যদি তাই হয়, তাহলে বলা যায় যে সুখের ব্যাপারে আমরা যা যা জেনেছি তার সবই ভুল। একজন মানুষের ইচ্ছাগুলো পূরণ হচ্ছে কি না, বা সে আনন্দ পাচ্ছে কি না- হয়তো সেসবের তেমন কোনও গুরুত্বই নেই। আসল প্রশ্ন হল মানুষ নিজের সম্পর্কে সত্যটা জানতে পারছে কি না। যদি এদিক থেকেই চিন্তা করি, তাহলে সেই আদিম শিকারি-সংগ্রাহক মানুষ বা মধ্যযুগের কৃষকদের চেয়ে আমরা এই সত্যটা কতটুকু বেশি জানতে পেরেছি?
সুখের ইতিবৃত্ত নিয়ে জোরেশোরে গবেষণা শুরু হয়েছে অল্প কয়েক বছর হল। প্রাথমিক কিছু ধারণা তৈরি হচ্ছে, গবেষণা কীভাবে হবে সেসব কর্মপদ্ধতি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। কাজেই এখনই এ ব্যাপারে কোনও জোরালো দাবি করা যাচ্ছে না। বরং এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যতভাবে সম্ভব কাজ চালিয়ে যাওয়া ও সঠিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
ইতিহাসের অধিকাংশ জুড়েই আছে বড় বড় মনীষীদের আদর্শের কথা, বীর যোদ্ধাদের সাহসের কথা, ধার্মিক সন্ন্যাসীদের ত্যাগের কথা আর গুণী শিল্পীদের সৃজনশীলতার কথা। ইতিহাস থেকে জানা যায় কীভাবে সমাজ গড়ে ওঠে, কীভাবে তা আবার ভেঙে পড়ে, কীভাবে বড় বড় সব রাজ্য তৈরি হয়ে আবার একদিন ধ্বংস হয়ে যায়, কীভাবে নতুন নতুন আবিষ্কার হয়, কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। অথচ ক্ষুদ্র ব্যক্তিমানুষের সুখ-দুঃখের কথাগুলোর সেখানে ঠাঁই হয় না। সেখানে রয়ে গেছে বিশাল এক শূন্যস্থান। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার এখনই সময়।
——————
* বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক জরিপের উদ্দেশ্য মানুষের সুখ পরিমাপ করা হলেও মনোচিকিৎসার কেন্দ্রীয় বিষয় হল মানুষকে নিজেকে জানতে ও তাদের নিজেদের ক্ষতি করার মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করা।
——————–
1 For both the psychology and biochemistry of happiness, the following are good starting points: Jonathan Haidt, The Happiness Hypothesis: Finding Modern Truth in Ancient Wisdom (New York: Basic Books, 2006); R. Wright, The Moral Animal: Evolutionary Psychology and Everyday Life (New York: Vintage Books, 1994); M. Csikszentmihalyi, ‘If We Are So Rich, Why Aren’t We Happy?’, American Psychologist 54:10 (1999): 821–7; F. A. Huppert, N. Baylis and B. Keverne (eds.), The Science of Well-Being (Oxford: Oxford University Press, 2005); Michael Argyle, The Psychology of Happiness, 2nd edition (New York: Routledge, 2001); Ed Diener (ed.), Assessing Well-Being: The Collected Works of Ed Diener (New York: Springer, 2009); Michael Eid and Randy J. Larsen (eds.), The Science of Subjective Well-Being (New York: Guilford Press, 2008); Richard A. Easterlin (ed.), Happiness in Economics (Cheltenham: Edward Elgar Publishing, 2002); Richard Layard, Happiness: Lessons from a New Science (New York: Penguin, 2005).
2 Daniel Kahneman, Thinking, Fast and Slow (New York: Farrar, Straus and Giroux, 2011); Inglehart et al., ‘Development, Freedom and Rising Happiness’, 278–81.
3 D. M. McMahon, The Pursuit of Happiness: A History from the Greeks to the Present (London: Allen Lane, 2006).
২০. সেপিয়েন্সের শেষের শুরু
পদার্থবিজ্ঞান থেকে রসায়ন, তারপর জীববিজ্ঞান এবং এর উত্তরসূরী হিসেবে মানুষের ইতিহাসকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই বইটির সূচনা। আর সব জীবিত সত্তার মত মানুষের জীবনও নিয়ন্ত্রণ করে একই প্রাকৃতিক শক্তি, রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন পদ্ধতি। প্রাকৃতিক নির্বাচন হয়তো মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণীর থেকে বৃহত্তর ক্ষেত্রে বিচরণের সুযোগ করে দিয়েছে কিন্তু সে বিচরণের সীমারেখাও কিন্তু অসীম নয়। যার কারণে, অনেক চেষ্টা এবং অসংখ্য অর্জন সত্ত্বেও মানুষ এতদিনেও তার শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারেনি।
অবশ্য, আজ একবিংশ শতকের শুরুতে এসে মানুষ তার শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের এতদিনের নিয়ন্ত্রণহীন নকশাকে ভেঙে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে তৈরি করছে বিবর্তনের নতুন নকশা।
প্রায় চারশ’ কোটি বছর ধরে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রাণের বিবর্তন ঘটেছে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এর মাধ্যমে। বুদ্ধিমান স্রষ্টার তৈরি করা কোনো নকশাই প্রাকৃতিক বিবর্তনের এই নিয়মকে সরিয়ে দিতে পারেনি। জিরাফের পূর্বপুরুষদেরকে উঁচু ডাল থেকে খাবার পেড়ে খাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে হতো বলেই আজকের জিরাফের গলা এত লম্বা, কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বার খামখেয়ালি নকশার কারণে নয়। জিরাফের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের গলা লম্বা ছিল তারা অন্যদের তুলনায় বেশি খাবার সংগ্রহ করতে পারত। ফলশ্রুতিতে, তাদের সন্তান জন্ম দেবার এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দেয়ার সুযােগও ছিল বেশি। জিরাফ তো নয়ই, অন্য কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বাও নিশ্চয়ই কখনও বলেনি, ‘ইস, জিরাফের গলাটা অনেকখানি লম্বা করে দিলে বেচারা গাছের মগডাল থেকে পাতাগুলো আরামে চিবিয়ে খেতে পারত। দিই ওর গলাটা লম্বা করে।’ ডারউইনের তত্ত্বের সৌন্দর্যটা হলো, জিরাফের লম্বা গলার কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য তাকে কোন বুদ্ধিমান নকশার কথা কল্পনা করতে হয় না।
