সত্যি বলতে কি, পরিবেশের এই অশান্তি মানুষের টিকে থাকাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ব্যাপক মাত্রার দূষণ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের জন্যই অনুপযুক্ত করে ফেলবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবী হয়তো ঘনঘনই একটা যুদ্ধ দেখবে- মানুষের ক্ষমতা আর মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দূর্যোগের পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ। যেহেতু মানুষ প্রকৃতির শক্তির বিরুদ্ধে তার ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে নিজের খেয়ালখুশি মত অধীনস্থ করে রাখতে চেষ্টা করে, তার ফলে হয়তো আরও বেশি বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হতে থাকবে। এরপর সেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে আরও প্রচণ্ড রকমের হস্তক্ষেপ করতে হবে পরিবেশের উপর, যার ফলাফল হবে আরও ভয়াবহ।
অনেকেই এই প্রক্রিয়াটাকে “প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞ” বলছেন। এটা কিন্তু আসলে ঠিক ধ্বংসযজ্ঞ না, এটা হল পরিবর্তন। প্রকৃতি কখনও ধ্বংস করা যায় না। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে একটা গ্রহাণু এসে পুরো ডাইনোসর প্রজাতিকে মুছে ফেলেছিল, আর তার ফলেই কিন্তু স্তন্যপায়ীদের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছিল। আজকে মানবজাতি অনেক প্রজাতিকেই বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে, এমনকি সে নিজেও হয়তো নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ অন্য কিছু জীব কিন্তু বেশ ভালোই আছে। উদাহরণস্বরূপ, ইঁদুর আর তেলাপোকা তো এখন তাদের পূর্ণবিকাশের পথে আছে। এই কঠিন প্রাণের জীবগুলো নিজেদের ডিএনএকে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য হয়তো একদিন একটা পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের তলা থেকেও হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসবে। হয়তো আজ থেকে সাড়ে ছয় কোটি বছর পর বুদ্ধিমান ইঁদুরেরা খুব কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে মানবজাতির ঐ ধ্বংসযজ্ঞকে, ঠিক যেমন আমরা স্মরণ করি ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া গ্রহাণুটিকে।
তারপরও, আমাদের নিজেদের বিলুপ্তির গুজবটা বেশ অকালপক্ব। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের জনসংখ্যা আগেকার যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়েছে। ১৭০০ সালের দিকে দুনিয়ায় মানুষ ছিল প্রায় ৭০ কোটি। ১৮০০ সালে এসে সেটা হল ৯৫ কোটি। ১৯০০ সালে আমরা নিজেদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ১৬০ কোটি করে ফেললাম। আর ২০০০ সালে এসে সেটা প্রায় চারগুণ হয়ে হলো ৬০০ কোটি। আজ আমরা ৭০০ কোটিরও বেশি।
আধুনিক যুগ
যখন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রকৃতির খেয়ালখুশিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দ্রুততার সাথে সংখ্যায় বেড়েছে তখনি কিন্তু তারা আবার আরও বেশি করে আধুনিক বাণিজ্য আর সরকারের গোলাম হয়ে গিয়েছে। শিল্প বিপ্লব আসলে মানুষের সামাজিকতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার এক বিরাট সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তার ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও মানসিকতায় এসেছে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন। এরকম অনেক উদাহরণের মধ্যে একটা হতে পারে- গতানুগতিক কৃষিকাজের প্রাকৃতিক ছন্দের জায়গায় কলকারখানার নিখুঁত উৎপাদন ব্যবস্থার আগমন।
মানুষের গতানুগতিক কৃষিকাজ প্রাকৃতিক ঋতুচক্র আর জৈবিক বৃদ্ধির উপর পুরোপুরি নির্ভর করত। বেশিরভাগ সমাজই পুঙ্খানুপুঙ্খ সময়ের হিসাব করতে পারত না, এমনকি তাদের তেমন গরজও ছিল না। শুধুমাত্র সূর্যের ঘূর্ণন আর উদ্ভিদের জৈবিক বৃদ্ধির উপর ভরসা করে পৃথিবীটা কোন সময়সূচি ছাড়াই বেশ চলছিল। কোন নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না। সব কাজের সময়সূচি এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে দারুণ ভাবে বদলে যেত। মানুষ জানতো সূর্য এই মুহুর্তে কোথায়। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো বর্ষার কিংবা হেমন্তের কিছু লক্ষণ দেখার জন্য। কিন্তু ঠিক দিন তারিখটা তারা জানতো না। কোন পথভোলা সময়যাত্রী (time traveller) যদি মধ্যযুগের এক গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হয়ে রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞেস করে “এটা কত সাল?”, তাহলে সেই গ্রামবাসী তার প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে যাবে। কারণ তখনকার দিনে এই প্রশ্নটা হবে ঐ সময়যাত্রীর পোশাকের মতোই উদ্ভট।
মধ্যযুগের কৃষক কিংবা মুচির বিপরীতে আজকের আধুনিক শিল্পকারখানা সূর্য আর ঋতুচক্রকে থোড়াই কেয়ার করে। বরং এটি নির্ভুলতা আর অভিন্নতার পুজো করে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যযুগের একটা কারখানায় প্রতিটি মুচিই একটা গোটা জুতো বানিয়ে ফেলত, একদম সোল থেকে শুরু করে ফিতে পর্যন্ত। যদি একজন মুচি কাজে দেরিতে আসতো সেটা অন্যদের কাজের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াত না। কিন্তু আজকের জুতো তৈরির কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে এক একজন শ্রমিক আসলে এক একটা যন্ত্র চালায় যেখানে জুতোর একটা নির্দিষ্ট অংশ তৈরি করে পরের যন্ত্রের কাছে দিয়ে দেয়া হয়। ৫ নম্বর যন্ত্রে যে কাজ করে সে যদি ঘুম থেকে দেরিতে ওঠে তাহলে এর পরের সব যন্ত্রকে থেমে যেতে হয়। এই ধরনের সমস্যা দূর করার জন্য প্রত্যেককে একটা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে হয়। প্রত্যেক শ্রমিক একই সময়ে কাজে আসে। খিদে লাগুক আর নাই লাগুক প্রত্যেকে একই সময়ে দুপুরের খাবার খায়। হাতের কাজ শেষ হয়ে গেলেই কেউ বাড়ি যায় না, সবাই অপেক্ষা করে একটা বাঁশি বাজার যেটা জানিয়ে দেবে যে তাদের কর্মঘণ্টা শেষ হয়েছে।

শিল্প বিপ্লব সময়সূচি এবং অ্যাসেম্বলি লাইনকে মানুষের সকল কাজকর্মের একটা সাধারণ ধাঁচ বানিয়ে ফেলল। কলকারখানাগুলো তাদের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করার পরপরই স্কুলগুলোও সময় বেঁধে দিল, তারপর হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর এমনকি মুদি দোকানও। যেসব জায়গায় কোন অ্যাসেম্বলি লাইন কিংবা যন্ত্র নেই সেখানেও সময়সূচি হয়ে গেল রাজা। যদি কারখানার কাজ শেষ হয় ঠিক বিকাল ৫টায়, তাহলে মদের দোকানটা ৫টার পরপর খোলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।