জীববিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বের উপর জোর দিলেও মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকেও তাঁরা উড়িয়ে দেন না। আমাদের মানসিক অবস্থার একটা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা আছে। যেকোনো দিকেই এই সীমা অতিক্রম করাটা প্রায় অসম্ভব। তবে বিয়ে ও বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো ঘটনায় সেটা হতেও পারে। যে মানুষ জন্মেছেই গড়ে পাঁচ মাত্রার অনুভূতি নিয়ে, তাকে কখনওই রাস্তায় নাচতে দেখা যাবে না। অথচ একটা সুখী বিবাহিত জীবন পেলে তার সুখী ভাবটা মাঝেমধ্যেই সাত মাত্রায় উঠতে পারে। হয়তো সেটা আর তিনের কাছাকাছি যাবেই না।
যদি আমরা সুখের এই জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা মেনে নিই, তাহলে ইতিহাসের আর তেমন গুরুত্ব থাকে না। কারণ ইতিহাস তো আর এসব জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে না। হ্যাঁ, সেরোটনিন নিঃসরণ করার মতো ঘটনা ইতিহাসে আছে বটে, কিন্তু তাতে তো আর মানুষের রক্তে সেরোটোনিনের মাত্রা বদলায় না। কাজেই মানুষের সুখী হওয়ার পিছনে ইতিহাসের কোনো ভূমিকাও নেই।
চলুন, মধ্যযুগের একজন ফরাসি কৃষকের জীবনের সাথে আজকের প্যারিসের একজন ব্যাংক কর্মকর্তার জীবনকে মিলিয়ে দেখি। কৃষক থাকত একটা কাদামাটির ঘরে, সেটা এমনভাবে তৈরি করা যেন সেখান থেকে শূকরের খোঁয়াড়টার উপর নজর রাখা যায়। ওদিকে ব্যাংক কর্মকর্তা থাকে আধুনিক প্রযুক্তির জিনিসপত্রে ভরা একটা বড় দালানের সবচেয়ে উপরতলায়, যার জানালা দিয়ে তাকালেই বিরাট শাঁজেলিসি এভিনিউ দেখা যায়। এটুকু জেনেই আমাদের মনে হয় কৃষকের চেয়ে এই কর্মকর্তার জীবন কত সুখের। অথচ আসল ব্যাপার হল, মানুষের সুখের উপর এই কাদামাটির ঘর, উঁচু দালানের ঘর, শূকরের খোঁয়াড় বা চওড়া রাস্তার কোনো ভূমিকাই নেই। সেরোটোনিনের আছে। সেই মধ্যযুগের কৃষক যখন তার কাদামাটির ঘরটা বানাল, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনে সেরোটোনিন ক্ষরণ শুরু হল। ধরা যাক সেই মুহূর্তে তার সেরোটোনিনের মাত্রা হল X। আবার, ২০১৪ সালে ব্যাংক কর্মকর্তাটি যখন তার নতুন বাসার দামের শেষ কিস্তিটা শোধ করল, তখন তারও সেরোটোনিনের মাত্রা দাঁড়াল X এর কাছাকাছি। অবশ্যই মাটির ঘরের চেয়ে এই দামি বাসায় থাকাটা অনেক বেশি আরামদায়ক, কিন্তু তার জন্য সেরোটোনিন নিঃসরণের কোনো হেরফের হচ্ছে না। কাজেই এই আধুনিক ব্যাংক কর্মকর্তার সুখের পরিমাণ তার কয়েক পুরুষ আগের গরিব কৃষকের চেয়ে একটুও বেশি নয়।
এই ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে যেমন সত্য, সমষ্টিগতভাবেও সেটা একই রকম সত্য। উদাহরণ হিসেবে ফরাসি বিপ্লবের কথাই ধরুন। সে সময়ে বিপ্লবীরা অনেক কিছু করেছিল। তারা রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, কৃষকের হাতে জমির মালিকানা দিয়েছে, মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে, অভিজাতদের বাড়তি সুবিধা পাওয়া বন্ধ করেছে, আর তার সাথে সারা ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। কিন্তু এর কোনো কিছুই ফরাসিদের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। ফলে দেখা গেল এই এত বড় রাজনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসার পরেও ফরাসি জাতির সুখের উপর তার প্রভাব পড়েছে সামান্যই। যারা জন্মগতভাবেই হাসিখুশি তারা বিপ্লবের আগেও যেমন সুখী ছিল পরেও তেমনই ছিল। আবার যারা এমনিতেই বিষণ্ণ ধরনের তারা বিপ্লবের আগে রাজা ষোড়শ লুই ও রাণী আঁতোয়ানেতকে (Marie Antoinette) নিয়ে অভিযোগ করত, বিপ্লবের পরে তারা রোবেস্পিয়ের (Robespierre) আর নেপোলিয়নের নামে বিষোদগার করতে থাকল।
যদি তাই হয়, তাহলে ফরাসি বিপ্লবে লাভটা কী হল? মানুষের সুখ যদি আগের চেয়ে একটুও না বাড়ে, তাহলে এত বিশৃঙ্খলা, ভয়ভীতি, রক্তপাত, যুদ্ধ- এসব কেন? জীববিজ্ঞানীরা এই বিপ্লব করলে তারা কখনোই বাস্তিল (Bastille) দুর্গ আক্রমণ করতে যেত না। মানুষ ভেবেছিল এই রাজনৈতিক বিপ্লব ও সামাজিক সংস্কার তাদের আরও সুখী করবে, কিন্তু তাদের শরীরের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া বার বার তাদের ধোঁকা দিয়েছে।
তবে একটা ব্যাপারের গুরুত্ব আছে। আজ আমরা জানি, আমাদের সুখের মূলে আছে আমাদের শরীরের কিছু জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া। কাজেই এখন আমরা রাজনীতি, সমাজ-সংস্কার, সরকার-বিরোধী কিংবা নৈতিক আন্দোলন- এসবে সময় নষ্ট না করে বরং সেই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াটাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে পারি। কারণ সুখের উৎসটা ওখানেই। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে আর কীভাবে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই গবেষণায় যদি এখন থেকে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে একসময় কোনোরকম বিপ্লব ছাড়াই মানুষ এত সুখী হতে পারবে যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি। এই যেমন প্রোজ্যাক (Prozac) নামের ওষুধটা দেশের সরকারকে গদি থেকে নামাতে পারে না, কিন্তু একজন মানুষের শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তার বিষণ্ণতা দূর করতে পারে।
আজকাল একটা স্লোগান খুব শোনা যায়- ‘সুখের শুরুটা হয় ভিতর থেকে’ (Happiness Begins Within)। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর চেয়ে মোক্ষম স্লোগান আর হয় না। আসলেই, টাকা, সামাজিক মর্যাদা, প্লাস্টিক সার্জারি, সুন্দর বিলাসবহুল বাড়ি, ক্ষমতা- এগুলোর কোনোটাই মানুষকে সুখ এনে দিতে পারে না। স্থায়ী সুখ দিতে পারে কেবল তিনটা জিনিস- সেরোটোনিন, ডোপামিন আর অক্সিটোসিন।১
