বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দূরবর্তী সম্প্রদায়ে যোগাযোগ আর পরিবহন ব্যবস্থা এত বাজে ছিল যে, অনেক রাজ্যই খাজনা আদায় কিংবা দ্বন্দ্ব মিটমাটের মত খুব সাধারণ রাজকীয় দায়দায়িত্বগুলোও সম্প্রদায়ের উপরই ছেড়ে দিত। উদাহরণস্বরূপ, অটোমান সাম্রাজ্য গৃহস্থালি বিবাদ মিটমাটের ভার পরিবারের উপরই ছেড়ে দিয়েছিল, এর জন্য কোন রাজপেয়াদা নিয়োগ না করেই। যদি আমার ভাই কাউকে মেরে ফেলে থাকে, তাহলে নিহতের ভাই আমাকে মেরে ফেলতে পারে। এই প্রতিশোধটা ছিল অনুমোদিত। যতক্ষণ সবকিছু একটা সীমার মধ্যে থাকছে ততক্ষণ ইস্তানবুলের সুলতান কিংবা প্রাদেশিক প্রতিনিধি এসব দ্বন্দ্বের মধ্যে হস্তক্ষেপ করত না।
চীনের মিং সাম্রাজ্যে (১৩৬৮-১৬৪৪), সব অধিবাসীরা সংগঠিত ছিল ‘বাওজিয়া’ পদ্ধতিতে। দশটা পরিবার মিলে হত একটা ‘জিয়া’ আর দশটা জিয়া মিলে তৈরি হত একটা ‘বাও’। কোনো একটা বাওয়ের কোন সদস্য যদি অপরাধ করত তাহলে ঐ বাওয়ের অন্য কোনো সদস্য শাস্তি পেতে পারত, বিশেষ করে বৃদ্ধ সদস্যরা। সরকারি খাজনাও নির্ধারিত হত বাওয়ের মাধ্যমেই। সরকারি কোন কর্মকর্তা নয়, বরং বাওয়ের গুরুজনেরাই ঠিক করত কোন পরিবারের কতটুকু খাজনা দিতে হবে। সাম্রাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পদ্ধতিটা খুব সুবিধাজনক ছিল। হাজার হাজার খাজনা সংক্রান্ত কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার বদলে এইসব কাজ সম্প্রদায়ের গুরুজনদের হাতে ছেড়ে দেয়া সম্ভব হয়েছিল। গুরুজনেরা জানত প্রতিটি গ্রামবাসীর মূল্য কীরকম আর তাই তারা কোনো রাজপেয়াদার হস্তক্ষেপ ছাড়াই খাজনা আদায় করতে পারত।
অনেক রাজত্ব এবং সাম্রাজ্য সত্যিকার অর্থে ছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পোষা গুণ্ডার মত। রাজা ছিল গুণ্ডাসর্দার যে এলাকাবাসীর থেকে পয়সা নিত আর বিনিময়ে নিশ্চিত করত অন্য এলাকার গুণ্ডা পাণ্ডারা যেন তার এলাকায় ঝামেলা না করে। এর বাইরে রাজার তেমন কোনো কাজ ছিল না।
পরিবার আর সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরের জীবন মোটেই আদর্শ ছিল না। অনেক পরিবার কিংবা সম্প্রদায় তার সদস্যদের শোষণ করত। সেই শোষণ এখনকার রাষ্ট্র কিংবা বাজারের শোষণের তুলনায় কোন অংশে কম নয়। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়-আশয় ছিল দুশ্চিন্তা আর হিংস্রতায় ভরপুর। তারপরও মানুষের খুব একটা উপায়ও ছিল না। ১৭৫০ সালে যে মানুষ তার পরিবার কিংবা সম্প্রদায় হারিয়েছে সে প্রায় মৃত মানুষের সমান। তার না ছিল কোনো কাজ, কোনো শিক্ষা কিংবা বিপদ আপদে সাহায্য পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা। কেউ তাকে টাকাপয়সা ধারও দিত না কিংবা কোনো ঝামেলায় জড়ালে তার পক্ষও নিত না। কোনো পুলিশ, সমাজসেবী কিংবা বাধ্যতামূলক শিক্ষার চল ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য সেই মানুষটিকে যত দ্রুত সম্ভব নতুন কোন পরিবার বা সম্প্রদায়ে যোগ দিতে হতো। যেসব ছেলেমেয়েরা বাড়ি ছেড়ে পালাত তারা খুব বেশি হলে অন্য কোন পরিবারের চাকর হিসেবে বসবাস করতে পারত। কপাল খারাপ হলে তাদের জায়গা হতো সেনাবাহিনীতে কিংবা পতিতালয়ে।
