কোটি কোটি বছর ধরে, মানুষের কাছে কোনো বুদ্ধিমান নকশার অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, এমন কোনো বুদ্ধিমত্তারই সন্ধান পাওয়া যায়নি যার পক্ষে প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর স্বরূপের নকশা তৈরি করা সম্ভব। কিছুদিন আগে পর্যন্তও পৃথিবীতে টিকে থাকা একমাত্র জীবিত বস্তু অণুজীবদের কথাই ধরা যাক। টিকে থাকার জন্য এদেরও আছে কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির শরীরে বসবাস করা একটি অণুজীব সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির একটি প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য তার কোষের ভেতর আত্মীকরণ করতে পারে এবং অর্জন করতে পারে নতুন ক্ষমতা। নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা অণুজীবের এই নতুন ধরনের ক্ষমতা তৈরির একটি উদাহরণ। কিন্তু, এত অসাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও আমরা যতদূর জানি, অণুজীবের কোনো নিজস্ব চিন্তা-চেতনা নেই, নেই জীবনের কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার কোনো ক্ষমতা।
একটা সময়ে এসে জিরাফ, ডলফিন, শিম্পাঞ্জি এবং নিয়ান্ডার্থালের মত প্রাণীগুলো বিবর্তনের মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা করার ক্ষমতা অর্জন করলো। কিন্তু, সেকালের একজন নিয়ান্ডার্থাল ক্ষুধা পেলে হাত বাড়িয়ে ধরা যায় এরকম কোন নাদুস-নুদুস, ধীরগতির মুরগির কথা কল্পনা করতে পারলেও, এই কল্পনাকে বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাকে ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রাকৃতিকভাবে বিবর্তিত হওয়া বন্য পাখি শিকারের উপরই নির্ভর করতে হতো।
আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, কৃষি বিপ্লবের সময় থেকে প্রকৃতির উপর মানুষের এই অসহায় নির্ভরশীল অবস্থার পরিবর্তনের সূচনা হলো। যেসব মানুষেরা এতদিন নাদুস-নুদুস, ধীরগতির মুরগির কথা কল্পনা করত, তারা আবিষ্কার করল যে, যদি তারা সবচেয়ে মোটাসোটা মুরগিটার সাথে সবচেয়ে অলস, ধীরগতির মুরগিটির প্রজনন ঘটায়, তাহলে তাদের উৎপাদিত সন্তানের একই সাথে মোটা এবং অলস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এইভাবে উৎপন্ন বাচ্চাগুলো বড় হবার পর যদি তাদের নিজেদের মাঝে প্রজনন ঘটানো যায়, তাহলে আরও অনেক মোটাসোটা, অলস পাখির জন্ম হওয়া সম্ভব। এইভাবে জন্ম নিল মুরগির এমন এক নতুন প্রজাতি, প্রাকৃতিক বিবর্তন যাকে তৈরি করেনি, যার জন্ম হয়েছে একটি বুদ্ধিমান প্রাণীর তৈরি করা নকশা থেকে। এই বুদ্ধিমান সত্তাটি কোনো দেবতা বা ঈশ্বর নন, এই প্রাণীটির নাম মানুষ।
কিন্তু, এত কিছু সত্ত্বেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের তুলনায় নতুন প্রজাতির জীবের নকশা তৈরিতে মানুষের এই ক্ষমতা ছিল খুবই নগণ্য। মানুষ মুরগির প্রজননকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বড়জোর কিছু বৈশিষ্ট্যকে বাড়তে না দিয়ে এবং কিছু বৈশিষ্ট্যকে বাড়ার সুযোগ দিয়ে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারত। কিন্তু মুরগির জিনে অনুপস্থিত কোনো বৈশিষ্ট্যকে মুরগির মাঝে আনা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। অন্যভাবে