গত দুইশ বছরে শিল্পজাত উপকরণ কৃষিকাজের প্রধান অবলম্বনে পরিণত হয়েছে। ট্রাক্টরের মত যন্ত্রগুলো এককালের অসম্ভব অথবা পেশীশক্তির উপরে একান্ত নির্ভরশীল কাজগুলো সহজে করতে সহায়তা করছে। কৃত্রিম সার, কীটনাশক, নতুন নতুন হরমোন আর ওষুধের গুণে মাঠের ফসল আর গবাদি পশুর উৎপাদন দুটোই বেড়ে গেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, জাহাজ আর বিমান উৎপাদিত পণ্য মাসের পর মাস সংরক্ষণ করতে, সুলভে এবং দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে সাহায্য করছে। ফলশ্রুতিতে, একজন ইউরোপিয়ানের রাতের খাবারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আর্জেন্টিনার তাজা গোমাংস কিংবা জাপানে তৈরি সুশি।
উদ্ভিদ এবং প্রাণীরাও এই যান্ত্রিক বিপ্লবের শিকারে পরিণত হয়েছে। মানবতাবাদী ধর্মগুলো যখন তাদের চর্চিত মূল্যবোধ দ্বারা মানুষের জীবনকে স্বর্গীয় সুষমায় বিভূষিত করছে, সেই একই সময়ে খামারে পালিত গবাদিপশুগুলোকে দেখা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক অনুভূতিহীন উৎপাদন যন্ত্র হিসেবে। আজকের দিনে এই গবাদিপশুগুলোকে শিল্পকারখানায় উৎপাদিত অন্যান্য পণ্যের মতই বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা হয়, ব্যবসায়িক চাহিদার কথা চিন্তা করেই গড়ে তোলা হয় তাদের শারীরিক গড়ন। তাদের পুরো জীবনটা যেন একটি বিশাল শিল্পোৎপাদন পদ্ধতির নিছক একটা উপকরণ মাত্র। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ-ক্ষতিই নির্ধারণ করে দেয় তাদের জীবনকাল এবং প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ যত্ন নেয় এবং পর্যাপ্ত দানাপানির যোগান দেয়, তখনও তারা প্রাণীগুলোর সামাজিক ও মানসিক চাহিদার কথা ভাবে না (যদি না এসব চাহিদা উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না হয়), ব্যবসায়িক লাভের কথা চিন্তা করেই তারা এমনটা করে।
ডিম পাড়া মুরগির কথাই ধরা যাক, এদেরও আচরণ ও উদ্দীপনাগত চাহিদার একটি জটিল, সূক্ষ্ম জগত আছে। নিজস্ব পরিবেশে বেড়ে ওঠা, ঘুরে ঘুরে ঠুকরে খাবার সংগ্রহ করা, সামাজিক স্তরবিন্যাস তৈরি করা, বাসা তৈরি এবং নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলার ব্যাপারে এদেরও আছে তীব্র আকর্ষণ। কিন্তু ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত একটা ছোট খাঁচার মধ্যে মুরগিগুলোকে বন্দী করে রাখে এবং প্রায়ই দেখা যায় একটি ছোট খাঁচায় গাদাগাদি করে চারটি মুরগি রাখা, প্রতিটা মুরগির জন্য বরাদ্দ জায়গা যেখানে মাত্র দৈর্ঘ্যে পঁচিশ ও প্রস্থে বাইশ সেন্টিমিটার। মুরগিগুলোকে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার দেয়া হয় কিন্তু নিজের বাড়ি বানানো, সামাজিক ও প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন এবং নিজের আবাস বলে ভাবার মতো কোন জায়গা তার জন্য বরাদ্দ থাকে না। এমনকি খাঁচাগুলো অনেকসময় এতটাই ছোট হয় যে মুরগিগুলো ঠিকমত সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা ডানা ঝাপটাতে পর্যন্ত পারে না।
বুদ্ধিমত্তা ও কৌতূহলের বিচারে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম হল শুকর, সম্ভবত নরবানরদের পরেই এদের স্থান। তা সত্ত্বেও খামারগুলোতে পূর্ণবয়স্ক শুকরীদের প্রায়ই এত ছোট একটি কাঠের খাঁচার মাঝে রাখা হয় যেখানে তারা হাঁটা বা চরে বেড়ানো তো দূরের কথা, ঘুরে বসতে পর্যন্ত পারে না। বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর চার সপ্তাহ সমস্ত দিন-রাত বাচ্চাগুলোকে মা শুকরীর সাথে এই আবদ্ধ খাঁচায় রাখা হয়। এরপর বাচ্চাগুলোকে মোটাতাজা করার জন্য মায়ের থেকে আলাদা করা হয় এবং মা শুকরীকে আবার গর্ভধারণ করতে বাধ্য করা হয়।
অনেক গরুর খামারেই গরুগুলোকে তাদের জীবনের পুরোটাই কাটাতে হয় একটি ছোট্ট আবদ্ধ পরিবেশে। নিজেদের মল-মূত্রের উপরই শোয়া, বসা আর ঘুমানোই হয়ে ওঠে তাদের নিয়তি। কতকগুলো যন্ত্র তাদের নিয়মিত খাবার, হরমোন আর ওষুধপত্র সরবরাহ করে। আর কতকগুলো যন্ত্র নিয়মিত এসে দুইয়ে নিয়ে যায় দুধ। গাভীগুলোকে যেন একটি যন্ত্রবিশেষ, যে মুখ দিয়ে কাঁচামাল গ্রহণ করে আর ওলান দিয়ে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করে। জটিল অনুভূতির জগত সম্পন্ন এসব প্রাণীদেরকে যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার ফলে তাদেরকে যে কেবল শারীরিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাই নয়, তাদের সামাজিক এবং মানসিক জীবনেও মানুষের এসব আচরণ তৈরি করছে অসহনীয় চাপ।৭

আফ্রিকানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে যেমন আটলান্টিক অঞ্চলে দাস ব্যবসার জন্ম হয়নি, ঠিক একইভাবে প্রাণীদের প্রতি কোনও বিদ্বেষ থেকেও বড় আকারের গবাদি পশু শিল্প গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, অস্বীকার করার উপায় নেই, আফ্রিকান এবং প্রাণীদের প্রতি উদাসীন মনোভাবই এসব ব্যবসার গতিশীল হবার মূল কারণ। যারা ডিম, দুধ বা মাংসের ভোক্তা তাদের মাঝে খুব কম সংখ্যক মানুষই এসবের সাথে জড়িত মুরগি, গরু বা শুকরের জীবনের পরিণতি নিয়ে ভাবেন। যে অল্প কজন ভাবেন, তাদেরকেও প্রায়শই বলতে শোনা যায়, যন্ত্রের সাথে এইসব গবাদি পশু বা পাখির তেমন কোন পার্থক্য নেই। এই প্রাণীগুলো সংবেদনশীলতা এবং আবেগ বর্জিত এবং তাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি নেই। মজার ব্যাপার হলো বিজ্ঞানের যে শাখাটি বাণিজ্যিকভাবে দুধ বা ডিম উৎপাদনের অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করেছে, বিজ্ঞানের সে শাখাটিই সাম্প্রতিককালে সন্দেহাতীতভাবে একথা প্রমাণ করেছে যে, এইসব স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদেরও আছে একটি সংবেদনশীল অনুভূতি ও আবেগের জগত। তারা যে কেবল শারীরিক সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে তাই নয়, মানসিক যন্ত্রণাও তাদের ভোগায়।