সময়সূচির এই ব্যাপক প্রসারের সাথে জনপরিবহনের একটা নিগূঢ় সম্পর্ক ছিল। যদি শ্রমিকদের ঠিক সকাল ৮টায় কাজ শুরু করতে হয় তাহলে ট্রেন আর বাসগুলোকেও কারখানার গেটে পৌঁছাতে হবে ঠিক ৭টা ৫৫র মধ্যে। কয়েক মিনিটের দেরিও উৎপাদন ঘাটতি তৈরি করবে, তার ফলে দেরিতে আসা শ্রমিকটা তার চাকরিও হারাতে পারে। ব্রিটেনে ১৭৮৪ সালে নির্দিষ্ট সময়সূচির ঘোষণা দিয়ে একটা পরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়। এর সময়সূচিতে শুধু কখন ছাড়বে সেটা উল্লেখ করা হত, কখন পৌঁছাবে সেটা নয়। সেইসময় প্রতিটা ব্রিটিশ শহরের নিজেদের আলাদা সময়ের মানদণ্ড ছিল যা লন্ডনের সময়ের সাথে প্রায় আধা ঘণ্টার ব্যবধানে হতে পারত। লন্ডনে যখন দুপুর ১২টা , তখন লিভারপুলে হয়ত ১২টা ২০ আর ক্যান্টারবেরিতে ১১টা ৫০। যেহেতু কোন টেলিফোন, রেডিও কিংবা টেলিভিশন ছিল না তাই কেউই জানত না অন্য কোথায় কটা বাজে। আসলে কেউ মাথাও ঘামাত না।২
প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রেলগাড়ি চলা শুরু হয় লিভারপুল আর ম্যানচেস্টারের মধ্যে, ১৮৩০ সালে। এর দশ বছর পর প্রথম ট্রেনের সময়সূচি ঘোষণা করা হয়। ট্রেনগুলো আগেকার পরিবহনগুলোর চেয়ে অনেক দ্রুতগামী ছিল বলে বিভিন্ন এলাকার বিচিত্র সময়ের মানদণ্ড একটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াল। ১৮৪৭ সালে সব ব্রিটিশ ট্রেন কোম্পানিগুলো একজোট হয়ে ঠিক করল এখন থেকে সকল ট্রেন এলাকাভিত্তিক সময় বাদ দিয়ে গ্রিনিচ মানমন্দিরের সময় মেনে চলবে। এরপর আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ট্রেন কোম্পানিগুলোর এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকল। অবশেষে ১৮৮০ সালে ব্রিটিশ সরকার এক অভূতপূর্ব ঘোষণার মাধ্যমে জানাল যে ব্রিটেনের সকল সময়সূচি হতে হবে গ্রীনিচ সময় অনুসারে। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত একটা দেশ জাতীয়ভাবে সময়ের মানদণ্ড গ্রহণ করল আর এর মাধ্যমে তার অধিবাসীদেরকে বাধ্য করলো সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়ের চক্রকে ভুলে গিয়ে একটা কৃত্রিম ঘড়ির সময় অনুযায়ী জীবন যাপন করতে।
এই দুর্দান্ত শুরুটা আস্তে আস্তে একটা বিশ্বব্যাপী সময়সূচির সূচনা করল যেটা কিনা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণেও নিখুঁত। সম্প্রচার মাধ্যমগুলো – প্রথমে রেডিও, পরে টেলিভিশন যখন শুভসূচনা করল তারা প্রবেশ করল একই সময়সূচির জগতে আর তারপর আস্তে আস্তে তারাই এর ধারক ও বাহকে পরিণত হল। রেডিও স্টেশনগুলো প্রথম যে তথ্য সম্প্রচার করতো সেটা ছিল সময়, কিছু বিপ বিপ শব্দ যেটা অনেক দূরবর্তী জাহাজ আর বসতিকে নিজেদের ঘড়ির সময়টা ঠিক করে নিতে সাহায্য করত। তারপর রেডিও স্টেশনগুলো প্রতি ঘণ্টায় সংবাদ প্রচারের ধারণা বাস্তবায়ন করল। এখনও যেকোন খবর সম্প্রচারের প্রথম উপাদানই হল সময়, এমনকি এটা