শারীরিক সুস্থতার সাথে সুখের সম্পর্কটাও লক্ষণীয়। জরিপে দেখা যায়, অসুখবিসুখ সাধারণত মানুষকে সাময়িকভাবে অসুখী করে। তবে রোগটা যদি যন্ত্রণাদায়ক হয়, অথবা যারা অনেকদিন ধরে কোনো রোগে ভুগছে, তাদের জন্য সেটা বিরাট অশান্তির কারণ। যারা ডায়াবেটিসের মতো দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়, তারা প্রথমে কিছুদিন প্রচুর অশান্তিতে ভোগে। কিন্তু তাদের শারীরিক অবস্থার যদি অবনতি না হয়, তাহলে তারা সেই অশান্তির সাথে ধীরে ধীরে নিজেদের মানিয়ে নেয়, ফলে একসময় তারা সুস্থ মানুষদের মতোই সুখী জীবনে ফিরে আসে। ধরুন লুসি আর লুক কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের দুই যমজ ভাই-বোন। একটা তথ্য সংগ্রহের জরিপে অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে দুটো ঘটনা ঘটল। রাস্তায় একটা বাস লুসির গাড়িটাকে ধাক্কা দিল, ফলে গাড়ি তো গুঁড়িয়ে গেলই, লুসির শরীরের অনেকগুলো হাড় ভাঙল, আর একটা পা অকেজো হয়ে গেল সারা জীবনের জন্য। ওদিকে লুকের কাছে একটা ফোন এল। লুক জানতে পারল, সে এক কোটি ডলারের লটারি জিতে গেছে! দুবছর পর দেখা যাবে লুসি খুঁড়িয়ে হাঁটছে আর লুক অনেক দামী গাড়িতে চড়ছে। তখন যদি দুবছর আগের সেই জরিপে আবার তাদের অংশগ্রহণ করতে বলা হয়, সম্ভবত দুজনেরই বেশিরভাগ উত্তর আগের সেই দিনটার মতোই হবে।
সুখের উপর টাকা আর স্বাস্থ্যের চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের প্রভাব আরও বেশি বলেই দেখা যায়। যেসব মানুষের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল অথবা যারা অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে খুব বেশি সহযোগিতা পায়নি (অথবা নেয়নি), তাদের চেয়ে দৃঢ় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে থাকা মানুষেরা বেশি সুখী হয়। বিয়ে জিনিসটা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে নানা সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দর বৈবাহিক জীবনের সাথে ভালো থাকা সরাসরি সম্পর্কিত। এই সম্পর্কটা আর্থিক অবস্থা, এমনকি শারীরিক সুস্থতার হেরফের হলেও খাটে। আন্তরিক জীবনসঙ্গী, পরিবার ও উষ্ণ সামাজিক পরিবেশ পেলে একজন হতদরিদ্র অসুস্থ মানুষও একজন একাকী কোটিপতি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সুখী জীবন কাটাতে পারে। তবে দারিদ্র্য খুব বেশি হলে বা কোনো যন্ত্রণাদায়ক রোগে আক্রান্ত হলে ফলাফল কিছুটা ভিন্ন হতেও পারে।
এসব থেকে আরেকটা সম্ভাবনা দেখা যায়। গত দুইশ বছরে মানুষের বস্তুগত দিক থেকে প্রাচুর্য এসেছে। তাই এমনও হতে পারে যে এই প্রাচুর্যই পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার ক্ষতি খানিকটা পূরণ করে দিচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে ১৮০০ সালের একজন মানুষের চেয়ে এখনকার গড়পড়তা একজন মানুষের বেশি সুখী হওয়ার কথা নয়। এমনকি আমরা যে স্বাধীনতাকে এত গুরুত্ব দিই, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য খারাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের এখন জীবনসঙ্গী, বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আছে। আবার তাদেরও তো স্বাধীনতা আছে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার! আমাদের নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো সাজানোর স্বাধীনতা যত বাড়ছে, যেকোনো ধরনের বন্ধনে জড়িয়ে পড়াটাও ততই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই এসব বন্ধন আলগা হতে হতে আমরা ক্রমেই একাকী জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
তবে এসব গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল, সুখ আসলে সম্পদ, সুস্বাস্থ্য বা সামাজিক বন্ধনের উপর নির্ভর করে না। বরং সেটা নির্ভর করে মানুষের অবস্থা ও তার ব্যক্তিগত চাহিদার উপর। যদি কেউ একটা গরুর গাড়ি চায়, তাহলে গরুর গাড়ি পেলেই সে সন্তুষ্ট, আর কিছু দরকার নেই। কিন্তু কেউ যদি একটা ঝকঝকে নতুন ফেরারি গাড়ি চায়, একটা পুরনো ফিয়াট গাড়ি পেয়ে তার মন ভরবে না, এটাই স্বাভাবিক। এজন্যই লটারি জেতা আর ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনা দুটোই, অনেক সময় পরে, মানুষকে একই অবস্থায় নিয়ে যায়। যখন আমাদের অবস্থা ভালো থাকে, আমাদের চাহিদাগুলোও ফুলেফেঁপে ওঠে, তাই বড় বড় প্রাপ্তিগুলোও তখন আমাদের সুখ দিতে পারে না। আবার যখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, তখন আশার বেলুনও চুপসে যায়, তাই সেই খারাপ পরিস্থিতিতেও নিজেকে অসুখী মনে হয় না।
এখন মনে হতে পারে, এ আর নতুন কী, আর এসব জানার জন্য এত গবেষণারই বা কী আছে। আমরা কী চাই তার চেয়ে আমাদের যা আছে তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট কি না এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ- এ কথা তো ধর্মগুরু, কবি আর দার্শনিকেরা কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই বলে আসছে। তবু আমাদের আধুনিক গবেষণার ফল আমাদের প্রাচীন পূর্বসূরীদের চিন্তার সাথে মিলে যাচ্ছে এটা দেখতে ভালোই লাগে।
সুখের ইতিবৃত্ত জানতে হলে আগে আমাদের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে হবে। সুখ যদি কেবলই স্বাস্থ্য, সম্পদ আর সামাজিক সম্পর্কের মতো কিছু ব্যক্তি-নিরপেক্ষ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল হতো তাহলে বিষয়টা একটু সহজ হতো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সুখ আসলে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উপর নির্ভরশীল, যা প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা আলাদা। তাই সেটা তলিয়ে দেখাটাও বেশ কঠিন। আমাদের এখন অনেক রকম ব্যথানাশক অথবা ঘুমের ওষুধ আছে। কিন্তু সুখ-শান্তির ব্যাপারে আমাদের চাহিদা আর নানা বিষয়ে অসহিষ্ণুতা এত বেড়ে গেছে যে আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি দুঃখ-বেদনা সহ্য করতে হচ্ছে।
