সাম্রাজ্যের পতন
১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রের অধীনে হিংস্রতা বেড়েছে নাকি কমেছে এটা আসলে তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু যে ব্যাপারটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না সেটা হল, আন্তর্জাতিকভাবে হিংস্রতা এখন ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতন সম্ভবত এর পক্ষে সবচেয়ে জোরালো উদাহরণ। ইতিহাসজুড়ে সাম্রাজ্যগুলো বিদ্রোহীদের শক্তহাতে দমন করে এসেছে। যখন তার শেষের ঘণ্টা বেজেছে, তখন একটি ডুবন্ত সাম্রাজ্য তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা করেছে, যার ফলাফল হয়েছে রক্তগঙ্গা। এর চূড়ান্ত পতন ডেকে এনেছে অরাজকতা এবং যুদ্ধ। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই নিজে থেকে শান্তিপুর্ণভাবে সরে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। তাদের পতনের ধরনটা হয়েছে বেশ দ্রুত, শান্ত এবং সুশৃঙ্খল।
১৯৪৫ সালে ব্রিটেন পুরো পৃথিবীর প্রায় চার ভাগের একভাগ শাসন করত। ৩০ বছর পর শাসন করত কেবল ছোট ছোট কিছু দ্বীপ। মাঝের এই কয়েক যুগে ব্রিটেন তার বেশিরভাগ উপনিবেশ থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে সরে এসেছে। যদিও মালয় এবং কেনিয়ার মত কিছু কিছু জায়গায় তারা অস্ত্রের জোরে টিকে থাকতে চেয়েছে, তবু বেশিরভাগ জায়গাতেই তারা তাদের সাম্রাজ্যের পতনটা কোন উচ্চবাচ্য ছাড়াই একরকম অক্ষম দীর্ঘশ্বাসের সাথেই মেনে নিয়েছে। তারা তাদের সকল প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করেছিল যথাসম্ভব মসৃণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিকে, ক্ষমতা ধরে রাখার দিকে নয়। মহাত্মা গান্ধী অহিংস আন্দোলনের জন্য যে পর্বত প্রমাণ প্রশংসা পেয়ে থাকেন তার কিছুটা কৃতিত্ব আসলে ব্রিটিশ সরকারকেও দিতে হয়। অনেক বছরের তিক্ততা ও হিংস্র লড়াই সত্ত্বেও যখন ব্রিটিশ রাজের দিন ফুরিয়ে আসলো তখন কিন্তু ভারতীয়দের দিল্লী বা কলকাতার রাস্তায় নেমে ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়নি। সাম্রাজ্যের জায়গাটা নিয়েছিল কিছু স্বাধীন রাষ্ট্র, যারা এর আগ পর্যন্ত একসঙ্গে মিলে মিশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত। এটা সত্য যে, হাজার হাজার মানুষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। কিছু কিছু জায়গায় সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে শুরু হয়েছে জাতিগত দাঙ্গা (বিশেষ করে ভারতে)। তারপর দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা করলে বৃটিশদের প্রস্থান শান্তি ও শৃঙ্খলার এক উদাহরণ ছিল। ফরাসি সাম্রাজ্য বরং এর চেয়ে অনেক বেশি একগুঁয়ে ছিল। তাদের পতনের সময় পলায়নপর সৈন্যরা হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। ভিয়েতনাম এবং আলজেরিয়া তার সাক্ষী হয়ে আছে। তবু ফরাসিরা অন্য সব জায়গা থেকে বেশ দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবেই প্রস্থান করেছিল এবং রেখে এসেছিল একটি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল দেশ।
১৯৮৯ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ছিল আরও শান্তিপূর্ণ। যদিও বলকান, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার কিছু জায়গায় জাতিগত দাঙ্গা লেগেছিল তারপরও বলা যায়, ইতিহাসে এর আগে এত বড় কোন সাম্রাজ্যের পতন এত দ্রুত এবং এত শান্তভাবে হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐ পতনের সময় এক আফগানিস্তান ছাড়া আর কোথাও সামরিক পরাজয় বরণ করতে হয়নি। কোথাও কোন বহিরাগতদের আক্রমণ হয়নি, কোন বিদ্রোহ হয়নি, এমনকি মার্টিন লুথার কিংয়ের মত বড় ধরনের অসহযোগ আন্দোলনও কেউ করেনি। সোভিয়েতদের তখনও লাখ লাখ সৈন্য ছিল, হাজার হাজার ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমান ছিল। পুরো মানবজাতিকে কয়েক দফা ধ্বংস করার মত যথেষ্ট পরিমাণে পারমাণবিক অস্ত্রও ছিল। লাল সেনা এবং অন্যান্য ওয়ার’শ সেনারাও ছিল অনুগত। সর্বশেষ সোভিয়েত শাসক মিখাইল গর্বাচেভ যদি একবার আদেশ দিতেন,তাহলেই লাল সেনারা সাধারণ জনগণের উপর প্রকাশ্যে গুলি চালাতে পারত।
এতকিছুর পরও সোভিয়েত অভিজাতরা এবং কম্যুনিস্টপন্থীরা পূর্ব ইউরোপের বেশিরভাগ জুড়েই (রোমানিয়া আর সার্বিয়া ছিল ব্যতিক্রম) সামরিক ক্ষমতার এক ফোঁটাও ব্যবহার করেনি। যখন তাদের সদস্যরা বুঝতে পারলো যে কম্যুনিজম দেউলিয়া হয়ে গেছে, তারা সাথে সাথে সকল বাহিনী প্রত্যাহার করে নিল, নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিল, তারপর নিজেদের বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি চলে গেল। গর্বাচেভ এবং তার সহকর্মীরা বিনা সংগ্রামে শুধু যে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দখল করা এলাকাই ছেড়ে দিল তাই না, তাদের বহু পুরনো জার আমলের জয় করা বাল্টিক, ইউক্রেন, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়াও ছেড়ে দিল। গর্বাচেভ যদি সার্বিয়ার নেতাদের মত কিংবা আলজেরিয়ায় ফরাসিদের মত আচরণ করত তাহলে কি হত সেটা ভাবলে এখনও শিউরে উঠতে হয়।
আণবিক সমঝোতা
সাম্রাজ্যগুলো সরে গিয়ে যে স্বাধীন দেশগুলো তৈরি হল তারা যুদ্ধের ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহী ছিল না। ১৯৪৫ সালের পর থেকে, অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে কোন দেশই অন্য কোন দেশকে দখল করার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়নি। অথচ স্মরণাতীতকালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরকম দখলদারী হামলা ছিল রীতিমত হাতের মোয়া। এভাবেই আসলে অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ শাসক এমনকি মানুষজনও ভেবেছিল এভাবেই চলবে পৃথিবী। কিন্তু রোমান, মোঙ্গল কিংবা অটোমানদের মত ভোগদখল আজকের দুনিয়ায় প্রায় অসম্ভব। ১৯৪৫ সালের পর থেকে জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনো স্বাধীন দেশই পৃথিবীর ম্যাপ থেকে উধাও হয়ে যায়নি। সীমিত সংখ্যায় যুদ্ধ বিগ্রহ এখনও হয় আর তাতে লাখ লাখ মানুষ প্রাণও হারায় কিন্তু যুদ্ধ এখন মোটেই আর হাতের মোয়া নয়।
