১৯৩২ এ প্রকাশিত আলডাস হাক্সলির (Aldous Huxley) কল্প-উপন্যাস ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ এ দেখান হয়েছে, কীভাবে ভবিষ্যতের এক বিষণ্ণ সময়ে সুখ হয়ে যায় মানুষের পরমারাধ্য বস্তু, আর কীভাবে মন-নিয়ন্ত্রক ওষুধ নিয়ে নেয় পুলিশের জায়গা। সেখানে মানুষ প্রতিদিন ‘সোমা’ (Soma) নামের ওষুধের গুণে সুখে থাকে। পৃথিবীজুড়ে প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বরাজ্যে’ যুদ্ধ-বিপ্লব-ধর্মঘট কিছু নেই, কারণ সবাই যার যার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, কারও কোনও অভিযোগ নেই। জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ নামক উপন্যাসের চেয়েও হাক্সলির দেখানো এই পৃথিবী পাঠকের কাছে বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়। কিন্তু কেন? এর ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ নয়। আসলেই তো, যদি সবাই সবসময় সুখেই থাকে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
জীবনের অর্থ
হাক্সলির উপন্যাসে কল্পিত ভীতিকর পৃথিবীতে যেটা ধরে নেওয়া হয়েছে তা হল সুখ হচ্ছে আনন্দের অনুভূতি। সুখী হওয়া মানে হল নিখাদ শারীরিক আনন্দলাভ, আর কিছুই না। যেহেতু আমাদের শরীর দীর্ঘ সময় ধরে এই আনন্দের অনুভূতি ধরে রাখতে পারে না, তাই মানুষকে অনেক সময় ধরে সুখে রাখার জন্য শরীরের কলকব্জাগুলো একটু এদিক-সেদিক করতেই হবে।
কিন্তু সুখের এই ধারণাটা নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিভেদ আছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানেম্যান (Daniel Kahneman) একবার একটা বিখ্যাত পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এই পরীক্ষায় কিছু মানুষকে তাদের একটা কর্মদিবসের বর্ণনা দিতে বলা হয়। তাদের বলা হয় দিনের সবগুলো ঘটনা ধাপে ধাপে বর্ণনা করে সেগুলো কতটুকু ভালো বা খারাপ লেগেছে সেটা বলতে। কানেম্যান দেখলেন, এই জরিপের ফলাফল, অর্থাৎ জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে ধাঁধায় ফেলে দেয়। উদাহরণ হিসেবে শিশুপালনের কথাই ধরুন। একটা বাচ্চাকে লালনপালন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক, দুরকমেরই কাজ আছে। সত্যি বলতে সেখানে কষ্টদায়ক কাজের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। শিশুপালনের বেশিরভাগ জুড়ে আছে বাচ্চার ভেজা কাঁথা বদলানো, প্রচুর থালাবাসন ধোয়া আর তাদের সব উৎপাত সহ্য করা। এর একটাও তো কোনও উপভোগ্য কাজ নয়। অথচ প্রায় সব মা-বাবাই একবাক্যে স্বীকার করবে, তাদের সন্তানই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার মানে কি এই যে, মানুষ আসলে জানেই না যে তার জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ?
