বৌদ্ধ ধর্মের যেভাবে সুখের ব্যাখ্যা তার মূল ভাবটা অনেকটা জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মতোই। অর্থাৎ এখানেও বলা হয় যে সুখ মানুষের শরীরেই উৎপন্ন হয়, বাইরে থেকে আসে না। কিন্তু গোড়ার দিকটা একই রকম হলেও এই ধর্ম উপসংহার টেনেছে অন্যদিকে।
বৌদ্ধ ধর্মমতে মানুষ সুখ বুঝতে পারে আনন্দের অনুভূতি দিয়ে, আর দুঃখ বোঝে কষ্টের অনুভূতির মাধ্যমে। তাই মানুষ নিজের অনুভূতিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা কষ্ট এড়িয়ে আরও বেশি আনন্দ পেতে চায়। তাই আমরা যা কিছু করি- পা চুলকাই, চেয়ারে নড়েচড়ে বসি, কিংবা বিশ্বযুদ্ধই বাধাই- সবই করি আনন্দের অনুভূতি পাওয়ার জন্যই।
কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে। বৌদ্ধ ধর্ম বলে, মানুষের এই সুখ আর দুঃখ নিয়ত পরিবর্তনশীল, অনেকটা সাগরের ঢেউয়ের মতো, আসে আর যায়। পাঁচ মিনিট আগেও যে মানুষটা নিজেকে সুখী ভাবছিল, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিল, পাঁচ মিনিট যেতেই সেই সুখটুকু সরে গিয়ে দুঃখ এসে তাকে গ্রাস করে। তার মানে সুখী হতে হলে তাকে সারাক্ষণ সুখের পিছনে ছুটতে হবে, আর দুঃখ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে। অথচ এতে যদি সে সফলও হয়, তাতেও কোনও লাভ নেই। কারণ এই অস্থায়ী সুখটুকু ফুরিয়ে গেলেই আবার সবকিছু শুরু করতে হবে প্রথম থেকে।
তাহলে এই ক্ষণস্থায়ী সুখের পিছনে ছুটে কী লাভ? যা ধরে রাখা যায় না তাকে পাওয়ার জন্য কেন এই পণ্ডশ্রম? বৌদ্ধ ধর্ম বলে, মানুষের এই দুর্ভোগের কারণ আসলে এই দুঃখ-কষ্ট নয়। সুখ-দুঃখের এই অর্থহীনতাও নয়। বরং সুখের পিছনে এই অবিরাম অর্থহীন ছুটে বেড়ানোই দুঃখের কারণ। এতে সুখের দেখা তো মেলেই না, বরং দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও অপ্রাপ্তিতে ভরে যায় জীবন। সুখের পিছনে ছুটে কেউ কোনোদিন সন্তুষ্ট হতে পারে না। এমনকি ক্ষণস্থায়ী আনন্দের সময়ও মনের ভিতর উঁকি দিয়ে যায় দুশ্চিন্তা, কারণ এই সুখও তো এক সময় ফুরিয়ে যাবে।
ক্ষণস্থায়ী সুখ মানুষকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে না। এর থেকে মুক্তি মেলে তখনই, যখন সে বুঝতে পারে যে সুখ ক্ষণস্থায়ী, আর বুঝতে পেরে সে সুখের পিছনে ছোটা বন্ধ করে। বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যানের উদ্দেশ্য এটাই। ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ তার দেহ ও মনকে ভালোভাবে জানতে পারে, অনুভূতির ওঠানামা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে পায়, ফলে বুঝতে পারে এসব কতটা অর্থহীন। এভাবে সুখের সন্ধান বন্ধ করতে পারলেই মনে ধীরতা ও প্রশান্তি আসে। মনের ভিতরে সবরকম অনুভূতি আসবে যাবে- আনন্দ, ক্রোধ, হতাশা কিংবা কামনা যাই হোক- কিন্তু বিশেষ কোনও অনুভূতির জন্য তীব্র বাসনা ত্যাগ করতে পারলেই সবকিছু সহজ হয়ে যায়। কী হতে পারত সেই চিন্তা বাদ দিয়ে কী হচ্ছে সেটাই বড় হয়ে ওঠে।
এই মানসিক প্রশান্তির অনুভূতি এতটাই গভীর যে সারাজীবন সুখের পিছনে ছুটে বেড়ানো একজন মানুষ সেটা কল্পনাও করতে পারে না। ধরুন একজন মানুষ বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে ‘ভালো’ ঢেউগুলোকে ধরে রাখতে আর ‘খারাপ’ ঢেউগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার সারাজীবন এভাবে কেটে যাবে, কিন্তু এই কাজে সে সফল হবে না কোনোদিন। অথচ সে যদি এই ব্যর্থ চেষ্টা না করে চুপচাপ বসে সবগুলো ঢেউকে আসতে-যেতে দেয়, তাহলেই তার জীবন ভরে উঠবে প্রশান্তিতে।
কিন্তু এই ধারণাটা আধুনিক পৃথিবীতে এত খাপছাড়া লাগে যে এখনকার উদারনৈতিক মানুষ এটাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। এখনকার ধারণাটা অনেকটা এমন, “সুখ আসলে বাইরের কোনও কিছুর উপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে আমাদের অনুভূতির উপর। তাই মানুষের টাকা, মর্যাদা এসবের পিছনে না ছুটে তার নিজের মানসিক শান্তির দিকে নজর দেওয়া উচিত।” অথবা আরও কম কথায় বলতে গেলে “সুখ আসে ভিতর থেকে।” ঠিক এই কথাটাই জীববিজ্ঞানীরাও বলেন, কিন্তু তারা বোঝাতে চান বুদ্ধ যা বলেছেন তার উল্টোটা।
এই আধুনিক মতবাদ আর জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে বুদ্ধের বাণীর মিল শুধু এইটুকুই। কিন্তু আসল জায়গাটাতেই, অর্থাৎ অনুভূতির ব্যাপারে অমিল আছে। বুদ্ধ বলেন যে সুখ আসলে আমাদের ভিতরের অনুভূতির উপরেও নির্ভর করে না। আসলেই, আমরা যতই আমাদের অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দিই, ততই আমাদের মধ্যে ভালো অনুভূতির চাহিদা তৈরি হয়, আর তাতে আমাদের দুর্ভোগই শুধু বাড়ে। তাই বুদ্ধের পরামর্শ হল, বাহ্যিক অর্জনের সাথে সাথে ভিতরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।
‘ভালো থাকা’ বিষয়ক প্রশ্নে জরিপ চালালে একজন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, ব্যক্তিগত সুখ ও আবেগের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মের মতো কিছু কিছু ধর্ম ও দর্শন বলে, এসব আবেগ-অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে একজন মানুষের নিজেকে পুরোপুরি জানতে পারা, চিনতে পারার মাধ্যমেই মিলবে প্রকৃত সুখের সন্ধান। বেশিরভাগ মানুষই যে ভুলটা করে তা হল, তারা নিজের অনুভূতি, নিজের চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দ- এসবের মাঝে নিজের পরিচয় খোঁজে। এর ফলে সারা জীবন ধরে তারা কিছু অনুভূতির পিছু তাড়া করে, আর কিছু অনুভূতি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। এসব অনুভূতির কারাগারে আটকে থাকা এই মানুষগুলো কখনও বুঝতেই পারে না, যে সুখ আর দুঃখ নয়, বরং এই ছুটে চলা আর পালানোর মনোবৃত্তিই তাদের কখনও মুক্তি দেয় না।
