তবে এই ‘বুদ্ধিমান নকশা’ (intelligent design) তত্ত্ব পৃথিবীজুড়ে জীববিজ্ঞানীদের রোষের শিকার হচ্ছে। কারণ একদিকে এই তত্ত্ব ডারউইনের প্রচলিত প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের বিরোধী, অন্যদিকে এই তত্ত্ব আসলে এটাই প্রমাণ করতে চায় যে, এই সব জটিল জৈবিক নকশা আসলে কোনো এক বুদ্ধিমান স্রষ্টার পূর্বপরিকল্পনারই ফল। হ্যাঁ, এতদিন পর্যন্ত যা যা ঘটেছে সেসবের ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞানীদের কথাই ঠিক। কিন্তু এই বুদ্ধিমান নকশা নিয়ে মানুষের কাজ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই নতুন তত্ত্বকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
পৃথিবীজুড়ে জীববিজ্ঞানীরা ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’ তত্ত্বের বিরোধিতায় মত্ত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর জীবজগতের অন্তহীন বৈচিত্র্য এবং জটিলতা ইঙ্গিত দেয় যে, এসব সৃষ্টির পেছনে একজন মহান বুদ্ধিমান স্রষ্টার হাত আছে, তার নকশাতেই এসব তৈরি হয়েছে। এই ধারণা ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক বিবর্তন’ তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিরোধী। ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’ এর বিপরীতে বিজ্ঞানীদের এই ধারণা হয়ত এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে বিকাশ লাভ করা জীবকুলের জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু হয়ত আগামীর পৃথিবীতে উদ্ভব হওয়া জীবকুলের পেছনে থাকবে কোন বুদ্ধিমান প্রাণীর নকশা। তখন, সে সময়ের জীবকুলের জন্য ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’ তত্ত্ব মেনে নেয়া ছাড়া তাদের কোন উপায় থাকবে না।
এখন পর্যন্ত, ‘বুদ্ধিমান নকশা’ তিনভাবে ‘প্রাকৃতিক বিবর্তন’কে প্রতিস্থাপন করতে পারে- জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল এর ব্যবহারের মাধ্যমে, সাইবর্গ (সাইবর্গ হলো জৈব ও অজৈব অংশ জোড়া দিয়ে তৈরি সত্তা) তৈরির মাধ্যমে বা যান্ত্রিক জীব তৈরির মাধ্যমে।
ইঁদুর ও মানুষ
জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল হলো মানুষের সচেতন তৎপরতার মাধ্যমে কোন জীবকে কাকের শিল্পকর্মের মতো কোন নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ধারণা উপলব্ধি করার উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জীবটির কোন জৈবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে (যেমন একটি নতুন জিন প্রবেশ করিয়ে) তার আকার, আকৃতি, সক্ষমতা, চাহিদা কিংবা বাসনা বদলে দেবার একটি পদ্ধতি।
অবশ্য জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল নতুন কোনো বিষয় নয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ নিজের এবং অন্যান্য জীবকুলের পরিবর্তন সাধন করার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। নপুংসক করে দেওয়ার ঘটনাটি এ ব্যাপারে একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে। মানুষ প্রায় দশ হাজার বছর ধরে এঁড়ে গরু তৈরির জন্য ষাঁড়কে খোজা করে আসছে। এঁড়ে গরু ষাঁড়ের থেকে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও স্থির, তাই তাকে দিয়ে মাঠের লাঙ্গল টানানো সহজ। এমনকি উচ্চগ্রামের সুকণ্ঠী গায়ক কিংবা রাজা-বাদশাহের হারেম বা অন্তঃপুর পাহারা দেওয়ার জন্য মানুষ অনেককাল আগে থেকেই নিজ প্রজাতির তরুণ ছেলেদেরও খোজা করে আসছে।
কিন্তু, জীবের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে অর্জিত সাম্প্রতিক জ্ঞান বর্তমানের মানুষের জন্য এমন নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে যা আগের দিনের মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। মানুষ কাজে লাগাচ্ছে কোষীয় এমনকি নিউক্লিয়ার পর্যায়ে জীবের শারীরতত্ত্বের খুঁটিনাটি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আজকের দিনের মানুষ কেবল অন্য মানুষকে নপুংসক বানাতে পারে তাই নয়, বরং চাইলে তার অস্ত্রোপচার এবং হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমে তার লিঙ্গগত পরিচয়ই পাল্টে দিতে পারে। এখানেই কিন্তু গল্পের শেষ নয়। ভেবে দেখুন, ১৯৯৬ সালের টেলিভিশন ও পত্রিকায় নিচের ছবিটি প্রকাশিত হলে পৃথিবীর মানুষের মাঝে সেটা কতখানি বিস্ময়, বিরক্তি এবং উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল।

এই ছবিটি কিন্তু চাঁদের মাঝে সাঈদীর ছবির মতো করে ফটোশপে তৈরি করা হয়নি। এটা একটা পুরোপুরি অবিকৃত আসল ইঁদুরের ছবি, যার পিঠে বিজ্ঞানীরা গরুর কার্টিলেজ কোষ স্থাপন করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা এই কোষগুলো থেকে উৎপন্ন কলার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন এবং তাকে গড়ে তুলেছেন মানুষের কানের আকারে। এই প্রক্রিয়া হয়তো শিগগিরই বিজ্ঞানীদেরকে কৃত্রিম জৈবিক কান তৈরিতে সহায়তা করবে যা হয়তো অচিরেই স্থাপন করা হবে আমাদের শরীরে।১
এমনকি, জিনগত প্রকৌশলকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এর চেয়েও অনেক বেশি আশ্চর্যজনক, অসংখ্য যুগান্তকারী আবিষ্কার করা সম্ভব। সে কারণেই, বিজ্ঞানের এ শাখাটি নীতিগত, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক দিক থেকে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের। শুধু যে একেশ্বরবাদী, ধর্মপরায়ণ মানুষরাই একে ‘খোদার উপর খোদকারি’ ভাবছেন এমনটা নয়। অনেক স্বীকৃত নাস্তিক ব্যক্তিরাও একে আশঙ্কার চোখে দেখছেন। এসব ব্যাপারকে তারা দেখছেন প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মের উপর বিজ্ঞানীদের হস্তক্ষেপ হিসেবে। প্রাণী অধিকার নিয়ে সোচ্চার কর্মীরা এসব গবেষণার জন্য ব্যবহৃত প্রাণীদের উপর চালানো কষ্টকর, অমানবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন, প্রাণীদের স্বাভাবিক ইচ্ছা ও চাহিদাকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য খামারে তাদের লালনপালনের পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা। মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন জিনগত প্রকৌশলের উন্নতি একদিন তৈরি করবে ‘সুপারম্যান’, তখন বাকি মানুষদের ‘দাস’ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। জেরেমিয়ানরা জৈব-একনায়কের কথা কল্পনা করছেন যারা তৈরি করতে পারবে একই রকমের অসংখ্য ভয়হীন যোদ্ধা এবং অনুগত কর্মী। মানুষের ধ্বংস তখন অবধারিত হয়ে পড়বে। মানুষের সমষ্টিগত সাধারণ ধারণা হলো, হুট করে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন নতুন জীব তৈরি বা পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের যতটা বেড়েছে, এই ক্ষমতাকে সঠিকভাবে ব্যবহারের জ্ঞান এবং এর ভবিষ্যত প্রভাব সম্পর্কে সঠিকভাবে ধারণা করার ক্ষমতা মানুষের ততটা বাড়েনি।