জীববিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মানসিকতা ও আবেগঘটিত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে কিছু জৈবরাসায়নিক পদার্থ। এই ব্যবস্থাটা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তৈরি হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে। অন্যান্য সব মানসিক অবস্থার মতোই আমাদের ভালো লাগার অনুভূতিও বাহ্যিক কোনো কিছুর প্রভাবে হয় না। ভালো বেতন, সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক বা রাজনৈতিক অধিকার- এর কোনোটাই আমাদের ভালো লাগার জন্য দায়ী নয়, দায়ী হল একটা জটিল স্নায়ুতন্ত্র যা গড়ে ওঠে কোটি কোটি নিউরন, সেগুলো যেখানে জোড়া লাগে সেই সব সিনাপ্স, আর সেরোটনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মত কিছু জৈবরাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে।
লটারি জিতে কেউ সুখী হয় না। নতুন বাড়ির মালিক হলেও না, চাকরিতে পদোন্নতি পেলেও না, এমনকি সত্যিকার ভালোবাসার মানুষটাকে পেলেও না। মানুষ কেবল একটা জিনিসেই সুখী হয়- যখন তার শরীরে আনন্দের অনুভূতি হয়, তখন। একজন মানুষ যখন লটারিতে অনেকগুলো টাকা পেয়ে যায় কিংবা তার প্রিয় মানুষটাকে খুঁজে পায়, তখন তার আনন্দের যে বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, সেটা কিন্তু ওই টাকা বা মানুষটার জন্য নয়। এর জন্য দায়ী তার রক্তস্রোতে ছুটে বেড়ানো বিভিন্ন হরমোন আর মস্তিষ্কের ভিতরে তড়িৎ সংকেতের ঝড়।
তবে দুঃখের ব্যাপার হল, এই জৈবরাসায়নিক পদ্ধতিটা এমনভাবেই তৈরি হয়েছে যে সেটা আমাদের সুখের মাত্রাটাকে যত খুশি বাড়তে দেয় না। সুখ জিনিসটার উপর প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে না। এই যেমন একজন সুখী সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর জিন বিলুপ্ত হয়ে যায়, আবার প্রবল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা-মায়ের জিন ঠিকই সন্তানের মধ্যে টিকে থাকে। সুখ-দুঃখ মানুষের টিকে থাকা আর বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে- বিবর্তনে এদের ভূমিকা বড়জোর এইটুকুই। হয়তো এমনও হতে পারে যে, বিবর্তনই আমাদের এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে আমাদের সুখ-দুঃখ কোনোটাই খুব বেশি না হয়। তাই আমাদের সাময়িক আনন্দের অনুভূতি হয় ঠিকই, কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না। আগে হোক বা পরে হোক, সুখটুকু মুছে গিয়ে আবার দুঃখকে জায়গা করে দেয়।
উদাহরণ হিসেবে যৌনতার কথা বলা যায়। বিবর্তন পুরুষের জিন নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটাকে আনন্দময় করে তুলেছে। এই আনন্দটুকু না থাকলে খুব কম পুরুষই এই কাজে আগ্রহী হতো। আবার একই সাথে বিবর্তন এমন ব্যবস্থাও করেছে যাতে এই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী না হয়। এই আনন্দ চিরস্থায়ী হলে পুরুষেরা হয়তো খাবার খুঁজতে যেত না, বা অন্য কোনো নারীকেও খুঁজত না।
অনেকে এই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সাথে তুলনা করেন। বাইরে তুষারঝড়ই হোক কিংবা রোদে ঝলসে যাক, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ঘরের ভিতরের তাপমাত্রাকে এক জায়গায় স্থির করে রাখে। কোনো কারণে সাময়িকভাবে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে কিংবা কমে যেতে পারে, কিন্তু এই যন্ত্র আবার সেটাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসে।