এ তো গেল একটা মত। অন্য একটা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে সুখ কেবল মানুষের আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার যোগবিয়োগের ফলাফল নয়। বরং একজন মানুষের নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ হিসেবে দেখতে পারাটাই সুখ। হ্যাঁ, সুখ কেবল জৈবিক ব্যাপার নয়। এখানে মানুষের চেতনা ও মূল্যবোধেরও একটা জায়গা আছে। সন্তানপালনকে আমরা ‘একটা স্বৈরাচারী শিশুর আজ্ঞাবহ দাস হয়ে থাকা’ হিসেবে দেখব নাকি ‘একটা নতুন জীবনকে ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তোলা’ হিসেবে দেখব, সেটা নির্ধারণ করে আমাদের মূল্যবোধ।২ নিটশে (Nietzsche) বলেছেন, বেঁচে থাকার পিছনে যদি কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে যেভাবেই হোক, বেঁচে থাকা যায়। কষ্টে ভরা জীবনও প্রচণ্ড স্বস্তিদায়ক হতে পারে, যদি সেই জীবন ধারণের পিছনে কোনও উপযুক্ত কারণ থাকে। আবার একটা অর্থহীন জীবন অনেক আরামের মাঝেও দুঃসহ হয়ে ওঠে।
পৃথিবীর সব সভ্যতা ও সব যুগের মানুষই প্রায় একই রকমের আনন্দ ও কষ্টের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তারপরেও জীবনের অর্থ এক এক মানুষের কাছে এক এক রকম। সেদিক থেকে দেখলে সুখ জিনিসটাকে জীববিজ্ঞানীরা যতটা সহজভাবে দেখেন আসলে তা তত সহজ নয়। আর সেটা আধুনিকতার পক্ষেও যায় না। জীবনকে একেবারে প্রতি মিনিট ধরে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যযুগের মানুষের জীবন ছিল খুবই কঠিন। তখন যারা পরকালের অনন্ত সুখের জীবনের কথা বিশ্বাস করত, তাদের কাছে নিজের জীবন যথেষ্টই অর্থপূর্ণ ছিল। তার তুলনায় এখনকার একজন নির্ধার্মিক মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি হল অর্থহীন বিস্মৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া। ‘মোটের উপর তোমার জীবন নিয়ে কি তুমি সন্তুষ্ট?” এরকম একটা প্রশ্ন দিয়ে যদি একটা জরিপ চালানো যেত সেখানে মধ্যযুগের মানুষেরই বেশি নম্বর পাওয়ার কথা।
তার মানে কি এই যে মধ্যযুগের মানুষেরা পরকালের অলীক কল্পনার মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়ে সুখী ছিল? আসলেই তাই। যতক্ষণ এই কল্পনার বেলুন চুপসে না যাচ্ছে, ততক্ষণ এই কল্পনায় সুখী হতে বাধা কোথায়? তবে বিজ্ঞানের চোখে দেখলে মানবজীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন। এই মানুষ নামের প্রাণী প্রজাতিটা আসলে অন্ধ ও উদ্দেশ্যহীন বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফল। আমরা যা কিছু করি তা কোনও মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ নয়। কাল সকালেই যদি এই পৃথিবী নামক গ্রহটা ধ্বংস হয়ে যায়, তাতে এই মহাবিশ্বের কিছু আসবে যাবে না। বাকি সবকিছু তার নিজের মতোই চলতে থাকবে। অন্তত এটুকু বলা যায় যে মানুষের অনুপস্থিতির কোনো প্রভাব কোথাও পড়বে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে মানুষ জীবনের অর্থ নিয়ে যত কথাই বলুক, তার সবটাই আসলে কল্পনা। জীবনের মধ্যে এইসব অপার্থিব অর্থ কেবল মধ্যযুগের মানুষই খুঁজে বের করেনি, সেটা এখনকার মানবতাবাদী, জাতীয়তাবাদী আর পুঁজিবাদী মানুষেরাও যার যার মতো করে যাচ্ছে। একজন বিজ্ঞানী ভাবে মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার আরেকটু সমৃদ্ধ করাটাই জীবনের অর্থ, সৈনিকের কাছে জীবনের অর্থ হল তার দেশকে রক্ষা করা, আবার একজন উদ্যোক্তার কাছে জীবনের মানে হল নিজের গড়া একটা প্রতিষ্ঠান। মধ্যযুগের অনেক মানুষের কাছে জীবন মানে ছিল ধর্মগ্রন্থ পড়া, ধর্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা আর ধর্মপ্রচারের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তাহলে তাদের সাথে এখনকার এই মানুষগুলোর পার্থক্য আর কী থাকল?
