ইদানীং জাতীয় সম্প্রদায়গুলো ক্রমেই ঢেকে যাচ্ছে বিভিন্ন রকম ভোক্তা গোষ্ঠী দিয়ে যারা একে অপরকে ভালভাবে চেনে না কিন্তু একই রকম পণ্য ভোগ করে অভ্যস্ত। তাই তারা নিজেদের একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত মনে করে। এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত শোনালেও আমাদের চারপাশে এরকম উদাহরণের অভাব নেই। যেমন ধরেন, ম্যাডোনার ভক্তরা মিলে একটা ভোক্তা গোষ্ঠী তৈরি করে। তারা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করে মোটামুটি তাদের কেনাকাটা দিয়েই। তারা ম্যাডোনার কনসার্টের টিকেট কেনে, সিডি কেনে, পোস্টার কেনে, শার্ট কেনে কিংবা রিংটোন কেনে। এসব কেনার মাধ্যমেই তারা জানান দেয় যে তারা কারা। একইভাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভক্তরা, নিরামিষাশীরা এবং পরিবেশবাদীরাও বিভিন্ন ভোক্তা গোষ্ঠীর উদাহরণ। তারাও মোটামুটি সংজ্ঞায়িত হয় তারা কোন সব পণ্য কেনে তা দিয়েই। এটাই তাদের পরিচয়ের চাবিকাঠি। একজন জার্মান নিরামিষাশী হয়তো একজন জার্মান সর্বভূকের চেয়ে একজন ফরাসি নিরামিষাশীকেই বিয়ে করতে চাইবে।
অবিরাম গতি
গত দুই শতাব্দীর বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলো এতোটা যুগান্তকারী এবং এত দ্রুত ঘটেছে যে আমাদের সমাজের একদম মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোই সম্পূর্ণ বদলে গেছে। শুরুতে আমাদের সামাজিক গঠনটা বেশ কঠিন এবং অনমনীয় ছিল। স্থায়িত্ব এবং ধারাবাহিকতা ছিল সুনিশ্চিত। খুব দ্রুত কোনো পরিবর্তন ছিল ব্যতিক্রম এবং যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনই ছোট ছোট ধাপের সমন্বয়ে হত। মানুষ ধরেই নিয়েছিল মানব সমাজ কাঠামো অপরিবর্তনীয় এবং অনন্ত। পরিবার আর সম্প্রদায় হয়তো সামাজিক কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান কিছুটা বদলাতে পারত, কিন্তু সমাজের মৌলিক গঠনটা বদলে ফেলা ছিল অভাবনীয়। মানুষজন সবসময় নিজেদের এভাবেই সান্ত্বনা দিত যে “এভাবেই তো চলে আসছে, এভাবেই তো চলবে”।
কিন্তু গত দুই শতাব্দীতে পরিবর্তনের গতিটা এত বেড়ে গেছে যে সামাজিক কাঠামোটা খুব গতিময় আর নমনীয় হয়ে গেছে। এটা এখন একটা নিয়ত পরিবর্তনশীল অবস্থায় আছে। আধুনিক বিপ্লবের কথা বললে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, ১৮৪৮ সালের ইউরোপের বসন্ত অথবা ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লব। সত্যি কথা বলতে আজকালকার দিনে প্রতিটা বছরই বৈপ্লবিক। এখন একজন ৩০ বছর বয়সী লোকও তরুণদের গল্প বলতে পারে এভাবে- “আমরা যখন ছোট ছিলাম তখনকার পৃথিবীটা ছিল অন্যরকম”। উদাহরণস্বরুপ, ইন্টারনেট জিনিসটাই তো নব্বইয়ের দশকে তৈরি, মাত্র বছর পঁচিশ আগের কথা। অথচ আজ আমরা ইন্টারনেট ছাড়া পৃথিবীর কথা কল্পনাই করতে পারি না।
