আমাদের শান্তির যুগ
বেশিরভাগ মানুষই মানতে চায় না আমরা কত শান্তিপূর্ণ এক সময়ে বসবাস করছি। আমাদের কেউই হাজার বছর আগে বেঁচে ছিল না। এই কারণেই বোধহয় আমরা ভুলে যাই পৃথিবী আগে কতটা হিংস্র ছিল। আর যেহেতু যুদ্ধ জিনিসটা আগের চেয়ে অনেক বিরল হয়ে গেছে, তাই এর প্রতি মানুষের আকর্ষণও বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ মানুষই এখন আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা বলে। কিন্তু ব্রাজিল কিংবা ভারতের লোকেরা কতটা শান্তিতে বসবাস করছে সে কথা খুব কম লোকই আলোচনা করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, পুরো মানবজাতিকে নিয়ে ভাবার চেয়ে ব্যাক্তিগত সুখ দুঃখের কথা ভাবাটা অনেকসহজ। স্থূল দৃষ্টিতে ইতিহাসের গতিপথ বুঝতে গেলে আমাদের আসলে ব্যাক্তিগত গল্প না শুনে বড়সড় পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে। ২০০০ সালে যুদ্ধের কারণে মৃত্যু হয় লাখ তিনেক মানুষের। এছাড়া হিংস্রতার দরুন আরও লাখ পাঁচেক মানুষ মারা যায়। এটা সত্য যে প্রতিটি মানুষের মৃত্যুই আসলে একটা জগতের অপমৃত্যু, একটা পরিবারের ধ্বংসযজ্ঞ, বন্ধু ও আত্মীয়দের জন্য সারাজীবনের এক দুঃসহ বেদনা। কিন্তু তারপরও, একটু স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই আট লাখ মৃত্যু আসলে ২০০০ সালের মোট সাড়ে পাঁচ কোটি মৃত্যুর মাত্র শতকরা দেড় ভাগ। ঐ একই বছর ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে গাড়ি দুর্ঘটনায় (মোট মৃত্যুর শতকরা ২.২৫ ভাগ) এবং ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেছে (শতকরা ১.৪৫ ভাগ)।৪
২০০২ সালের সংখ্যাগুলোতো আরও চমকপ্রদ। সাড়ে পাঁচ কোটি মৃত্যুর মধ্যে মাত্র পৌনে দু লাখ মানুষ মারা গেছে যুদ্ধের কারণে আর সাড়ে পাঁচ লাখের মত হিংস্রতায় (হিংস্রতার কারণে মৃত্যু মোট সাড়ে সাত লাখের কাছাকাছি)। অন্যদিকে, পৌনে নয় লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেছে।৫ দেখ গেল, ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলার পরের বছর, যখন সবাই সন্ত্রাস আর যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছে, তখন একজন সাধারণ মানুষের অন্যের হাতে মরার চেয়ে আত্মহত্যা করে মরার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রান্তেই মানুষ রাতে যখন ঘুমাতে যায় তখন তাদের এই ভয় করতে হয় না যে, প্রতিবেশী গোষ্ঠীর লোকেরা হয়তো মাঝরাতে হামলা করবে আর সবাইকে মেরে ফেলবে। ব্রিটেনের সচ্ছল লোকেরা প্রতিদিন যখন শেরউড জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নটিংহ্যামে থেকে লন্ডনে যায় তখন তাদের এই ভয়ে থাকতে হয় না যে, এই বুঝি জঙ্গল থেকে রবিন হুড আর তার দলবল বের হয়ে এসে তাদের আটক করবে আর সব ধনসম্পদ লুটে নিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিবে (অথবা তাদের মেরে ফেলবে আর নিজেরাই সব সম্পদ ভোগ করবে)। ছাত্রছাত্রীদেরকে শিক্ষকের বেত্রাঘাত সহ্য করতে হয় না, ছেলেমেয়েদের এই ভয়ে থাকতে হয় না যে তাদেরকে তাদের বাবা মায়েরা অভাবের জন্য দাস হিসেবে বেচে দেবে। আজকের নারীরা এটা জানে যে আইনগতভাবে তাদের স্বামীদের কোন অধিকার নেই তাদেরকে প্রহার করার কিংবা বাড়ির মধ্যে আটকে রাখার। সারা পৃথিবীজুড়ে এইসব ধারণাগুলো খুব দ্রুত বাস্তবায়িত হয়ে যাচ্ছে।
