শিল্প বিপ্লব মানব সমাজে প্রায় ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসে। কলকারখানার সময়ের সাথে জীবনকে মানিয়ে নেওয়া তার মধ্যে একটি মাত্র। অন্যান্য উল্লেখ করার মত উদাহরণগুলোর মধ্যে আছে নগরায়ন, কৃষকের সংখ্যা কমে যাওয়া, কলকারখানায় কাজ করা খেটে খাওয়া মানুষের উদ্ভব, সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্রের প্রসার, তারুণ্য নির্ভর সংস্কৃতি এবং পুরুষশাসিত সমাজের ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাওয়া।
এতসব পরিবর্তন যদিও চমকপ্রদ, কিন্তু এর চেয়েও ঢের বেশি চমকপ্রদ পরিবর্তন এসেছে মানুষের সমাজে। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিপ্লবটা হল, পরিবার আর এলাকাভিত্তিক সম্প্রদায়ের পতন এবং তার জায়গায় রাষ্ট্র আর বাজারের উত্থান। ইতিহাসের একদম শুরু থেকে, যতদূর পর্যন্ত আমরা জানতে পারি, প্রায় ১০ লাখ বছরেরও আগে, মানুষ ছোট ছোট কাছাকাছি থাকা কিছু সম্প্রদায়ে বসবাস করতো। সেসব সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ সদস্যই ছিল একে অপরের আত্মীয়। বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব কিংবা কৃষি বিপ্লব এসেও সেটার তেমন পরিবর্তন ঘটায়নি। সেটা বরং পরিবার আর সম্প্রদায়গুলোকে আরও কাছাকাছি এনে গোষ্ঠী, শহর, রাজত্ব এবং সাম্রাজ্য গঠন করেছে। সেখানেও মানব সমাজের গঠনগত মৌলিক উপাদান ছিল পরিবার কিংবা সম্প্রদায়। অন্যদিকে, শিল্প বিপ্লব এসে মাত্র দুই শতকের মধ্যেই এই মৌলিক উপাদানকে ভেঙ্গে ফেলল। গতানুগতিক যেসব দায়িত্ব পরিবার আর সম্প্রদায় পালন করে আসছিল, তার অনেকগুলোই এরপর থেকে রাষ্ট্র আর বাজারের হাতে চলে গেল।
পরিবার আর সম্প্রদায়ের পতন
শিল্প বিপ্লবের আগে বেশির ভাগ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ৩টি কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকত: একক পরিবার, যৌথ পরিবার আর অন্তরঙ্গ সম্প্রদায়।* বেশিরভাগ মানুষই পারিবারিক ব্যবসায় নিয়োজিত থাকতো – সেটা হতে পারে পারিবারিক খামার কিংবা পারিবারিক কারখানা। কেউ কেউ হয়তো প্রতিবেশীর পারিবারিক ব্যবসাতেও কাজ করত। পরিবার নিজেই ছিল একাধারে কল্যাণ সংস্থা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, শিক্ষা কেন্দ্র, নির্মাণ শিল্প-কারখানা, শ্রমকল্যাণ সমিতি, পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রিকা, ব্যাংক এমনকি পুলিশ পর্যন্ত।
একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ত পরিবার তার দেখাশোনা করত। একজন বুড়ো হয়ে গেলে পরিবারই তার সমর্থন যোগাত আর তার ছেলেমেয়েরা হত তার পেনশন তহবিল। একজন মানুষ মারা গেলে পরিবার তার অনাথ শিশুদের দেখভাল করত। কেউ যদি একটা কুঁড়েঘর বানাতে চাইতো, পরিবার তাতে হাত লাগাত। কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাইলে পরিবার দরকারি মূলধনের যোগান দেওয়ার চেষ্টা করত। কেউ যদি বিয়ে করতে চাইতো তার জীবনসঙ্গী পরিবারই খুঁজে দিত কিংবা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিত। প্রতিবেশীর সাথে কোন গোলমাল হলে পুরো পরিবার তাতে জড়িয়ে পড়তো। কিন্তু যদি কারো অসুস্থতা এতই মারাত্নক হত যে পরিবারের পক্ষে দেখাশোনা করা সম্ভব না, কিংবা কারো নতুন ব্যবসার জন্যে যে পরিমাণ টাকা লাগবে সেটা পরিবারের পক্ষে দেয়া সম্ভব না, অথবা প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়াটা রীতিমত মারামারির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে এরকম সব অবস্থায় এলাকার মানুষজন সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসত।
