সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির টেকটনিক প্লেটে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। ইতিহাসের অনেক অভিজাতরা, যেমন হান নেতারা, সম্ভ্রান্ত ভাইকিংরা এবং অ্যাজটেক পুরোহিতেরা যুদ্ধ ব্যাপারটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন। অন্যরা এটাকে খারাপ কিছুই মনে করত কিন্তু এও জানত যে যুদ্ধ এড়ানো যাবে না। সুতরাং সেখান থেকে কোন লাভ করতে পারলেই ভালো। আমরাই ইতিহাসে প্রথম এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন সব সম্ভ্রান্তরাই শান্তিপ্রিয়। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পী এরা সবাই সত্যিকার অর্থেই মনে করে যুদ্ধ খুবই খারাপ এবং এটাকে এড়ানোও সম্ভব। (পূর্বেও শান্তিপ্রিয় সম্ভ্রান্ত লোকজন ছিল, যেমন প্রথম দিককার খ্রিস্টানরা, কিন্তু কালেভদ্রে যখনই তারা ক্ষমতা পেত, তখনি তারা তাদের “অন্য গাল পেতে দেয়া”র মন্ত্রটা ভুলে যেত।)
এই চারটে দিকের মধ্যেই কিন্তু আবার একটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া চক্র কাজ করে। পারমাণবিক হত্যাকাণ্ডের হুমকি শান্তিবাদকে চালিত করে, যখন শান্তির বার্তা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন যুদ্ধ দূরে সরে যায় আর বাণিজ্যের প্রসার হয়, আর এই বাণিজ্যের প্রসার পক্ষান্তরে শান্তির লাভ আর যুদ্ধের লোকসানকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সময়ের সাথে সাথে এই প্রতিক্রিয়া চক্র যুদ্ধের জন্য আরেকটা বাধা তৈরি করে, যেটা হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। জালের মত ছড়িয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের শক্ত বন্ধন বেশিরভাগ দেশেরই স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে। এর ফলে যেটা হয়, এদের মধ্যে কোনো একটা দেশ যে একা একাই যুদ্ধ বাধিয়ে বসবে সেই সম্ভাবনাটা প্রায় নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ দেশই যে পুরো মাত্রার যুদ্ধে আর জড়ায় না তার একটা খুব সহজ কারণ হল তারা আর মোটেই স্বাধীন নেই। যদিও ইসরায়েল, ইটালি, মেক্সিকো কিংবা থাইল্যান্ডের লোকজন হয়তো স্বাধীনতার একটা মোহ ধারণ করে, কিন্তু সত্যি বলতে তাদের সরকারের পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাধীন অর্থনৈতিক অথবা বৈদেশিক নীতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আর নিশ্চিতভাবেই তাদের পক্ষে কোন পুরো মাত্রার যুদ্ধ নিজে নিজে শুরু করা সম্ভব না। এগারো অধ্যায়ে যেমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি একটা বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের উত্থান। আগের সব সাম্রাজ্যের মতই এই সাম্রাজ্যও এর নিজের সীমারেখায় শান্তি নিশ্চিত করে। আর যেহেতু এর সীমারেখা হল পুরো পৃথিবী, তার মানে এই “বিশ্ব সাম্রাজ্য” কার্যকরভাবেই বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করে।
সুতরাং, আধুনিক যুগ মানে কি মস্তিষ্কবিবর্জিত হত্যাকাণ্ড? যুদ্ধ আর নিপীড়ন? যার চরিত্রায়ন করা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দিয়ে? হিরোশিমার উপর পারমাণবিক মেঘ দিয়ে? এবং হিটলারের রক্তাক্ত উন্মাদনা দিয়ে? নাকি এই যুগ হল শান্তির? যার চরিত্রায়ন করা যায় দক্ষিণ আমেরিকার খনন না হওয়া পরিখাটি দিয়ে? মস্কো বা নিউইয়র্কের মাথার উপর যে পারমাণবিক মেঘটা কখনও ওড়েনি সেটা দিয়ে? নাকি মহাত্মা গান্ধী এবং মার্টিন লুথার কিংয়ের অমলিন মুখ দিয়ে?
উত্তরটা সময়ই বলে দেবে। অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণাটা মাত্র ক’বছর আগের কিছু ঘটনার কারণে অনেক সময়েই বিকৃত হয়ে যায়। এই অধ্যায়টা যদি ১৯৪৫ কিংবা ১৯৬২ সালে লেখা হত এর চেহারা হয়তো অনেক মলিন হত। যেহেতু এটা লেখা হয়েছে ২০১৪তে এই আধুনিক সময়ে, তাই এটা বেশ প্রাণবন্ত।
আশাবাদী এবং নিরাশাবাদী দুই দলকেই খুশি করতে হলে আমরা এভাবে বলে শেষ করতে পারি যে, আমরা স্বর্গ এবং নরক দুটোরই খুব কাছাকাছি আছি। খুব অস্থিরভাবে একটার দরজা থেকে অন্যটার অভ্যর্থনাকক্ষের দিকে ছোটাছুটি করছি। ইতিহাস এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি আমরা কোন দিকে শেষমেশ যাব। মাত্র অল্প কিছু ঘটনার যোগসূত্র আমাদেরকে যেকোনো দিকেই ঠেলে দিতে পারে।
————–
* একটি “অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়” বলতে এমন একদল মানুষকে বোঝায় যারা নিজেদেরকে খুব ভালভাবে চেনে এবং টিকে থাকার জন্য একে অপরের উপর নির্ভরশীল।
————–
1 Vaclav Smil, The Earth’s Biosphere: Evolution, Dynamics and Change (Cambridge, Mass.: MIT Press, 2002); Sarah Catherine Walpole et al., ‘The Weight of Nations: An Estimation of Adult Human Biomass’, BMC Public Health 12:439 (2012), http://www.biomedcentral.com/1471–2458/12/439.
2 William T. Jackman, The Development of Transportation in Modern England (London: Frank Cass & Co., 1966), 324–7; H. J. Dyos and D. H. Aldcroft, British Transport-An Economic Survey From the Seventeenth Century to the Twentieth (Leicester: Leicester University Press, 1969), 124–31; Wolfgang Schivelbusch, The Railway Journey: The Industrialization of Time and Space in the 19th Century (Berkeley: University of California Press, 1986).
3 For a detailed discussion of the unprecedented peacefulness of the last few decades, see in particular Steven Pinker, The Better Angels of Our Nature: Why Violence Has Declined (New York: Viking, 2011); Joshua S. Goldstein, Winning the War on War: The Decline of Armed Conflict Worldwide (New York: Dutton, 2011); Gat, War in Human Civilization.
