অনেকে মনে করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যুদ্ধের অনুপস্থিতি পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলোর জন্য একেবারে নতুন একটা অভিজ্ঞতা। সত্যি বলতে কি, প্রথমে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরেই সেটা ইউরোপে পৌঁছায়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ছিল ১৯৪১ সালের পেরু-ইকুয়েডরের যুদ্ধ এবং ১৯৩২ সালের বলিভিয়া-প্যারাগুয়ের যুদ্ধ। এসবের আগে দক্ষিণ আমেরিকায় বেশ বড়সড় একটা যুদ্ধ লেগেছিল ১৮৭৯-৮৪ সালে চিলির সাথে বলিভিয়া আর পেরুর।
আমরা আরব এলাকাটাকে একদমই শান্তিপূর্ণ মনে করি না। অথচ স্বাধীনতার পর আরব দেশগুলোর মধ্যে মাত্র একবার পুরো মাত্রায় যুদ্ধ বেধেছিল (১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ)। সীমান্তে বেশ কিছু ঝামেলা হয়েছিল (সিরিয়া আর জর্ডানের মধ্যে, ১৯৭০ সালে), বেশ কিছু সেনা অনুপ্রবেশ (লেবাননে সিরিয়ার প্রবেশ), অসংখ্য গৃহযুদ্ধ (আলজেরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া) এবং অগুনতি সেনা অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহও হয়েছিল। এতকিছুর পরও, এক উপসাগরীয় যুদ্ধ ছাড়া আরব দেশগুলোর মধ্যে কোন পূর্ণ মাত্রার আন্তর্জাতিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। এমনকি পুরো মুসলিম জগতের সীমানা বাড়ানোর প্রচেষ্টার উদাহরণও পাওয়া যায় মাত্র একটা, ইরান-ইরাক যুদ্ধ। কখনই তুরস্ক-ইরান, পাকিস্তান-আফগানিস্তান কিংবা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া যুদ্ধ বাধেনি।
আফ্রিকার ব্যাপারটা খুব একটা সুখকর না। কিন্তু সেখানেও বেশিরভাগ দ্বন্দ্বই ছিল গৃহযুদ্ধ অথবা সেনা অভ্যুত্থান। যেহেতু আফ্রিকার দেশগুলো স্বাধীনতা পেয়েছে অনেক পরে ১৯৬০-৭০ এর দিকে, মাত্র অল্প কয়েকটা দেশই একে অপরের উপর আক্রমণ করেছে দখল করার আশায়।
অতীতেও তুলনামূলক শান্ত কিছু সময় ছিল, যেমন ১৮৭১ থেকে ১৯১৪ সালের ইউরোপ। এরপরের সময়টা অবশ্য সব খারাপকে ছাপিয়ে গেছে। এখন ব্যাপারটা একদম অন্যরকম। সত্যিকার শান্তি কিন্তু শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি না। এখন সত্যিকার অর্থেই শান্তি বিরাজ করছে পৃথিবীতে। ১৮৭১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যেও কিন্তু একটা ইউরোপীয় যুদ্ধ প্রায় অবশ্যম্ভাবী ছিল। তখনকার সেনাবাহিনী, রাজনীতি এবং এমনকি সাধারণ নাগরিকের উপরও যুদ্ধের আশংকার প্রভাব ছিল। ইতিহাসের অন্য সব শান্তিপূর্ণ সময়ের জন্যও এই একই লক্ষণ প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা চিরন্তন বিধান ছিলঃ “যে কোনো দুটো প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এমন কিছু পরিস্থিতির তৈরি হবে যে তারা বছর খানেকের মধ্যেই একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে”। এই “জঙ্গলের নিয়ম” সক্রিয় ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে, প্রাচীন চীনে এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রিসে। স্পার্টা এবং এথেন্স যদি ৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পারস্পরিক শান্তিতে থেকে থাকে তাহলে খুব ভালো একটা সম্ভাবনা ছিল যে এর পরের বছর, ৪৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই তারা আবার যুদ্ধে জড়াবে।
আজ মানবজাতি সেই জঙ্গলের আইন ভেঙ্গে ফেলেছে। অবশেষে শুধু যে যুদ্ধবিগ্রহ মিটেছে তাই না, সত্যিই শান্তি এসেছে। এখনকার বেশিরভাগ রাজনীতির ক্ষেত্রেই এমন কোন সম্ভাবনা দেখা যায় না যে বছরখানেকের মধ্যেই তারা যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে। সামনের বছরেই জার্মানি আর ফ্রান্সের যুদ্ধে জড়ানোর কোন কারণ আছে কি? অথবা চীন এবং জাপান? অথবা ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা? সীমান্তে ছোটখাট ঝামেলা হয়তো হলেও হতে পারে। কিন্তু এই ২০১৭ সালেই যদি রীতিমত ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি করতে হয় তাহলে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে আগেকার আমলের মত পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ বাধতে হবে। আর্জেন্টিনা হয়তো তার সেনাবাহিনী দিয়ে সবকিছু গুড়িয়ে দিয়ে রিও’র দরজায় পৌঁছে যাবে আর ব্রাজিলের কার্পেট-বোমা ফেলে হয়তো বুয়েনস আইরেসের আসেপাশের এলাকা গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলবে। এরকম যুদ্ধ অবশ্য এখন হতে পারে বেশ কিছু দেশের মধ্যে, যেমন ইসরায়েল আর সিরিয়া, ইথিওপিয়া আর এরিত্রিয়া অথবা আমেরিকা আর ইরান। কিন্তু এগুলো সবই আসলে ব্যতিক্রম যেটা প্রমাণ করে যে জঙ্গলের আইনটা আসলে আর টিকে নেই।