বলতে গেলে জীবজগতে মানুষ ও মুরগির মাঝের এই সম্পর্ক, জীবজগতে আগে থেকে বিদ্যমান আরও কিছু সম্পর্কের থেকে খুব বেশি আলাদা কিছু ছিল না। মৌমাছি যেমন পরাগায়নের জন্য উজ্জ্বল ও রঙিন ফুলগুলোকেই বেছে নিয়ে তাদের বংশবিস্তারে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি মানুষও মুরগির প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে বেশি বেশি মোটাসোটা ও অলস মুরগির জন্ম নিশ্চিত করেছে।
৪০০ কোটি বছর ধরে টিকে থাকা প্রাকৃতিক বিবর্তনের আধিপত্য আজ সম্পূর্ণ নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি। দুনিয়াজুড়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারেই তৈরি করছেন জীবন্ত প্রাণী। তারা অপ্রতিরোধ্য গতিতে, দক্ষতার সাথে প্রাকৃতিক বিবর্তনের এতদিনের নিয়ম কানুনকে ভেঙেচুরে প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে জন্ম দিচ্ছেন সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যের। এডুয়ার্ডো কাক (Eduardo Kac) নামের একজন জীবকৌশল শিল্পী ২০০০ সালে একটি নতুন শিল্পকর্ম তৈরির পরিকল্পনা করলেন। সেটি হলো- অন্ধকারে ফ্লোরোসেন্ট বাতির মত করে জ্বলা একটি সবুজ জীবন্ত খরগোশ। এরপর, কাক একটি ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করলেন এবং উপযুক্ত সম্মানীর বিনিময়ে তার পরিকল্পনা মাফিক খরগোশ তৈরির জন্য ফরমাশ দিলেন। সেখানকার বিজ্ঞানীরা একটি সাধারণ সাদা খরগোশের ভ্রুণ নির্বাচন করলেন, তারপর তার ডিএনএতে সবুজ রঙের আলোজ্বলা জেলিফিসের জিন সংযোগ করলেন। ম্যাজিক! জনাব কাক, এই নিন আপনার কাঙ্ক্ষিত আলোজ্বলা খরগোশ! কাক খরগোশটির নাম রাখলেন ‘অ্যালবা’।
প্রাকৃতিক বিবর্তনের নিয়মকানুন দিয়ে ‘অ্যালবা’র মতো খরগোশের অস্তিত্ব প্রমাণ করা একেবারেই অসম্ভব। সে মানুষের বুদ্ধিমান নকশার ফসল। একই সাথে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বুদ্ধিমান নকশা দিয়ে তৈরি যেসব অগণিত প্রাণীর জন্ম হবে, অ্যালবা তাদেরই অগ্রদূত। যদি ‘অ্যালবা’র মত নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণীর গুরুত্ব পরিপূর্ণরূপে অনুধাবন করা সম্ভব হয় এবং তার আগেই যদি মানবজাতি পৃথিবীর বুক থেকে নিজেদেরকে নিশ্চিহ্ন করে না ফেলে, তাহলে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব কেবল আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও অনেক বিস্তৃতি লাভ করবে। এটি হতে পারে পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের পর থেকে ঘটা সবচেয়ে বড় জীববৈজ্ঞানিক বিপ্লব। প্রাকৃতিক বিবর্তনের চারশ কোটি বছর পরে, ‘অ্যালবা’ একটি নতুন মহাজাগতিক যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যে যুগে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে বুদ্ধিমান নকশা। যদি সত্যিই সে যুগের সূচনা হয়, তবে তার আগেকার পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাসকেই মনে হতে পারে পৃথিবীতে নানারকম জীবন ভাঙা-গড়ার একটা খেলামাত্র। মহাজাগতিক গণ্ডিতে যেখানে এরকম একটি প্রক্রিয়া বুঝতে কোটি কোটি বছর লেগে যায়, যেখানে মানুষ মাত্র কয়েক হাজার বছরে সে রহস্যের কিনারা করে ফেলবে।