হিংস্রতার পরিমাণ কমে আসার পেছনে আসলে রাষ্ট্রের অবদানই বেশি। ইতিহাসজুড়ে বেশিরভাগ হিংস্রতাই হতো মূলত পরিবার কিংবা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে। (উপরের পরিসংখ্যান থেকেও তো এটা পরিষ্কার যে আজকালকার যুগেও আঞ্চলিক অপরাধই কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধের চেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ।) আমরা তো আগেই দেখেছি, প্রথম দিককার কৃষকেরা, যারা আঞ্চলিক সম্প্রদায়ের বাইরে আর কোনো রকম সংগঠন চোখেই দেখেনি, তারাও প্রতিনিয়ত হিংস্রতায় জড়িয়ে পড়ত।৬ রাজত্ব আর সাম্রাজ্য যতই শক্তিশালী হতে থাকল ততই তারা সম্প্রদায়গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে থাকল আর ক্রমশ হিংস্রতার পরিমাণ কমে আসলো। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সভ্যতায়, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় চল্লিশজনই খুন হত। ইদানীংকালে, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে উঠেছে সর্বেসর্বা আর সম্প্রদায় প্রথা একরকম হারিয়ে গেছে, তখন হিংস্রতার পরিমাণও অনেকটাই কমে গেছে। সারা পৃথিবীর বিচারে এখন প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র নয়জন খুনের শিকার হয়। এইসব খুনোখুনির বেশিরভাগই হয় সোমালিয়া কিংবা কলম্বিয়ার মত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে। সমগ্র ইউরোপের ক্ষেত্রে এখন সেই সংখ্যাটা প্রতি এক লাখে মাত্র একজন।৭
অবশ্য এমন নজিরও আছে যে রাষ্ট্র নিজেই তার নিজের জনগণকে মেরে ফেলছে। এইরকম ঘটনাগুলোই আমাদের স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে যায়। পুরো বিংশ শতাব্দীতে প্রায় এক কোটি লোক নিহত হয়েছে তাদেরই দেশের প্রতিরক্ষাবাহিনীর হাতে। তারপরও, একটা স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতে হয় রাষ্ট্র পরিচালিত আদালত এবং পুলিশবাহিনী সারা পৃথিবীর নিরাপত্তা আসলে বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি পূর্বাধুনিক যুগের সাথে তুলনা করি, তাহলে এখনকার দিনের একজন জাঁদরেল একনায়কের আমলেও একজন মানুষের অন্য মানুষের হাতে মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা অনেক কম। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে সেনাবাহিনীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঐ শাসনেই দেশটা চলেছে। এই ২০ বছরে বেশ কয়েক হাজার ব্রাজিলিয়ান তাদের শাসকের হাতে মারা পড়ে। আরও কয়েক হাজার জেলহাজতে যায় এবং নির্যাতিত হয়। এত কিছুর পরও, সবচেয়ে খারাপ বছরটাতেও, ব্রাজিলের একজন গড়পড়তা মানুষের অন্য মানুষের হাতে মারা পড়ার সম্ভাবনা বরং হুয়ারানি (Waorani), আরাওয়েতে (Arawete) কিংবা ইয়ানোমামোর (Yanomamo) উপজাতিদের তুলনায় অনেক কম। হুয়ারানি, আরাওয়েতে আর ইয়ানোমামোরা হল আমাজন জঙ্গলের গহীনে বসবাসকারী উপজাতি যাদের কোন সৈন্য, পুলিশ কিংবা জেলখানা নেই। নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে এসব উপজাতি জনগোষ্ঠীর পুরুষদের প্রায় অর্ধেক মারা যায় পারস্পরিক দ্বন্দ্বে। এসব দ্বন্দ্ব সাধারণত সম্পদ, নারী কিংবা আত্মসম্মান সংক্রান্ত হয়ে থাকে।৮
