শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষই নয়, নারী এবং শিশুকেও ব্যাক্তিমানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। পুরো ইতিহাস জুড়ে নারী ছিল পরিবার কিংবা সম্প্রদায়ের সম্পত্তি। অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্র নারীকে একজন ব্যাক্তিমানুষ হিসেবে দেখে যে কিনা পরিবার কিংবা সম্প্রদায় ছাড়াই অর্থনৈতিক আর আইনগত অধিকার স্বাধীনভাবে ভোগ করে। তারা তাদের নিজেদের ব্যাংক একাউন্ট রাখতে পারে, কাকে বিয়ে করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদ করে একা একাই বসবাস করতে পারে।
ব্যাক্তিমানুষের এই স্বাধীনতা এসেছে একটা চড়া মূল্যের বিনিময়ে। আমরা অনেকেই এখন দূঃখ করি হারিয়ে যাওয়া শক্তিশালী পরিবার আর সম্প্রদায়ের কথা ভেবে। আমরা নিজেদের খুব নিঃসঙ্গ মনে করি আর সবসময় ভয়ে থাকি যে রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের জীবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে। পরস্পরবিচ্ছিন্ন ব্যাক্তিমানুষ দিয়ে গড়া যে সমাজ সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র খুব সহজেই হস্তক্ষেপ করতে পারবে, যেটা পরিবার আর সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজে সম্ভব ছিল না। যেখানে একই দালানে থাকা দুজন প্রতিবেশী তাদের দারোয়ানকে কয় টাকা বেতন দেবে সেই হিসাবেই একমত হতে পারে না সেখানে তারা রাষ্ট্রকে থামাবে কীভাবে?
রাষ্ট্র, বাজার ব্যবস্থা আর ব্যাক্তিমানুষের মধ্যেকার বোঝাপড়াটা খুব একটা সহজ নয়। রাষ্ট্র এবং বাজার ব্যবস্থা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে কখনই একমত হতে পারে না। ওদিকে ব্যাক্তিমানুষ অভিযোগ করে ঐ দুই পক্ষই চায় অনেক বেশি কিন্তু দেয় খুব কম। অনেক সময়ই দেখা যায়, ব্যাক্তিমানুষ বাজার ব্যবস্থার খপ্পরে পড়ে ব্যবহৃত হয় আর রাষ্ট্র তার আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ দিয়ে তাদের নিরাপত্তা দেয়ার বদলে নির্যাতন করে। তারপরও দারুণ আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই ত্রিমুখী ব্যবস্থাটা বেশ চলছে, তার যতই খুঁত থাকুক না কেন। এই ব্যবস্থা অসংখ্য প্রজন্ম ধরে চলে আসা মানুষের সমাজ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এক ধাক্কায়। লাখ লাখ বছরের বিবর্তন আমাদের তৈরি করেছে নিজেদেরকে সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে মনে করে জীবন যাপন করতে। অথচ মাত্র দুই শতকের মধ্যেই আমরা পরস্পরবিচ্ছিন্ন ব্যাক্তিমানুষে পরিণত হলাম। সংস্কৃতির দুর্দান্ত ক্ষমতার এর চেয়ে ভাল প্রমাণ আর কীই বা হতে পারে?
এতকিছুর পরও আধুনিক সময়ের দৃশ্যপট থেকে একক পরিবারের ধারণাটা কিন্তু একদম উধাও হয়ে যায়নি। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র পরিবারের কাছে থেকে তার বেশিরভাগ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দায়ভার কেড়ে নিল, তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর দায়িত্ব রেখেও এসেছিল। আধুনিক পরিবার এখনও মানুষের কিছু অন্তরঙ্গ চাহিদা পূরণ করে যেটা রাষ্ট্রযন্ত্র পারে না (অন্তত এখন পর্যন্ত)। কিন্তু এখানেও পরিবার নিয়মিতভাবেই বাইরের হস্তক্ষেপের শিকার হচ্ছে। দিনকে দিন বাজার ব্যবস্থা আরও বেশি করে মানুষের ব্যাক্তিগত এবং যৌন জীবনকে প্রভাবিত করছে। যেখানে আগেকার দিনে পরিবারই ছিল মূল ঘটক, আজকের দিনে বাজার ব্যবস্থা প্রথমে আমাদের মধ্যে প্রণয়ঘটিত এবং যৌনাচারের পছন্দসই চাহিদা তৈরি করছে, তারপর একটা মোটা ফিয়ের বিনিময়ে সেটা পূরণ করছে। আগেকার সময় বর-বধূর প্রথম দেখা হতো পরিবারের বৈঠকখানায়, তারপর তাদের পিতাদের মধ্যে কিছু টাকাপয়সার আদানপ্রদান হতো। ইদানীং প্রেমিক প্রেমিকার প্রথম দর্শন হয় বারে কিংবা কফি হাউজে আর টাকা পয়সা যায় প্রেমিকের হাত থেকে ওয়েটারের হাতে। তার চেয়েও বেশি টাকা চলে যায় ফ্যাশন ডিজাইনার, জিম ম্যানেজার, ডায়েটিশিয়ান, কসমেটিশিয়ান এবং প্লাস্টিক সার্জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যারা আমাদের বাজারের চলতি মাপকাঠিতে ‘সুন্দর’ করে তোলে।

এদিকে অনেক রাষ্ট্রও কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উপর বেশ তীক্ষ্ণ নজর রাখে, বিশেষ করে পিতামাতা আর সন্তানের মধ্যে। পিতামাতা তার সন্তানদের রাষ্ট্রীয় পদ্ধতিতে শিক্ষিত করতে বাধ্য। যেসব পিতামাতা সন্তানদের সাথে হিংস্র আচরণ করে তাদেরকে রাষ্ট্র সংযত হতে বাধ্য করে। দরকার পড়লে রাষ্ট্র সেইসব পিতামাতাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দিতে পারে কিংবা তাদের সন্তানদের অন্য পরিবারের কাছে সঁপে দিতে পারে। বেশিদিন আগের কথা না, রাষ্ট্র যে পিতামাতাকে তাদের সন্তানদের প্রহার করা কিংবা অপমান করা থেকে বিরত রাখবে এই ধারণাটাই খুবই হাস্যকর আর অকেজো শোনাত। অনেক সমাজেই পিতামাতার কর্তৃত্ব ছিল পবিত্র। পিতামাতাকে সম্মান করা এবং তাদের প্রতি অনুগত থাকা সবচেয়ে পুণ্যের কাজ ছিল। পিতামাতার অধিকার ছিল তার সন্তানদের নিয়ে যা খুশি তাই করার। তারা চাইলে নবজাতককে হত্যা করতে পারত, সন্তানদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতে পারতো কিংবা মেয়ে শিশুদের তাদের বয়সের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সের পুরুষের সাথে বিয়েও দিতে পারত। আজকালকার দিনে পিতামাতার কর্তৃত্ব প্রায় উঠেই যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে পিতামাতার অবাধ্য হওয়াটাকে ততই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। উল্টো সন্তানের জীবনের যে কোন ঝামেলার জন্য পিতামাতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। স্ট্যালিনের সময়ের পঞ্চায়েতে যেমন পিতামাতারা দাঁড়াতো বাদীর আসনে, ঠিক তেমনই এখন তারা হরহামেশাই দাঁড়াচ্ছে ফ্রয়েডের কাঠগড়ায়।