এই কারণেই আধুনিক সমাজের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করাটা অনেকটা কোনো এক বহুরুপীর রূপ বর্ণনা করার মত ব্যাপার। তার একমাত্র যে বৈশিষ্ট্যটির ব্যাপারে আমরা একমত হতে পারি সেটা হল অবিশ্রান্ত পরিবর্তন। মানুষজন ইতোমধ্যেই এই ব্যাপারটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সবাই এখন মনে করে সামাজিক কাঠামো আসলে একটা নমনীয় ব্যাপার, আমরা চাইলেই প্রয়োজনমত এটা বদলাতে পারি। পূর্বাধুনিক যুগের শাসকেরা সাধারণত আশ্বাস দিত যে তারা প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ করবে, এমনকি ফিরে যাবে গৌরবান্বিত সময়ে। কিন্তু গত দুই শতক ধরে দেখা যাচ্ছে শাসকেরা তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে পুরাতনকে ছুঁড়ে ফেলে নতুন পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়। একদম গোঁড়া মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোকেও বলতে দেখা যাচ্ছে না যে তারা সবকিছু আগের মত রাখার চেষ্টা করবে। সবাই আজকাল সামাজিক সংশোধন, শিক্ষা ব্যবস্থার সংশোধন কিংবা অর্থনৈতিক সংশোধনের প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। মাঝে মাঝে তারা সত্যি সত্যিই সেসব সংশোধন করেও ফেলছে।
ভূতাত্বিকেরা যেমন টেকটনিক স্তরগুলোর নড়াচড়া থেকে ভূমিকম্প কিংবা আগ্নেয়গিরির আশংকা করেন, তেমনি আমরা আশংকা করতে পারি এইসব দ্রুতগতির সামাজিক পট পরিবর্তন হয়তো রক্তাক্ত হিংস্রতা বয়ে নিয়ে আসবে। ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস বর্ণনা করতে গেলেও কিন্তু আমাদের কিছু ভয়ংকর যুদ্ধ, গণহত্যা আর বিপ্লবের কথা বলতে হয়। নতুন জুতো পরা একটি শিশু যেমন রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে লাফিয়ে বেড়ায়, তেমনি ইতিহাসও এক রক্তগঙ্গা থেকে আরেক রক্তগঙ্গার পথে হাঁটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তারপর স্নায়ুযুদ্ধ, আর্মেনিয়ান গণহত্যা থেকে শুরু করে ইহুদি নিধন, রুয়ান্ডার গণহত্যা, রোবস্পিয়ার থেকে লেনিন তারপর হিটলার।
সুতরাং আশংকাটা আসলে সত্যি, কিন্তু এই বহুল পরিচিত দুর্যোগগুলো উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করাটা কিছুটা বিভ্রান্তিকরও বটে। আমরা খানা খন্দে এত বেশি বুঁদ হয়ে থাকি যে পথে যে শুকনো জায়গাও আছে তা আমাদের চোখে পড়ে না। উত্তরাধুনিক যুগ যে শুধু অভূতপূর্ব রকমের হিংস্রতা আর বর্বরতা দেখেছে তাই নয়, সেই সাথে শান্তি ও শুভ্রতার দারুণ নিদর্শনও দেখতে পেয়েছে। চার্লস ডিকেন্স ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে বলেছিলেন “এটাই ছিল শ্রেষ্ঠ সময়, আবার এটাই ছিল নিকৃষ্ট সময়”। কথাটা যে শুধু ফরাসী বিপ্লবের জন্য সত্য তাই নয়, পুরো যুগটার জন্যও প্রযোজ্য।
কথাটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই সাত যুগের ক্ষেত্রে। এই সময়ে মানবজাতি প্রথমবারের মত নিজেদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার হুমকির সম্মুখীন হয়েছে এবং বেশ ভালো সংখ্যক যুদ্ধ ও গণহত্যা দেখেছে। এতকিছুর পরও এই কয়েক যুগই কিন্তু বেশ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শান্তিময় সময়। এটা খুবই আশ্চর্যজনক, কারণ এই সময়েই কিন্তু আমরা আগের চাইতেই আরও বেশি বেশি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তন দেখেছি। ইতিহাসের টেকটোনিক স্তরগুলো পাগলের মত নড়াচড়া করছে, অথচ আগ্নেয়গিরি শান্ত। মনে হচ্ছে এই নতুন নমনীয় সামাজিক কাঠামো যেন সবকিছু আগলে রাখতে পারে, এমনকি দরকার হলে কোনো হিংস্রতা ছাড়াই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে।৩
