ভোগবাদ সফল হয়েছে। আজকে আমরা সকলেই ভাল ভোক্তা। গতকাল পর্যন্ত পৃথিবীতে যার কোনও অস্তিত্ব ছিল না এবং আমাদের কোনও দরকার নেই এমন অসংখ্য পণ্য আজ আমরা কিনি। উৎপাদনকারীরা ইচ্ছা করেই স্বল্পমেয়াদী পণ্য তৈরি করেন, ঠিকঠাক কাজ চলছে এমন একটি পণ্যেরও নতুন মডেল উদ্ভাবন করেন এবং আমরা সবার সাথে তাল মেলানোর জন্য সেসব কিনি। কেনাকাটা করা আজ আমাদের অবসর যাপনের অংশ এবং নানারকম ভোগ্যপণ্য আমাদের পরিবারের সদস্য, জীবনসঙ্গী এবং বন্ধুদের মাঝে সম্পর্কের সেতু হিসেবে কাজ করে। ক্রিসমাসের মতো ধর্মীয় ছুটির দিনগুলো কেনাকাটার উৎসবে পরিণত হয়েছে। এমনকি, আমেরিকায়, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া সাহসী সৈনিকদের স্মরণে তৈরি হওয়া ‘মেমোরিয়াল ডে’ পরিণত হয়েছে দোকান থেকে বিশেষ ছাড়ে পণ্য কেনার উপলক্ষ্যে। বেশিরভাগ মানুষই এই দিনটিকে কেনাকাটা করার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখেন, সম্ভবতঃ কেনাকাটার মধ্য দিয়েই তারা প্রমাণ করতে চান, দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদদের আত্নত্যাগ বৃথা যায়নি।
ভোগবাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় খাবারের দোকানগুলোতে। আগেকার গৎবাঁধা কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে মানুষের সাথে ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকত অনাহার। আজকের সম্পদশালী পৃথিবীতে অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ‘স্থূলতা’। মজার ব্যাপার হলো উন্নত দেশে স্থূলতার এই সমস্যা গরিবদের মাঝেই বেশি, কারণ তারা পেট পুরে হ্যামবার্গার আর পিজ্জা খেতে ভালোবাসে। অপরদিকে ধনীদের মাঝে এই স্থূলতার হার কম কারণ তারা খায় টাটকা সবজিতে তৈরি সালাদ আর ফলের রসে তৈরি স্মুদি। প্রতি বছর বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, আমেরিকান জনগোষ্ঠী তার থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করে নিজেদের স্থূলতা কমাতে এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে। স্থূলতার ক্ষেত্রে ভোগবাদ দুই দিক থেকে জয়লাভ করেছে। প্রথমত, কম খাওয়ার বদলে মানুষ বেশি খাচ্ছে, ফলে অর্থনীতির সংকোচন হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, অর্জিত স্থূলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা পণ্য কিনছে, ফলে অর্থনীতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, পুঁজিবাদে বিশ্বাসী একজন ব্যবসায়ী, ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা ব্যয় না করে যিনি নতুন নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী, তার ধারণার সাথে ভোগবাদের আরও বেশি ভোগ করার ধারণা কিভাবে একই সময়ে, একই সমাজে সহাবস্থান করে? উত্তরটা সোজা। অতীতের সমাজগুলোর মত আজকের দিনের সমাজেও ধনী ও গরিবের মাঝে একটি সুস্পষ্ট ভেদরেখা বিদ্যমান। মধ্যযুগের ইউরোপে ধনীরা নিজেদের ভোগবিলাসের জন্য যথেচ্ছ অর্থ ব্যয় করতেন, আর গরীবদের বেছে নিতে হত কৃচ্ছ্রতার জীবন, হিসাব করে খরচ করতে হত প্রতিটা পয়সা। আজকে, পাশার দান উল্টে গেছে। আজ, ধনীরা তাদের সম্পদ এবং বিনিয়োগের যত্ন নেয়, হিসেব রাখে, অপরদিকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণী প্রয়োজন না বুঝেই নতুন গাড়ি বা হাল ফ্যাশনের টেলিভিশন কিনতে গিয়ে ঋণের চোরাবালিতে ডুবতে থাকে।
ধনতন্ত্র আর ভোগবাদ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, দুটি পরিপূরক বিধান। এক দলের জন্য অনিবার্য বিধান- ‘বিনিয়োগ’, আর বাকি সবার জন্য অনিবার্য বিধান- ‘ভোগ’।
ধনতন্ত্র এবং ভোগবাদের এই সম্মিলিত ধারণা আরেকটি দিক থেকেও বৈপ্লবিক। অতীতের ন্যায়নীতি সংক্রান্ত অধিকাংশ ধারণাগুলোই অনুসরণ করা মানুষের জন্য ছিল দুঃসাধ্য। বেশিরভাগ মত অনুযায়ী, মানুষ ইহকালে যদি দয়াবান ও সহনশীল হয়, রাগ এবং চাহিদা বিসর্জন দেয় এবং আপন স্বার্থপরতার উর্ধ্বে যেতে পারে তবেই কেবলমাত্র তার পক্ষে ভোগের জন্য স্বর্গ পাওয়া সম্ভব। ইহকালে এতকিছু করা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই ছিল খুবই কঠিন। ন্যায়শাস্ত্রের ইতিহাস তাই দুঃখের ইতিহাস, যেখানে মানুষের জন্য অনেক মহৎ আদর্শের সন্ধান আছে, কিন্তু মানুষ যেগুলোর কোনটিই ঠিকমতো পালন করতে পারেনি। বেশিরভাগ খ্রিস্টান যিশুর জীবনকে অনুকরণ করে চলতে পারেননি, বেশিরভাগ বৌদ্ধ অনুসরণ করতে পারেননি গৌতম বুদ্ধকে এবং বেশিরভাগ কনফুশিয়ানের জীবন যাপন দেখলে কনফুসিয়াস নিজেই হয়তো রাগ সংবরণ করতে পারতেন না।
অপরদিকে, আজকের দিনের বেশিরভাগ মানুষই ধনতন্ত্র ও ভোগবাদের সম্মিলিত আদর্শ পুরোপুরি মেনে চলে। নতুন এই আদর্শের স্বর্গ প্রদানের শর্ত হলো- ধনীদেরকে সবসময় লোভী থাকতে হবে এবং ব্যস্ত থাকতে হবে আরও বেশি মুনাফা অর্জনের চেষ্টায়, আর সাধারণ মানুষদের লাগামছাড়া চাহিদা আর ইচ্ছার ঘোড়ায় সওয়ার হতে হবে এবং আরও বেশি, আরও বেশি পণ্য কিনতে হবে। এটাই প্রথম ধর্ম যার অনুসারীরা ধর্ম তাদেরকে যা করার বিধান দিয়েছে ঠিক তাই মেনে চলছে। নতুন ধর্মের এতসব বিধান মেনে চলার বিনিময়ে যে স্বর্গ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তার স্বরূপ কি আমরা জানি? জানি, টেলিভিশনের হাজার হাজার রঙিন বিজ্ঞাপনের মাঝে বহুবার, বহুভাবে সেই স্বর্গের রূপ আমরা দেখেছি।
——————-
1 Mark, Origins of the Modern World, 109.
2 Nathan S. Lewis and Daniel G. Nocera, ‘Powering the Planet: Chemical Challenges in Solar Energy Utilization’, Proceedings of the National Academy of Sciences 103:43 (2006), 15,731.