এসব যন্ত্রের কোনোটা ঘরের তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখে, কোনোটা বিশে। মানুষের ব্যাপারটাও এমনই। মানুষের সুখ-দুঃখকে এক থেকে দশের মধ্যে নম্বর দিলে এক এক জনের নম্বর এক এক রকম হবে। হয়তো দেখা যাবে সহজাতভাবেই হাসিখুশি কোনো মানুষের মানসিক অবস্থা ছয় থেকে দশের মধ্যে ওঠানামা করে, গড়ে আটের আশেপাশে থাকে। এইরকম একজন মানুষ যদি কোনো ব্যস্ত শহরে একা থাকে, যদি একদিন শেয়ার বাজারে তার সব টাকা লোকসান হয় আর পরের দিনই তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তবু তাকে খুব একটা দুঃখিত হতে দেখা যায় না। আবার অনেকের মানসিক অবস্থা এমনিতেই তিন থেকে সাতের মধ্যে থাকে, গড়ে পাঁচের কাছাকাছি। এরকম একজন মানুষ অনেক বন্ধুবান্ধবের ভিতরে থেকে, লটারিতে কয়েক লাখ টাকা জিতে অলিম্পিক অ্যাথলেটদের মত স্বাস্থ্য নিয়েও মন খারাপ করে থাকে। আসলেই, আমাদের সবচেয়ে মনমরা বন্ধুটা যদি একদিন সকালে উঠেই দেখে সে এক কোটি টাকার লটারি জিতে গেছে, তারপর দুপুরবেলার মধ্যে এইডস আর ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলে, বিকাল নাগাদ ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে একটা শান্তিচুক্তি করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেখে যে তার কয়েক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটা ঘরে ফিরে এসেছে, তবু তার খুশির মাত্রা সাতের উপরে ওঠে না। ঘটনা যা-ই হোক, তার মস্তিষ্কটাই আসলে খুব বেশি খুশি হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।
নিজের আশেপাশের মানুষদের কথাই ভাবুন। এমন একজনকে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন যে যেকোনো অবস্থায় হাসিখুশি থাকতে পারে। আবার এমন কাউকেও পাবেন যে কোনো কিছুতেই খুশি হয় না। আমাদের ধারণাটাই হয়ে গেছে এমন যে আমরা ভাবি একটা ভালো জায়গায় কাজ করলে, বিয়ে করলে, অর্ধেক লেখা উপন্যাসটা শেষ করলে, নতুন একটা গাড়ি কিনলে কিংবা ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া টাকাটা শোধ করে দিলে তার মতো সুখ আর কিছুতে নেই। কিন্তু সেই ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেলেও দেখা যায় সেই সুখ আর আসে না। কারণ গাড়ি কেনা বা উপন্যাস লেখা আমাদের ভিতরে স্থায়ী কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায় না। একটা সাময়িক সুখের অনুভূতি দিতে পারে বড়জোর, কিন্তু সেটা কেটে যেতেও সময় লাগে না।
তাহলে একটু আগে যে সুখের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল, তার সাথে এই জৈবরাসায়নিক ব্যাখ্যার সামঞ্জস্যটা কোথায়? এই যেমন, বিবাহিত মানুষ অবিবাহিত মানুষের চেয়ে বেশি সুখী হয়- তার ব্যাখ্যা কী? প্রথমে এটা মেনে নিতে হবে যে, বিয়ে করা আর সুখী হওয়া- কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এ দুটো ঘটনা একসাথে হওয়ার উদাহরণ অনেক বেশি আছে বটে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে একটার কারণে অন্যটা হচ্ছে। হ্যাঁ, একজন গড়পড়তা বিবাহিত মানুষ একজন অবিবাহিত মানুষের চেয়ে সুখী, কিন্তু তাই বলে এটা বলা যাবে না যে বিয়েই তার সুখের উৎস। বরং উল্টোটা হতে পারে- সুখটাই আসলে বিয়ের কারণ। আসলে সেরোটনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিন- এই তিনটাই বিয়ে হওয়া ও বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য দায়ী। অনেক মানুষ জন্মগতভাবেই হাসিখুশি ধরনের হয়। এরকম একজন মানুষ জীবনসঙ্গী হিসেবেও ভালো হওয়ার কথা, কাজেই তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার একজন বিষণ্ণ মানুষের চেয়ে একজন হাসিখুশি মানুষের সাথে বসবাস করা বেশি উপভোগ্য, তাই এরকম মানুষের বিবাহ-বিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনাও কম। কাজেই দুদিক থেকেই চিন্তা করলে দেখা যাচ্ছে গড়ে একজন বিবাহিত মানুষ একজন অবিবাহিত মানুষের চেয়ে সুখী, কিন্তু তার মানে এটা নয় যে একজন বিষণ্ণ মানুষ বিয়ে করে ফেললেই রাতারাতি সে একজন সুখী মানুষ হয়ে যাবে।