সম্প্রদায়ের মানুষজন এলাকার ঐতিহ্য আর অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সাহায্য করত। তাদের সাহায্যের ধরন অনেক ক্ষেত্রেই মুক্ত বাজারের চাহিদা আর যোগানের নিয়ম কানুনের সাথে একেবারেই মেলে না। পুরনো ধাঁচের মধ্যযুগীয় কোনো এক সম্প্রদায়ে আমার প্রতিবেশী অভাবে পড়লে কোনো রকম প্রতিদানের আশা ছাড়াই আমি তার বাড়ি বানাতে আর তার ভেড়ার পাল পাহারা দিতে সাহায্য করতাম। আবার যখন আমি বিপদে পড়তাম, আমার প্রতিবেশীও আমাকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করত। একই সময়ে এলাকার ক্ষমতাবান ব্যাক্তিটি হয়তো আমাদের গ্রামের সবাইকে দিয়ে তার প্রাসাদটি বানিয়ে নিত আমাদের কোন টাকাপয়সা না দিয়েই। এর বিনিময়ে আমরা তার উপর ভরসা করতাম যে সে ডাকাত কিংবা বর্বরদের থেকে আমাদের রক্ষা করবে। গ্রাম্য জীবনে অনেক লেনদেন হত কিন্তু সেখানে টাকাপয়সার আদানপ্রদান ছিল না। কিছু বাজারও ছিল যদিও, কিন্তু সেগুলোর অবদান ছিল সীমিত। হয়তো বাজার থেকে দূর্লভ মশলা, কাপড় কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা যেত অথবা উকিল আর ডাক্তারের সেবা পাওয়া যেত। কিন্তু তারপরও সাধারণভাবে ব্যবহার করার মত জিনিসপত্রের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগেরও কম জিনিস বাজারে পাওয়া যেত। মানুষের বেশিরভাগ প্রয়োজনই মিটে যেত পরিবার আর সম্প্রদায়ের মধ্যেই।
সে সময় রাজত্ব আর সাম্রাজ্যেরও অস্তিত্ব ছিল। সেগুলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজও করতো, যেমন যুদ্ধ করা, রাস্তাঘাট বানানো আর প্রাসাদ নির্মাণ করা। এইসব কারণেই রাজারা খাজনা বাড়াত আর মাঝে মাঝে নতুন সৈন্য আর শ্রমিক নিয়োগ দিত। তারপরও অল্প কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া তারা পরিবার আর সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করত না। যদি তারা হস্তক্ষেপ করতেও চাইতো, তবু বেশিরভাগ রাজাই খুব একটা সুবিধা করতে পারত না। গতানুগতিক কৃষি অর্থনীতি নির্ভর সমাজে বাড়তি উৎপাদন তেমন একটা হত না যা দিয়ে গাদা গাদা সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, সমাজসেবী, শিক্ষক আর ডাক্তারদের বেতন দেয়া যাবে। ফলাফলস্বরূপ, বেশিরভাগ শাসকই বড় পরিসরে কোনো কল্যাণ তহবিল, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। তারা সেসব ব্যাপার পরিবার আর সম্প্রদায়ের উপরই ছেড়ে দিয়েছিল। এমনকি খুব বিরল কিছু মুহূর্তে, যখন শাসক কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনে জোর করে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছে (যেমনটা হয়েছিল চীনের চিন সাম্রাজ্যে), তখনও তারা সেটা করেছে পরিবারের প্রধান কিংবা সম্প্রদায় প্রধানদেরকে হাত করে।