এই সবকিছুই গত দুই শতাব্দীতে বদলে যায় নাটকীয় ভাবে। শিল্প বিপ্লব বাজার ব্যবস্থার হাতে নতুন এবং অপরিমেয় শক্তি এনে দেয়। রাষ্ট্রকে দেয় নতুন ধরনের যোগাযোগ আর পরিবহন ব্যবস্থা। সরকারের হাতে চলে আসে একগাদা কর্মচারী, শিক্ষক, পুলিশ আর সমাজসেবী। প্রথমদিকে রাষ্ট্র আর বাজার ব্যবস্থা আবিষ্কার করল যে, গতানুগতিক পরিবার আর সম্প্রদায় তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিভাবক এবং এলাকার গুরুজনেরা তাদের সন্তানদের জাতীয়তাবাদী মতবাদে বিশ্বাসী শিক্ষাব্যবস্থায় যোগ দিতে, বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে কিংবা শহুরে শ্রমিক হওয়ার ব্যাপারে বেশ অনিচ্ছুক ছিল।
ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্রমবর্ধমান শক্তি ব্যবহার করে পরিবার ব্যবস্থার গতানুগতিক বন্ধন ভেঙ্গে দিতে সমর্থ হল। রাষ্ট্র তার পুলিশবাহিনীকে পাঠাতে লাগল পারিবারিক বিবাদ নিরসনে। দরকার হলে আদালত পর্যন্ত গড়াত ব্যাপারটা। বাজার ব্যবস্থা পাঠাতে লাগল তার হকারদের, যার ফলে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ঐতিহ্য সরে গিয়ে জায়গা করে দিল নিয়ত পরিবর্তনশীল বাণিজ্যিক ঢং। এতসবও যথেষ্ট ছিল না, পরিবার ব্যবস্থার শক্তিকে পুরোপুরি ভাঙ্গার জন্য তাকে আরেকটি নতুন কৌশলের সাহায্য নিতে হল।
রাষ্ট্রযন্ত্র মানুষজনকে এমন একটা প্রস্তাব দিল যে প্রস্তাব ফেরানো যায় না। তারা বলল “স্বাধীন ব্যক্তি হও”। “যাকে খুশি তাকে বিয়ে কর, বাবা মাকে জিজ্ঞেস করার কি দরকার। যে কাজ করতে ইচ্ছে হয় সেটাই করো, গুরুজনের ভ্রুকুটিকে পাত্তা দিও না। যেখানে খুশি বসবাস কর, তাতে যদি প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যেতে নাও পার তো কি হয়েছে। তুমি এখন আর পরিবার কিংবা সম্প্রদায়ের উপর নির্ভরশীল নও। আমরা, রাষ্ট্রযন্ত্র, আমরাই তোমাদের দেখভাল করব। আমরা তোমাদের খাবার দেব, আশ্রয় দিব, শিক্ষা দেব, স্বাস্থ্যসেবা দেব আর কাজ দেব। আমরা পেনশন দেব, বীমা দেব এবং নিরাপত্তাও দেব।”
রোমান্টিক সাহিত্য অনেক সময় ব্যক্তিমানুষকে রাষ্ট্র আর বাজারের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে। এর চেয়ে ডাহা মিথ্যে আর হয় না। ব্যক্তি মানুষের বাবা মা হল রাষ্ট্র আর বাজার, তাদের জন্যই সে বাঁচতে পারে। বাজার ব্যবস্থা আমাদের কাজ দেয়, বীমা দেয় আর পেনশন দেয়। কোনো কাজ শিখতে চাইলে সরকারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে আমরা তা শিখতে পারি। আমরা ব্যবসা করতে চাইলে ব্যাংক আমাদের টাকা ধার দেয়। আমরা বাড়ি বানাতে চাইলে নির্মাণ কোম্পানি আমাদের বাড়ি বানিয়ে দেয় আর ব্যাংক সেটা বন্ধক রাখে, মাঝে মাঝে তো সরকারি বীমাও থাকে। সবরকম ঝামেলা সামলানোর জন্য আছে পুলিশ। আমরা যদি মাসের পর মাস দুর্বল হয়ে পড়ে থাকি, সামাজিক নিরাপত্তা বাহিনী ছুটে আসে। আমাদের যদি সার্বক্ষণিক সেবার দরকার হয় আমরা একজন নার্সকে ভাড়া করে আনতে পারি। হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে আশা সম্পুর্ণ অপরিচিত একজন নার্স আমাদের এমন আন্তরিকতার সাথে দেখভাল করবে যেটা আমরা নিজের সন্তানের কাছেও আশা করি না। উপযুক্ত কারণ থাকলে, আমরা আমাদের জীবনের সুবর্ণ সময়টা কোন এক অপিরিচিত গুরুজনের বাড়িতেও কাটিয়ে দিতে পারি। খাজনা আদায় দপ্তর আমাদের একেকজনকে স্বাধীন ব্যাক্তি হিসেবেই গণ্য করে, তাই আমরা শুধু নিজের খাজনাই দিই, প্রতিবেশীরটা না। আদালতও আমাদের ব্যাক্তি হিসেবে দেখে, তাই আমাদের কখনো আমাদের আত্মীয়ের করা অপরাধের জন্য শাস্তি পেতে হয় না।
