনেকেই দাবি করেন হোমো সেপিয়েন্স তথা আমরাই নিয়ান্ডার্থালদের বিলুপ্তির জন্য দায়ী। সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তাদের নতুন করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও আমাদের উপরই বর্তায়। আজকের মানুষের সমাজে নিয়ান্ডার্থাল অন্যভাবেও সহায়ক হতে পারে। অনেক শিল্পপতিই তাদের কারখানায় নিয়ান্ডার্থালদের নিতে চাইবেন। কারণ, তারা হয়তো একজন নিয়ান্ডার্থালকে বেতন দেয়ার মাধ্যমে তাকে দিয়ে দুইজন সেপিয়েন্সের সমান কাজ করিয়ে নিতে পারবেন।
