কাল্পনিক সম্প্রদায়
একক পরিবারের মতই সম্প্রদায়ও কোন উপযুক্ত প্রতিস্থাপন ছাড়া এমনি এমনি উধাও হয়ে যেতে পারেনি। আগেকার দিনে সম্প্রদায় আমাদের যেসব বস্তুগত চাহিদা মেটাতে পারতো এখনকার রাষ্ট্র আর বাজার ব্যবস্থাও সেসবের প্রায় পুরোটাই মেটাতে পারে। কিন্তু শুধু বস্তুগত চাহিদা মেটালেই তো হবে না, সামাজিক বন্ধনেরও তো যোগান দিতে পারতে হবে।
সেই চাহিদা পূরণ করার জন্য বাজার ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রযন্ত্র কিছু “কাল্পনিক সম্প্রদায়” তৈরি করে। এসব সম্প্রদায়ে লাখ লাখ অপরিচিত লোকজন থাকে। সম্প্রদায়গুলো সাজানো হয় রাষ্ট্রীয় এবং বাণিজ্যিক প্রয়োজন অনুসারে। একটা কাল্পনিক সম্প্রদায় হল এমন কিছু মানুষের সম্প্রদায় যারা একে অপরকে চেনে না কিন্তু কল্পনা করে নেয় যে চেনে। এরকম সম্প্রদায় কিন্তু নতুন কোন আবিষ্কার না। রাজত্ব, সাম্রাজ্য এবং চার্চ এরকমই কাল্পনিক সম্প্রদায় হিসেবে হাজার বছর টিকে ছিল। প্রাচীন চীনে, লাখ লাখ মানুষ নিজেদেরকে একটা মাত্র পরিবারের সদস্য মনে করত আর সম্রাটকে মনে করত তাদের পিতা। মধ্যযুগে, লাখ লাখ মুসলমান কল্পনা করত যে ইসলামের পতাকাতলে তারা সবাই ভাইবোন। তারপরও ইতিহাস জুড়ে এরকম কাল্পনিক সম্প্রদায়গুলো আসলে অতটা অন্তরঙ্গ ছিল না যতটা ছিল কয়েক ডজন কাছাকাছি থাকা পরস্পর বেশ ভালভাবে পরিচিত মানুষের সম্প্রদায়। ঐ অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়গুলো তার সদস্যদের মানসিক চাহিদা মেটাতে পারত এবং ভালোভাবে টিকে থাকার জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণও ছিল। গত দুই শতাব্দীতে সেইসব অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়গুলো ম্লান হয়ে গেছে আর তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য উত্থান হয়েছে কাল্পনিক সম্প্রদায়ের।
কাল্পনিক সম্প্রদায়ের উত্থানের অন্যতম দুটো বড় উদাহরণ হল জাতি এবং ভোক্তা গোষ্ঠী। জাতি হল রাষ্ট্রের তৈরি কাল্পনিক সম্প্রদায়। ভোক্তা গোষ্ঠী হল বাজার ব্যবস্থার তৈরি কাল্পনিক সম্প্রদায়। এগুলা কাল্পনিক সম্প্রদায়, কারণ আগেকার গ্রামে যেমন সবাই সবাইকে চিনত, আজকের এই সম্প্রদায়গুলোতে সেটা অসম্ভব। কোন জার্মান লোকের পক্ষে জার্মান জাতির ৮ কোটি লোককে কিংবা ইউরোপের খোলা বাজারের ৫০ কোটি ভোক্তাকে অন্তরঙ্গভাবে চেনা সম্ভব না।
ভোগবাদ এবং জাতীয়তাবাদ খুব পরিশ্রম করে আমাদেরকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছে, এই যে আমরা লাখ লাখ মানুষ, আমরা সবাই একই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, আমাদের সবার একই অতীত, একইরকম স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতও একই। এটা ঠিক মিথ্যে না, এটা কল্পনা। টাকা, কোম্পানি এবং মানবাধিকারের মত, জাতি আর ভোক্তা গোষ্ঠীও হল আন্তর্ব্যক্তিক বাস্তবতা (inter-subjective reality)। এগুলোর অস্তিত্ব আছে শুধুমাত্র আমাদের সামষ্টিক কল্পনায়, তবু এর ক্ষমতা অপরিসীম। যতদিন পর্যন্ত লাখ লাখ জার্মান মিলে একটা জার্মান জাতিতে বিশ্বাস করবে, জার্মানির জাতীয় প্রতীক দেখে রোমাঞ্চিত হবে ততদিন জার্মানি পৃথিবীর বুকে অন্যতম শক্তিশালী জাতি হিসেবে টিকে থাকবে।