যুদ্ধের ঘোষণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, নাৎসি অধিকৃত ইউরোপে বিবিসি সংবাদ সম্প্রচারিত হত। প্রতিটা সংবাদ অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিগ বেনের ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ সরাসরি সম্প্রচারে শোনানো হত – সে যেন মুক্তির এক জাদুময় শব্দ। কয়েকজন প্রতিভাবান জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী এই সম্প্রচারিত ঢং ঢং শব্দের সামান্য তারতম্য থেকে লন্ডনের আবহাওয়ার অবস্থা বের করে ফেলেছিলেন। এই তথ্য জার্মানদের যুদ্ধবিমানগুলোকে দারুণ সাহায্য করেছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা যখন ব্যাপারটা জানতে পারল, তারা সাথে সাথে ঘণ্টার শব্দ সরাসরি সম্প্রচারের জায়গায় একটা রেকর্ড করা শব্দ শোনানো শুরু করল।
সময়সূচির এই মহাযজ্ঞ চালানোর জন্য সস্তা এবং সহজে বহনযোগ্য ঘড়ি হয়ে গেল সহজলভ্য। আসিরীয়, সাসানিদ কিংবা ইনকা সভ্যতার শহরগুলোতে বড়জোর হাতে গোনা কয়েকটা সূর্যঘড়ি থাকত। ইউরোপের মধ্যযুগীয় শহরগুলোতে সাধারণত একটাই ঘড়ি থাকত – শহরের মাঝখানে একটা বড়সড় মিনারের উপর বসানো এক বিশাল যন্ত্র। ঐসব ঘড়িগুলো বেজায় রকমের ভুল সময় দিত। কিন্তু যেহেতু শহরে আর কোন ঘড়ি ছিল না যে তারতম্যটা বোঝা যাবে সুতরাং কিছুই আসত যেত না। আজকের দিনে, একটা স্বচ্ছল পরিবারে যতগুলো ঘড়ি আছে মধ্যযুগে একটা পুরো দেশেও হয়তো ততগুলো থাকতো না! এখন আপনি সময়টা বলতে পারেন হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে, অ্যান্ড্রয়েড ফোনটার পর্দায় তাকিয়ে, বিছানার পাশে রাখা এলার্ম ঘড়িটার দিকে ভুরু কুঁচকে, রান্নাঘরের দেয়ালে বড় ঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে, মাইক্রোওয়েভ ওভেনের দিকে তাকিয়ে, টেলিভিশন কিংবা ডিভিডি প্লেয়ারের পর্দায় কিংবা চোখের কোণ দিয়ে কম্পিউটারের টাস্কবারে তাকিয়ে। এখন বরং সময়টা না জেনে থাকার জন্য অনেক কষ্ট করতে হবে।
এখনকার একজন সাধারণ মানুষ দিনের মধ্যে প্রায় কয়েক ডজন বার সময় দেখে নেয়, কারণ আমরা যা কিছু করি তার প্রায় সবকিছুই সময়মত করতে হয়। একটা এলার্ম ঘড়ি আমাদের সকাল ৭টায় উঠিয়ে দেয়, এরপর আমরা আমাদের হিমায়িত খাবারগুলো মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দিয়ে ঠিক ৫০ সেকেন্ড গরম করে নেই, দাঁত ব্রাশ করি তিন মিনিট ধরে যতক্ষণ না ইলেক্ট্রিক টুথব্রাশটা একটা বিপ শব্দ করে জানান দেয়, ৭টা ৪০ এর ট্রেনটা ধরি কাজের জন্য, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আমাদের প্রিয় অনুষ্ঠানটা দেখতে টেলিভিশনের সামনে বসি ৭টার সময়, এর মাঝে বিরক্ত হই কিছু বিজ্ঞাপন দেখে যেগুলোর প্রতি সেকেন্ডের মূল্য প্রায় এক হাজার ডলার। নিজেদের সকল রাগ ঝাড়ি একজন পেশাদার মনোবিদের কাছে যাকে একটানা ৫০ মিনিটের বেশি পাওয়া যায় না।
