বর্তমান পৃথিবীতে যান্ত্রিক পশুপালন ব্যবস্থার উপাদান হিসেবে হাজার হাজার কোটি গবাদি প্রাণী বসবাস করে এবং প্রতিবছর পৃথিবী জুড়ে প্রায় পাঁচশত কোটি গবাদি পশুকে হত্যা করা হয়। শিল্পসম্মত যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে কৃষি উৎপাদন এবং মানুষের খাদ্যের যোগান খুব দ্রুত বহুগুণ বেড়েছে। শস্য এবং পশুপালনের এসব যান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে তুলেছে আধুনিক পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি। কৃষির শিল্পায়নের আগে শস্যক্ষেতে বা খামারে উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশই কৃষক এবং খামারের প্রাণীদের খাওয়ানোর কাজেই ‘অপচয়’(!) হতো। এসবের পর শিল্পী, শিক্ষক, সাধু-সন্ন্যাসী বা আমলাদের ভোগের জন্য খুব সামান্য অংশই অবশিষ্ট থাকত। এই কারণে, সে সময়ের প্রায় সব সমাজেই মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল কৃষক। শিল্প বিপ্লবের পর কৃষির যান্ত্রিকীকরনের সাথে সাথে অল্প কিছু সংখ্যক কৃষকের পক্ষে আরও বেশি বেশি কেরানি এবং কারখানার শ্রমিকদের খাদ্যের যোগান দেয়া সম্ভবপর হলো। আজকের দিনের আমেরিকায়, মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই ২ শতাংশ মানুষ যে কেবল আমেরিকার সব মানুষের খাদ্যশস্যের যোগান দেয় তাই নয়, বরং যোগান দেওয়ার পর অতিরিক্ত খাদ্যশস্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রপ্তানীও করে থাকে।৯ কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া নগর সভ্যতার বিকাশ সম্ভব হতো না, পাওয়া যেত না কল-কারখানা এবং অফিসে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত হাত ও মস্তিষ্ক।
কৃষিকাজ এবং পশুপালনের দায় থেকে বেরিয়ে আসা এইসব অগণিত হাত আর মস্তিষ্ক তৈরি করতে লাগল অজস্র নতুন নতুন পণ্যের সমাহার। মানুষ এখন আগের যে কোনও সময়ের থেকে বেশি পরিমাণে ইস্পাত, বস্ত্র, বড় বড় দালানকোঠা তৈরি করে। এসব ছাড়াও মানুষ আজকে বৈদ্যুতিক বাতি, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা এবং থালাবাসন ধোয়ার যন্ত্রের মত এমন অনেক পণ্য উৎপাদন করে যা আগে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মানুষের উৎপাদন ছাড়িয়ে গেছে তার চাহিদাকে। আর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটি সমস্যা- উৎপাদিত এতসব বাড়তি পণ্য কিনবে কে?
