এই চিন্তাধারাটা মেনে নেওয়া একটু কঠিন। সমস্যার শেকড়টা আসলে লুকিয়ে আছে আমাদের মনস্তত্ত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি ভুল প্রবণতার মাঝে। আমরা যখন ভাবি যে অন্যরা কতটা সুখী বা আগের মানুষেরা কতটা সুখী ছিল, আমরা সবসময় তাদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু সেটা ঠিক নয়, কারণ এভাবে চিন্তা করতে গেলে আমরা অন্যের উপর নিজের চাহিদাগুলো চাপিয়ে দিই। এখনকার যেকোনো সমৃদ্ধ সমাজে প্রতিদিন গোসল করে নতুন কাপড় পরাটাই রীতি। অথচ মধ্যযুগের একজন কৃষক গোসল না করেই মাসের পর মাস কাটিয়ে দিত। কাপড়ও বদলাত কালে ভদ্রে। এটা চিন্তা করলে আমাদের গা গুলিয়ে আসতে পারে, কিন্তু তাদের এতে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তারা তাদের দীর্ঘদিন গোসল-না-করা শরীর আর ময়লা দুর্গন্ধময় কাপড়েই অভ্যস্ত ছিল। এমন নয় যে তারা নতুন কাপড় চায় কিন্তু সেটা পাচ্ছে না- বরং তাদের যা ছিল সেটা নিয়েই তারা সন্তুষ্ট ছিল। কাজেই কাপড় যতদিন টেকে ততদিন তারা সুখী।
অবশ্য একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, এতে আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের বিবর্তনীয় আত্মীয় শিম্পাঞ্জিদের কথাই ধরুন। তারাও গোসল করে না বললেই চলে, আর কাপড় বদলানোর ঝক্কি তো তাদের নেইই। আমাদের পোষা বিড়াল-কুকুরও রোজ গোসল করে নতুন কাপড় পরে না। তবু আমরা তাদের কোলে নিই, গায়ে হাত বুলাই। মানবশিশুদের বেলায়ও দেখা যায় তারা গোসল করতে পছন্দ করে না, অথচ বাবা-মায়ের শিক্ষা ও শাসনে থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা এই অদ্ভুত রীতিতে দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে যায়। সবই আসলে চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপার।
যদি সুখের সংজ্ঞা হয় ইচ্ছাপূরণ, তাহলে বলতে হয় দুটো জিনিস আমাদের সুখের সঞ্চয় খালি করে দিচ্ছে। একটা হল গণমাধ্যম, অন্যটা হল বিজ্ঞাপন শিল্প। ৫০০০ বছর আগের কোনো গ্রামের একজন আঠারো বছর বয়সী মানুষ নির্দ্বিধায় নিজেকে একজন আকর্ষণীয় মানুষ ভাবতে পারত। কারণ তার গ্রামে আর যে জনাপঞ্চাশেক মানুষ ছিল তাদের বেশিরভাগই হয় বৃদ্ধ নয়তো একেবারে শিশু। কিন্তু আজকের দিনে এরকম বয়সের একজন মানুষ সেই সন্তুষ্টিটুকু না পেয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। তার স্কুলের বাকি সবাই যদি দেখতে খারাপও হয়, তাতেও তার শান্তি নেই, কারণ সে নিজেকে তুলনা করছে চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা, খেলোয়াড় কিংবা সুপারমডেলদের সাথে। আমাদের টেলিভিশন, রাস্তার পাশের বিলবোর্ড আর ফেসবুক তাকে এই তুলনাটা করতে বাধ্য করছে।
কাজেই এমনটাও হতে পারে যে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষের অশান্তির কারণ শুধু দারিদ্র্য, রোগবালাই, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই নয়, তার সাথে যুক্ত হয়েছে উন্নত বিশ্বের জীবনধারাও। দ্বিতীয় রামেসেস বা ক্লিওপেট্রার যুগের চেয়ে হোসনি মোবারকের মিশরে একজন মানুষের না খেয়ে, রোগে ভুগে বা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। দুটোকে মিলিয়ে দেখলে ২০১১ সালে মিশরের একজন নাগরিকের তার সৌভাগ্যের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে নাচানাচি করার কথা। অথচ তারা মোবারককে গদি থেকে নামানোর জন্য আন্দোলন করছে। এর কারণ হল তারা নিজেদের অবস্থাকে ফারাওদের মিশরের সাথে তুলনা করে দেখছে না, তুলনা করছে সমসাময়িক ওবামার আমেরিকার সাথে।
যদি এমনই চলতে থাকে, তাহলে অমরত্বও মানুষকে সুখ দিতে পারবে না। ধরুন বিজ্ঞান একদিন সব রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলল, অথবা মানুষের বয়স বেড়ে যাওয়া ঠেকিয়ে দিয়ে মানুষের চিরযৌবনের অধিকারী হওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলল। তাহলে তার অবধারিত ফলাফল হবে পৃথিবীজুড়ে তীব্র আক্রোশ আর প্রবল দুশ্চিন্তার মহামারী।
এই ধরনের কোনো কিছু যদি কখনও আবিষ্কার হয়, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ, যাদের এটা কেনার সামর্থ্য নেই, তারা রাগে ফেটে পড়বে। ইতিহাসে সবসময় একটা জিনিস দেখা গেছে- গরিব-দুঃখী মানুষ একটা জায়গায় সান্ত্বনা খুঁজে পায়- যে মৃত্যুর কাছে ধনী-গরিব সব সমান। সেই জায়গাটাও আর থাকবে না, দেখা যাবে গরিব মানুষ ঠিকই একদিন মারা যাবে আর ধনীরা চিরযৌবন নিয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

আবার এই অমরত্ব পাওয়ার সামর্থ্য যাদের হবে তারাও যে খুব সুখে থাকবে- এমন নয়। তাদেরও দুশ্চিন্তা থাকবে। এই ব্যবস্থা আয়ু বাড়াতে পারলেও মৃতকে তো আর জীবন দিতে পারবে না। কাজেই গাড়িচাপা পড়ে বা সন্ত্রাসীদের বোমা হামলার মারা পড়ার আশঙ্কাটা থেকেই যাচ্ছে। তাই অমরত্ব পাওয়া মানুষ ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে, সামান্যতম ঝুঁকির ভিতরেও তারা যেতে চাইবে না। আর জীবনসঙ্গী, সন্তান বা বন্ধুর মতো প্রিয়জন হারানোর বেদনাটাও তাদেরই হবে সবচেয়ে বেশি।
রাসায়নিক সুখ
সমাজবিজ্ঞানীরা নানারকম প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মানুষের ভালো থাকার সাথে বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সম্পর্ক দেখাতে পারেন। জীববিজ্ঞানীরাও একই পদ্ধতিতেই কাজ করেন, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে বিভিন্ন জৈবরাসায়নিক ও জিনগত বিষয়ের প্রভাব দেখান। তবে তাদের ফলাফলগুলো আরও বিস্ময়কর।