সেপিয়েন্স নিজেও ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে সাইবর্গে। কানে শোনার সহায়ক যন্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক গুলোকে অনেক সময় ‘বায়োনিক কান’ নামে অভিহিত করা হয়। এই যন্ত্রগুলো কানের সাথে যুক্ত করা হলে তারা কানের বর্হিভাগ থেকে একটি মাইক্রোফোনের সাহায্যে শব্দ শোনে। তারপর যন্ত্রটি শব্দকে ছেঁকে এর থেকে মানুষের শব্দকে সনাক্ত করে এবং সেই শব্দকে তড়িৎ সংকেতে রূপান্তরিত করে সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় শব্দবাহী স্নায়ুতে পাঠিয়ে দেয়, সেখান থেকে এই সংকেত সরাসরি পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে।১৪
“রেটিনা ইমপ্ল্যান্ট” নামে সরকারি অনুদানে চলা একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান চোখে বসানোর জন্য একটি কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করছে যেটি অন্ধ মানুষকে আংশিক দৃষ্টি দিতে সহায়তা করবে। দৃষ্টিহীন মানুষের চোখের ভিতরে বসানো হবে একটি ছোট মাইক্রোচিপ। এই মাইক্রোচিপে বসানো আলোক সংবেদী কোষ চোখের উপর পড়া আলোকে পরিণত করবে বৈদ্যুতিক সংকেতে, যেটি উদ্দীপিত করবে চোখের রেটিনার সাথে সংযুক্ত স্নাযু কোষগুলোকে। এসব কোষে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা উদ্দীপিত করবে মস্তিষ্ককে এবং সেখানে এই সংকেতগুলো দৃশ্যানুভূতিতে পরিণত হবে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি একজন অন্ধ ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তার নিজের অবস্থান সনাক্ত করতে, অক্ষর চিনতে এমনকি মানুষের মুখ সনাক্ত করতেও সাহায্য করে।১৫
২০০১ সালে জেস সুলিভান নামের একজন আমেরিকান বিদ্যুৎকর্মী এক দুর্ঘটনায় তার দুটি হাতই হারান। বর্তমানে তিনি শিকাগোর পুর্নবাসন কেন্দ্রের সুবাদে দুটি কৃত্রিম হাত ব্যবহার করেন। জেসের ব্যবহার করা কৃত্রিম হাত দুটোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কেবলমাত্র মস্তিষ্কের চিন্তা দিয়েই সেগুলোকে ব্যবহার করা যায়। জেসের মস্তিষ্ক থেকে আসা স্নায়বিক সংকেতগুলো মাইক্রো-কম্পিউটারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত হয় এবং সে সংকেতের উপর নির্ভর করেই কৃত্রিম হাত দুটো নড়াচড়া করে। একজন সাধারণ মানুষ একটি হাত ওঠানোর সময় অবচেতন মনে যেরকম ভাবেন, জেসও একই রকম চিন্তা করেন এবং তার হাতটি উপরে উঠে যায়। এই কৃত্রিম হাত দুটির কাজের ক্ষমতা জৈবিক হাতের তুলনায় অনেক কম, কিন্তু তা দিয়েই জেসের দৈনন্দিন জীবনের কাজ চলে যায়। এরকমই একটি বায়োনিক হাত সম্প্রতি ক্লডিয়া মিশেল নামক একজন আমেরিকান সৈনিকের শরীরে সংযুক্ত করা হয়েছে যিনি একটি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় তার হাত হারিয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, খুব শীঘ্রই কৃত্রিম হাত শুধু মানুষের ইচ্ছামতো নড়াচড়া করতে পারবে তাই নয়, কৃত্রিম হাত মস্তিষ্কেও সংকেত পৌছে দিতে পারবে। তার অর্থ হলো, এটি হাত-পা হারানো একটি মানুষকে কেবল চলতেই সাহায্য করবে না, তাকে ফিরিয়ে দেবে স্পর্শের স্বাদ!১৬

বর্তমানে এসব বায়োনিক হাত-পায়ের ক্ষমতা আমাদের স্বাভাবিক জৈবিক হাত-পায়ের তুলনায় নগণ্য, কিন্তু এই ক্ষমতার উন্নতির সম্ভাবনা অসীম। উদাহরণস্বরূপ, একটি বায়োনিক হাতকে এত বেশি শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব যে একজন নামজাদা কুস্তিগীরের হাতের শক্তিও তার কাছে অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে হবে। এছাড়াও বায়োনিক হাতের সুবিধা হলো, কয়েক বছর পরপরই এগুলো পাল্টানো যায়, শরীর থেকে খুলে রেখে দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সাম্প্রতিককালে নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারটিকে একটি বানরের মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসিয়ে হাতে কলমে দেখিয়েছেন। ইলেকট্রোডগুলো বানরের মস্তিষ্ক থেকে সংকেত সংগ্রহ করে অন্য যন্ত্রে পাঠিয়ে দেয়। বানরগুলোকে চিন্তার মাধ্যমে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন, বায়োনিক হাত এবং পা নাড়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অরোরা নামে এরকম একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বানর একই সময়ে তার দুটি জৈবিক হাত নড়ানোর পাশাপাশি চিন্তা দিয়ে দূরে রাখা আরেকটি বায়োনিক হাত নাড়া শিখে ফেলে। অনেকটা হিন্দু দেবদেবীর মতোই অরোরার এখন দুটো নয়, তিনটি হাত এবং তৃতীয় হাতটি থাকতে পারে অন্য কোন ঘরে, এমনকি অন্য কোন শহরেও। সে নর্থ ক্যারোলিনার গবেষণাগারে বসে একহাতে পিঠ এবং অন্য হাতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে একই সময়ে তৃতীয় হাত দিয়ে নিউইয়র্কে কলা চুরি করতে পারে (যদিও দূরের হাতের এই চুরি করা কলা দূর থেকেই খাবার প্রক্রিয়াটি এখনও মানুষের স্বপ্নই রয়ে গেছে)। ২০০৮ সালে ইডো য়ানামের এরকম আরেকটি বানর নর্থ ক্যারোলিনার চেয়ার বসে জাপানের, কিয়োটেতে রাখা বায়োনিক পা নাড়ানোর মাধ্যমে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। এই বায়োনিক পা গুলোর ওজন ছিল ইডোয়ার শরীরের ওজনের প্রায় বিশ গুণ।১৭
“লকড-ইন সিনড্রোম” (Locked-in syndrome) হলো এমন একটি অবস্থা যখন মানুষের মস্তিষ্ক কর্মক্ষম থাকলেও মানুষ তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ানোর সবরকম বা প্রায় সব ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। এখন পর্যন্ত এই সিনড্রোমে ভোগা রোগীরা কেবলমাত্র চোখের মণির সামান্য নড়াচড়ার মাধ্যমেই বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। এরকম কিছু রোগীর মস্তিষ্কে সংকেত সংগ্রাহক ইলেকট্রোড বসিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে মস্তিষ্কের সংকেতকে কেবলমাত্র যান্ত্রিক হাতের মত বাহ্যিক বস্তুর নড়াচড়ার মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে শব্দেও রূপ দেয়ার। এরকম প্রচেষ্টা সফল হলে, লকড-ইন সিনড্রোমের রোগীরা সরাসরি বাইরের দুনিয়ার সাথে কথা বলতে পারবেন এবং তখন আমরা মানুষের মনের কথা পড়ে ফেলার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারব।১৮