কেনাকাটার কাল
একটি হাঙরকে বেঁচে থাকার জন্যযেমন অবিরাম সাঁতরাতে হয়, আধুনিক ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকেও তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্রমাগত উৎপাদন বাড়াতেই হবে। কিন্তু, শুধু উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। কাউকে না কাউকে অবশ্যই সেসব উৎপাদিত পণ্য কিনতে হবে। এটা সম্ভব না হলে শিল্পপতি এবং বিনিয়োগকারী উভয়েই পথে বসবেন। এই দুরবস্থা এড়ানোর জন্য এবং শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্যগুলোর বিক্রিবাট্টা নিশ্চিত করার জন্য নতুন একটি ধারণার উদ্ভব হয়েছে তার নাম ‘ভোগবাদ’ (Consumerism)।
ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়ে বেশিরভাগ মানুষকেই নানারকম অভাবের বেড়াজালে বন্দী থাকতে হয়েছে। মিতব্যয়িতা ছিল তাদের জীবনবোধের অংশ। এ সংক্রান্ত দু’টো বিখ্যাত উদাহরণ হলো পিউরিটান (Puritans) এবং স্পার্টানদের (Spartans) জীবনদর্শনে কঠোর কৃচ্ছতাসাধনের উপস্থিতি। একজন ভাল মানুষ সবরকম বিলাসদ্রব্য এড়িয়ে চলবেন, কখনও খাবারের অপচয় করবেন না এবং জামাকাপড় ছিঁড়ে গেলে নতুন জামাকাপড় কেনার বদলে সেলাই করে পুরনো কাপড় দিয়েই চালানোর চেষ্টা করবেন। কেবলমাত্র রাজা এবং অভিজাত ব্যক্তিরাই প্রকাশ্যে জমকালো পোশাক পরে, বিলাস দ্রব্য ব্যবহার করে এই নিয়মের ব্যতিক্রম করতে পারবেন এবং তাদের পরিচয় জাহির করতে পারবেন।
অন্যদিকে ‘ভোগবাদ’ ক্রমাগত নতুন নতুন পণ্য ও সেবা ভোগ করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে। অসীম পণ্য ও সেবা ভোগের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ, নিজের ক্ষতিসাধন, এমনকি নিজেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারেও এটি মানুষকে উৎসাহিত করে। ‘ভোগবাদ’ অনুযায়ী কৃপণতা বা মিতব্যয়িতা হলো একটি অসুখ যার আশু প্রতিকার জরুরি। ভোগবাদের এই মূলনীতি বাস্তবে উপলব্ধি করার জন্য আপনাকে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। দোকান থেকে কিনে আনা একটি পণ্যের মোড়কে লেখা কথাগুলো পড়ুন। এখানে আমি সকালের নাস্তার জন্য খাওয়া টেলমা (Telma) নামে একটি কোম্পানির তৈরি আমার প্রিয় সিরিয়ালের প্যাকেটে লেখা কথাগুলো তুলে দিচ্ছি-
কখনও আপনার দরকার তৃপ্তির। কখনও আপনার দরকার একটু বেশি উদ্যম। ওজনের দিকে নজর দেয়ার অনেক সময় আপনি পাবেন, কখনো কখনো হয়ত কিছুমিছু একটা খেলেই হল। কিন্তু এখন? টেলমা নিয়ে এসেছে বিভিন্ন স্বাদের মজাদার সিরিয়াল শুধু আপনার জন্য – কোন দ্বিধা ছাড়া খুঁজে নিন আপনার সবটুকু তৃপ্তি।
একই মোড়কে আরেকটি পণ্য ‘হেলথ ট্রিটস’ এর বিজ্ঞাপন বলছে-
হেলথ ট্রিটস পর্যাপ্ত পরিমাণ শস্য, ফল এবং বাদামের সমন্বয়ে আপনাকে দেয় স্বাদ, আনন্দ ও স্বাস্থ্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। স্বাস্থ্যের দিকে পুরোপুরি নজর রেখে দুপুর বেলার খাবারে একটু আনন্দ আনার জন্য এর জুড়ি নেই। চমৎকার স্বাদে ভরা একটি পরিপূর্ণ সিরিয়াল।
ইতিহাসের অধিকাংশ সময়েই, কোন পণ্যের মোড়কে এ ধরনের কথা লেখা দেখলে মানুষ সম্ভবত আকৃষ্ট হওয়ার বদলে বিরক্তই হতো। এই ধরনের প্রচারণাকে তারা স্বার্থপর, মূল্যবোধহীন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের উপাদান হিসেবেই বিবেচনা করতো। ভোগবাদ অনেক চেষ্টার মাধ্যমে, ‘বেশি না ভেবে করে ফেল’ (Just do it!) – মনস্তত্ত্বের এই জনপ্রিয় ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে- মিতব্যয়িতা মানেই নিজের ইচ্ছার সাথে প্রতারণা করা, বেশি ভোগের মাঝেই আছে আনন্দের ফোয়ারা।
