তার মানে সুখ জিনিসটা সম্ভবত শুধু ব্যক্তিগত ভালো থাকা নয়। সুখ হল সমাজে বিরাজমান সামষ্টিক কল্পনাগুলোর সাথে একজন মানুষের নিজের কল্পনাগুলো এক সুরে মিলিয়ে নেওয়া। যখন একজন মানুষের জীবনবোধ তার আশেপাশের আর দশজনের জীবনবোধের সাথে মিলে যায়, তখনই সে জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, নিজেকে সুখী ভাবে।
তবে এই সিদ্ধান্তে আসাটা কিছুটা হতাশাজনকও। সুখ কি আসলেই কল্পনানির্ভর?
নিজেকে জানো
সুখ যদি আনন্দের অনুভূতি হয়, তাহলে সুখী হতে হলে আমাদের শরীরের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর সুখ যদি হয় জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, তাহলে সুখী হওয়ার জন্য নিজেকে আরও ভালোভাবে ভাসিয়ে দিতে হবে কল্পনায়। এই দুটো ছাড়া সুখী হওয়ার আর কোনও উপায় কি আছে?
এই দুটো ধারণার মধ্যেই একটা জিনিস আছে। সেটা হল, এখানে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে সুখ হল একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেটা আনন্দই হোক বা জীবনের অর্থ। কাজেই একটা মানুষ সুখী কিনা তা জানতে হলে তার অনুভূতি জানতে হবে। অনেকের কাছে এটাই স্বাভাবিক মনে হবে, কারণ আমরা এখন বাস করছি একটা উদারনৈতিক সময়ে। এই উদারনৈতিক চিন্তাধারা মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির পক্ষেই যাবে। উদারনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অনুভূতিই মানুষের সব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক। একজন মানুষের কাছে কী ভালো আর কী মন্দ, কোনটা সুন্দর আর কোনটা অসুন্দর, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়- তার সবকিছুই সে ঠিক করে নেয় তার নিজের মতামত থেকে।
উদারনৈতিক রাজনীতির মূল কথা হল, যারা ভোট দেবে তারাই সবচেয়ে ভালো জানে, তাদেরকে ভালো-মন্দের জ্ঞান দেওয়ার জন্য কোনও কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন নেই। উদারনৈতিক অর্থনীতি বলে, ক্রেতার মতামতই শিরোধার্য, এর উপরে আর কোনও কথা নেই। উদারনৈতিক শিল্পে সৌন্দর্য জিনিসটা আপেক্ষিক, তা কেবল দর্শকের রুচির উপরেই নির্ভর করে। উদারনীতিতে চলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদেরকে নিজের মতো করে চিন্তা করতে শেখায়। বিজ্ঞাপনগুলো আমাদের বলতে চায়, ‘যা করতে ইচ্ছা হয়, করে ফেলো!’। এ যুগের চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস, গান- সবকিছুর মধ্যেই সেই একই বার্তা- ‘নিজের কাছে সৎ থাকো’, ‘নিজের মনের কথা শোনো’ কিংবা ‘মন যা চায়, তাই করো’। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুসো তো সোজাসুজিই বলেছেন, “যেটা আমার কাছে ভালো, সেটাই ভালো, আর যা আমার কাছে খারাপ, তা-ই খারাপ”।
যে মানুষটা একেবারে শিশুকাল থেকে এসব কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছে, তার কাছে সুখ অবশ্যই একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। একজন মানুষ সুখে আছে কি না সেটা নির্ণয় করতে পারে কেবল সে নিজেই, অন্য কেউ নয়। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল এই উদারনীতিতেই দেখা যায়। ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শিক মতবাদ সুখের নানা রকম নৈর্ব্যক্তিক মাপকাঠি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব মতবাদে সুখ জিনিসটা একজন ব্যক্তির নিজের মতামত বা অনুভূতির ঊর্ধ্বে বলেই মনে করা হয়। ডেলফিতে অবস্থিত অ্যাপোলোর মন্দিরের প্রবেশদ্বারেই তীর্থযাত্রীরা দেখতে পেত লেখা আছে, ‘নিজেকে জানো’। এই কথার গূঢ় অর্থ হল, গড়পড়তা একজন মানুষ তার নিজের সম্পর্কেই আসলে জানে না, তাই সুখের সন্ধানও সে আর পায় না। এই কথাটার সাথে ফ্রয়েডও সম্ভবত একমত হতেন।*
খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারেও একই কথা খাটে। সেইন্ট পল ও সেইন্ট অগাস্টিন বিলক্ষণ জানতেন, যে বেশিরভাগ মানুষ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ও যৌনতা- এ দুয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টাই বেছে নেবে। তাহলে কি যৌনতাই সুখের উৎস? পল ও অগাস্টিনের উত্তর হল, না। এতে কেবল এটাই প্রমাণিত হয় যে, পাপ করাটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, মানুষ সহজেই শয়তানের ফাঁদে পা দেয়। খ্রিস্টধর্মের চোখে বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা আসলে হেরোইনে আসক্তদের মতো। ধরুন একজন মনোবিজ্ঞানী মাদকাসক্ত মানুষের কাছে সুখের সন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পেলেন, মানুষ কেবল মাদক গ্রহণ করলেই সুখী হয়। তাহলে কি তিনি তার গবেষণাপত্রে লিখবেন, যে হেরোইনই হল সুখের চাবিকাঠি?
অনুভূতি জিনিসটা যে সুখের কোনও নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়, এ কথা কেবল খ্রিস্টানদের একার নয়। অনুভূতির প্রশ্নে ডারউইন আর ডকিন্সও হয়তো সেইন্ট পল ও সেইন্ট অগাস্টিনের সাথে একই সুরে কথা বলবেন। স্বার্থপর জিনতত্ত্ব (selfish gene theory) বলে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অন্যান্য জীবের মতো মানুষের ক্ষেত্রেও জিনের স্বার্থই রক্ষা করে, সেটা যদি কোনও ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হয়, তবু। অধিকাংশ পুরুষই তাদের সারা জীবন আরাম-আয়েশ না করে দুশ্চিন্তা, খাটা-খাটনি, প্রতিযোগিতা আর মারামারি করেই কাটিয়ে দেয়। কারণ তাদের ডিএনএ তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করতেই তাকে দিয়ে এসব করিয়ে নেয়। অর্থাৎ শয়তান যেভাবে কাজ করে, ডিএনএও ঠিক সেভাবেই মানুষকে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে নিজ স্বার্থে কাজ করিয়ে নেয়।
সুখের ব্যাপারে বেশিরভাগ ধর্ম ও আদর্শের অবস্থান এই উদারনীতির চেয়ে আলাদা।৩ এগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধ ধর্ম এই সুখের সন্ধানকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, সম্ভবত আর কোনও কিছুই সেটাকে এত গুরুত্ব দেয়নি। আড়াই হাজার বছর ধরে এই ধর্ম মানুষের সুখের কারণ ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে। এ কারণেই বিজ্ঞানীদের মধ্যেও বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ ও এই ধর্মের বিভিন্ন রকম ধ্যানের কলাকৌশল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