ভবিষ্যতে হয়তো এই অবস্থার পরিবর্তন হবে এবং তারপরই হয়তো আমাদের বোধোদয় হবে যে, আজকের দিনের দুনিয়া আসলে খুবই সাদাসিধে। তারপরও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, আমাদের এই সাদাসিধে ভাবটা খুবই চমকপ্রদ। এর আগে কখনও এতটা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসেনি যে মানুষজন যুদ্ধের কথা প্রায় ভুলেই যাবে।
বিশেষজ্ঞরা এই দারুণ সুখের ব্যাপারটা এত এত বই এবং প্রবন্ধে লিখেছেন যে আপনি পড়েই শেষ করতে পারবেন না। তারা এর কিছু উল্লেখযোগ্য দিকও চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, যুদ্ধের মূল্যটা নাটকীয়ভাবে অনেক বেড়ে গেছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারটা আসলে রবার্ট ওপেনহাইমার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গকে দেয়া উচিত পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য। পারমাণবিক অস্ত্রগুলোর কারণেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধটা অনেকটা সামগ্রিক আত্মহত্যার মতো হয়ে যায়। আর এই কারণেই অস্ত্রের মুখে পৃথিবী শাসন করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, একদিকে যেমন যুদ্ধের মূল্যটা বেড়েছে একই সাথে তার মুনাফাও কমে গেছে। ইতিহাসের প্রায় পুরোটা জুড়েই রাজনৈতিক শক্তিগুলো শত্রু এলাকায় লুট দখলের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি করতে পারত। বেশিরভাগ সম্পদই ছিল শস্যক্ষেত্র, গবাদিপশু, দাস এবং স্বর্ণ। এগুলো হাতিয়ে নেয়াটা সহজ ছিল। কিন্তু আজকের দিনে, সম্পদ বলতে মূলত বোঝায় মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আর ব্যাংকের মত আর্থ-সামাজিক কাঠামো। সঙ্গত কারণেই এই জিনিসগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়া বা স্থানান্তরিত করা খুবই কঠিন।

ক্যালিফোর্নিয়ার কথাই ধরুন। প্রাথমিক দিকে এর মূল সম্পদ ছিল বেশ কিছু সোনার খনি। কিন্তু আজ এর ভিত্তিই হল সিলিকন আর সেলুলয়েড – সিলিকন ভ্যালি এবং হলিউডের সেলুলয়েড পাহাড়। এখন যদি চীনারা ক্যালফোর্নিয়ায় সশস্ত্র আক্রমণ করে? সানফ্রানসিসকোর সমুদ্রসৈকতে লাখ লাখ সৈন্য নামায়? তারা কিন্তু আসলে খুব বেশি কিছু পাবে না। সিলিকন ভ্যালিতে কোন সিলিকনের খনি নেই। বেশিরভাগ সম্পদই আসলে আছে গুগলের প্রকৌশলী কিংবা হলিউডের লেখক, পরিচালক কিংবা বিশেষ দৃশ্য নির্মাতাদের মাথায় যারা কিনা চীনের আক্রমণের আগেই প্রথম প্লেনটা ধরে ব্যাঙ্গালোর কিংবা মুম্বাইয়ে চলে যাবে। এই কারণেই এটা মোটেই কাকতালীয় নয় যে এখনো যেসব পূর্ণমাত্রার আন্তর্জাতিক যুদ্ধ হয়, যেমন ইরাকের কুয়েত আক্রমণ, এগুলো এমন সব জায়গাতেই হয় যেখানে সম্পদগুলো পুরনো আমলের মত বস্তুগত। কুয়েতের শেখরা হয়তো পালিয়ে যেত কিন্তু তাদের তেল খনিগুলো থেকে যেত এবং দখল হয়ে যেত।
যখনই যুদ্ধ ব্যাপারটা অনেক কম লাভজনক হয়ে গেল, শান্তি তখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে লাগলো। শান্তি যে খুব লাভ এনেছে তা না, কিন্তু শান্তি আসায় অন্তত যুদ্ধের মূল্যটাতো এড়ানো গেছে। যদি ১৪০০ সালের ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে শান্তি বিরাজ করত, তাহলে ফরাসিদের যুদ্ধের জন্য চড়া মূল্যও দিতে হতো না, আবার ভয়ঙ্কর ইংরেজ ধ্বংসযজ্ঞও সইতে হতো না। কিন্তু অন্য কোনোভাবে তাদের পকেটও ভরতো না। গতানুগতিক কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে দূরবর্তী বাণিজ্য কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেকটা বাড়তি অলংকারের মত ছিল। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগই সর্বেসর্বা। সুতরাং শান্তি বেশ লাভজনক। যতক্ষণ পর্যন্ত চীন এবং আমেরিকার মধ্যে শান্তি বিরাজ করছে, চীনারা আমেরিকায় পণ্য বেচে, ওয়াল স্ট্রিটে ব্যবসা করে এবং আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে নিজেদের উন্নতি করতে পারবে।