একটা জাতি তার কাল্পনিক চরিত্রটাকে ঢেকে রাখার জন্য সবরকম চেষ্টা করে থাকে। বেশিরভাগ জাতিই দাবি করে তারা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এবং অনন্তকালের অবিচ্ছেদ্য এক স্বত্তা। মাতৃভূমির মাটির সাথে জনমানুষের রক্ত মিলে মিশে তাদের সৃষ্টি হয়েছিল। এরকম দাবি আসলে বাড়াবাড়ি রকমের মেকি। আগেও অনেক জাতি ছিল পৃথিবীতে, কিন্তু এখনকার তুলনায় তাদের গুরুত্ব ছিল অনেক কম, কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বই তখন ছিল অনেক কম। মধ্যযুগের নুরেমবার্গের একজন অধিবাসী হয়তো জার্মান জাতির প্রতি অনুগত ছিল, কিন্তু সে তার চেয়ে ঢের বেশি অনুগত ছিল তার নিজের পরিবার আর সম্প্রদায়ের প্রতি। কারণ পরিবার আর সম্প্রদায়ই তার বেশিরভাগ প্রয়োজন মেটাত। তার উপর প্রাচীন জাতিগুলোর প্রভাব যতটুকুই থাকুক না কেন সেসবের মধ্যে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল মাত্র অল্প কিছু। এখনকার জাতিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগের উদ্ভবই হয়েছে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে।
মধ্য প্রাচ্যে এরকম অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। সিরিয়ান, লেবানিজ, জর্ডানিয়ান এবং ইরাকি জাতিগুলো আসলে ফরাসি আর ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বালির উপর এলোমেলো সীমারেখা টানার ফলাফল। তারা এই রেখা টানার সময় আঞ্চলিক ইতিহাস, ভূতত্ত্ব এবং অর্থনীতিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছিল। এইসব কূটনীতিকরাই ১৯১৮ সালে ঠিক করল যে কুর্দিস্তান, বাগদাদ আর বাসরার মানুষের সবাই এখন থেকে “ইরাকি”। ফরাসিরাই প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারা হবে সিরিয়ান আর কারা হবে লেবানিজ। সাদ্দাম হোসেন আর হাফেজ আল আসাদ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল ইংরেজ-ফরাসি মদদপুষ্ট জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু চিরায়ত ইরাকি এবং সিরিয়ান জাতি নিয়ে তাদের আড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা ছিল পুরোটাই ফাঁপা।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কেবল হাওয়া থেকে একটা জাতিকে তৈরি করা যায় না। যারা ইরাক কিংবা সিরিয়া তৈরি করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছিল তারা সত্যিকার ইতিহাস, ভূতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক উপাদান ব্যবহার করেছিল। সেসবের মধ্যে কিছু কিছু তো হাজার বছরের পুরনো। সাদ্দাম হোসেন ইরাক জাতিসত্ত্বার সাথে আব্বাসীয় খেলাফত আর ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, এমনকি তার একটি সাঁজোয়া বাহিনীর নাম দিয়েছিলেন হামুরাবি ডিভিশন। কিন্তু এইসব করেও কিন্তু ইরাককে একটি আদি অকৃত্রিম সত্তা বানিয়ে ফেলা যায়নি। আমি যদি গত দুমাস ধরে পড়ে থাকা আটা, তেল আর চিনি দিয়ে একটি কেক বানিয়ে ফেলি তার মানে এই না যে ঐ কেকটাও দুমাসের পুরনো।
