বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী বন্য অবস্থায় বসবাসকালীন সময়ে গবাদিপশুগুলোর মধ্যে এইসব সামাজিক এবং মানসিক চাহিদার উদ্ভব হয়েছে। সেসময় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বংশবিস্তারের জন্য এই দুটো ব্যাপার ছিল অপরিহার্য। একটি বন্য গরুকে জানতে হত কীভাবে অন্যান্য গরু এবং ষাঁড়ের সাথে তাকে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কারণ, এটা না জানলে তার পক্ষে আত্মরক্ষা এবং বংশবিস্তার করা সম্ভব ছিল না। এইসব অপরিহার্য গুণাবলি অর্জনের জন্য অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো বিবর্তন গরুর বাছুরের ক্ষেত্রেও খেলাধুলার প্রতি একটা তীব্র আগ্রহ গড়ে তুলেছে (স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে খেলাধুলা করা সামাজিক আচরণ শেখার একটা উপায়) । পাশাপাশি বিবর্তন বাছুরের মধ্যে মায়ের সাথে একটা গভীর সম্পর্কের ভিতও রচনা করে দিয়েছে কারণ মায়ের দুধ এবং যত্ন একটি বাছুরের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।
এখন, একজন পশুপালক যদি একটি মেয়ে বাছুরকে তার মায়ের থেকে আলাদা করে একটি খাঁচায় রাখে, তাকে খাবার, পানি, রোগ প্রতিষেধক টিকা ও ওষুধ দেয় এবং বয়স হলে তাকে একটি ষাঁড়ের শুক্রাণু দিয়ে গর্ভবতী করে, তার অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? বস্তুগতভাবে চিন্তা করলে, টিকে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য বাছুরটির সামাজিক বন্ধন তৈরির বা খেলার সাথীর আর কোন দরকার নেই। কিন্তু বাছুরটির দিক থেকে বিবেচনা করলে আমরা দেখব তার মধ্যে মায়ের সাথে বন্ধন তৈরি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যান্য বাছুরের সাথে খেলাধুলা করার ইচ্ছা এখনও ভীষণভাবে উপস্থিত। এ চাহিদাগুলো পূরণ না হলে, বাছুরটি ভীষণরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। এটি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা- বন্য জীবনে টিকে থাকার জন্য তৈরি হওয়া সামাজিক চাহিদা বর্তমানে টিকে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য জরুরি না হলেও তা ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বে থেকে যায়। শিল্পনির্ভর কৃষির একটি দুঃখজনক দিক হলো, এটি কেবল প্রাণীদের বস্তুগত চাহিদার দিকে নজর দেয় এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।
আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ হ্যারি হারলো যখন বানরের বিকাশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন সেই ১৯৫০ এর দশক থেকে এই তত্ত্ব মানুষের জানা। গবেষণার জন্য হারলো জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই বাচ্চা বানরগুলোকে তাদের মায়ের থেকে আলাদা করলেন। বাচ্চাগুলোকে আলাদা খাঁচায় পুতুল মা বানরের সাথে রাখা হলো। প্রতিটি খাঁচায় হারলো দুটি পুতুল মা বানর রাখলেন। এর মধ্যে একটি পুতুল ধাতব তার দিয়ে বানানো যার মধ্যে দুধ ভরা একটি বোতল রাখা আছে যেখান থেকে বাচ্চা বানরটি চাইলে দুধ খেতে পারে। অপর পুতুলটি কাঠের উপর কাপড় দিয়ে এমনভাবে বানানো হয়েছিল যাতে সেটাকে দেখতে সত্যিকারের বানরের মতই লাগে। কিন্তু এই পুতুলটির সাথে বাচ্চা বানরকে খাওয়ানোর মত কোন উপকরণ দেয়া হলো না। ধারণা করা হলো, বাচ্চাটি তার প্রয়োজনের তাগিদেই কাঠ ও কাপড় দিয়ে বানানো মা বানরকে ছেড়ে ধাতব তারে বানানো দুধের বোতল ওয়ালা মা বানরের দিকে আকৃষ্ট হবে।
কিন্তু হারলো অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, বাচ্চাটি কাঠ ও কাপড়ে বানানো সত্যিকারের বানরের মতো দেখতে পুতুল মায়ের সাথেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। দুটো পুতুল মাকে যখন কাছাকাছি রাখা হলো, তখন দেখা গেল যে, বাচ্চা বানরটি ধাতব তারে বানানো পুতুল মায়ের থেকে দুধ খাবার সময়েও কাপড়ে বানানো মায়ের কাপড় আঁকড়ে ধরে আছে। হারলো ভাবলেন, হয়তো ঘরের তাপমাত্রা কম, এই কারণে বাচ্চাটি পুতুল মায়ের কাপড় আঁকড়ে আছে। একারণে তিনি ধাতব তারে তৈরি মায়ের ভেতর বৈদ্যুতিক বাল্ব স্থাপন করলেন যাতে সেখান থেকে তাপ নির্গত হয়ে জায়গাটা কিছুটা গরম থাকে। এরপরেও দেখা গেল, একদম সদ্যপ্রসূত বাচ্চাগুলো ছাড়া প্রায় সব বাচ্চাই কাপড়ের তৈরি মাকেই বেশি পছন্দ করছে।

পরবর্তী গবেষণাগুলো থেকে জানা গেল, মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নেয়া হারলোর বাচ্চা বানরগুলোকে সবরকম পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা হলেও তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা বানর সমাজে সহজভাবে মিশতে পারে না, অন্য বানরের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারে না, দুশ্চিন্তায় ভোগে এবং তাদের মাঝে আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায়। এতসব পরীক্ষা একটা কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, বস্তুগত চাহিদার বাইরেও বানরদের মানসিক চাহিদার একটা জগত আছে এবং সেই চাহিদা পূরণ না হলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হারলোর এতিম বানরগুলো কাপড়ে তৈরি মা বানরগুলোর সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছিল, কারণ কেবল দুধ তাদের চাহিদা ছিল না, তারা চাচ্ছিল মায়ের সাথে একটা মানসিক সম্পর্ক তৈরি করতে। পরবর্তী দশকগুলোতে অনেকগুলো গবেষণা প্রমাণ করে এই মানসিক চাহিদার ব্যাপারটি কেবল বানর নয়, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এমনকি পাখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানে, খামারে পালন করা কোটি কোটি গবাদি পশুর অবস্থা হারলোর মা থেকে আলাদা করা বানরগুলোর মত, কারণ খামারিরা পৃথকভাবে পালন করার জন্য নিয়মিত বাছুর এবং বাচ্চাগুলোকে তাদের মায়ের থেকে আলাদা করে সরিয়ে নেয়।৮