শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষের শক্তির বাজার পুরোপুরি গাছপালার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। সুতরাং, মানুষকে দুনিয়াব্যাপী ৩,০০০ এক্সাজুল শক্তি গ্রহণকারী উৎস গাছপালার কাছাকাছি বসবাস করতে হত, গাছপালা তার গ্রহণকৃত শক্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ মানুষের গ্রহণোপযোগী খাদ্যে রূপান্তর করে ফেরত দিত। গাছের এই রূপান্তর করে দেয়া শক্তির পরিমাণ ছিল সীমিত। শিল্প বিপ্লবের সময় আমরা বুঝতে পারলাম, আমরা আসলে অনেকগুলো শক্তির সাগরের উপর বসবাস করছি যাদের প্রতিটি উৎসের কোটি কোটি এক্সাজুল শক্তি দেয়ার সক্ষমতা আছে। আমাদের কেবল সেসব শক্তি উত্তোলন বা সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।
যথাযথ উপায়ে শক্তি সংগ্রহ ও রূপান্তর সম্পর্কে জানার চেষ্টা অর্থনীতিকে শ্লথ করে দেয়া আরেকটি সমস্যা সমাধান করতে মানুষকে সাহায্য করল। সেটি হলো- কাঁচামালের দুষ্পাপ্র্যতা। মানুষ যত কম খরচে বেশি পরিমাণ শক্তি আহরণ করা শিখতে লাগল, ততই মানুষের নতুন নতুন কাঁচামাল সংগ্রহ (উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সাইবেরিয়ার পতিত জমি থেকে লোহা উত্তোলনের কথা) এবং দূর-দূরান্ত থেকে কাঁচামাল পরিবহনের (যেমন একটি ব্রিটিশ পোশাক কারখানায় অস্ট্রেলীয় উলের সরবরাহ) সক্ষমতা বাড়তে লাগল। একই সাথে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি মানুষকে প্লাস্টিকের মত সম্পূর্ণ নতুন কাঁচামাল উদ্ভাবন এবং সিলিকন, অ্যালুমিনিয়ামের মত অচেনা কাঁচামাল আবিষ্কার করতে সহায়তা করল।
বিজ্ঞানীরা ১৮২০ সালের দিকে এসে অ্যালুমিনিয়ামের সন্ধান পান। কিন্তু, আকরিক থেকে অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশন ছিল কষ্টসাধ্য এবং প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ। কয়েক দশক যাবৎ অ্যালুমিনিয়াম ছিল সোনার চেয়ে দামী ধাতু। ১৮৬০ সালের দিকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ান, তার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত অতিথিদেরকে অ্যালুমিনিয়ামের থালাবাসনে অাপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। এর থেকে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার অতিথিরা পেতেন সোনার ছুরি এবং কাঁটাচামচ দিয়ে ভোজনের সুযোগ।৫ ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে এসে কিছু রসায়নবিদ অনেক কম খরচে বিপুল পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশনের উপায় বের করেন এবং বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপন্ন হয়। তৃতীয় নেপোলিয়ান যদি জানতেন তার উত্তরসূরীরা আজ অ্যালুমিনিয়ামে বানানো মোড়ক দিয়ে স্যান্ডউইচ মুড়ে রাখে এবং খাওয়া শেষে অ্যালুমিনিয়ামের মোড়কটিকে আবর্জনার বাক্সে ফেলে দেয়, নিশ্চয়ই বিস্ময়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত।
দুই হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের অধিবাসীরা ত্বকের শুষ্কতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হাতে শুধু জলপাইয়ের তেল মালিশ করতেন। আজ, তারা শুষ্কতা প্রতিরোধের জন্য হ্যান্ডক্রিমের টিউবের ঢাকনা খোলেন। আমি স্থানীয় একটি দোকান থেকে যে সাধারণ হ্যান্ডক্রিমটি কিনেছি, তার উপাদানগুলো নিম্নরূপ-
পরিশ্রুত পানি, স্টিয়ারিক এসিড, গ্লিসারিন, ক্যাপ্রিলিক/ক্যাপ্রিকটিগ্লাইসেরাইড, প্রোপাইলিন গ্লাইকল, আইসোপ্রোপাইল মাইরিস্টেট, পানাক্স জিনসেং শেকড়ের নির্যাস, সুগন্ধী, সিটাইল অ্যালকোহল, ট্রাইথানোলামাইন, ডাইমেটিকোন, বিয়ারবেরী পাতার নির্যাস, ম্যাগনেসিয়াম অ্যাসকোবাইল ফসফেট, ইমিডাজলিডিনল ইউরিয়া, মিথাইল প্যারাবেন, ক্যামফর, প্রোপাইল প্যারাবেন, হাউড্রক্সিআইসোহেক্সাইল ৩-সাইক্লোহেক্সেন কার্বোক্সাল্ডিহাইড, হাইড্রোক্সাইল-সাইট্রোনেলাল, লিনালুল, বিউটাইল ফেনাইল মিথাইল প্রোপলোনাল, সাইট্রোনেলোল, লিমোনিন, জেরানিয়ল।
এর বেশিরভাগই উপাদানই উদ্ভাবিত অথবা আবিষ্কৃত হয়েছে গত দুই শতকের মাঝে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি অবরোধের শিকার হয় এবং তাদের কাঁচামাল শূন্যতা দেখা দেয়। বিশেষ করে সংকট তৈরি হয় বারুদ এবং অন্যান্য বিস্ফোরক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সল্টপিটারের (saltpetre)। সল্টপিটার প্রধান যোগান ছিল চিলি আর ভারতে, জার্মানীর নাগালের বাইরে। সল্টপিটার বিকল্প রাসায়নিক ছিল অ্যামোনিয়া, কিন্তু তখন অ্যামোনিয়ার উৎপাদন ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জার্মানদের জন্য সুখের খবর এই যে, ১৯০৮ সালে ফ্রিটজ হ্যাবার নামের একজন ইহুদি জার্মান আক্ষরিক অর্থেই বাতাস থেকে অ্যামোনিয়া তৈরির একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন জার্মানরা হ্যাবারের আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে বাতাসকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন শুরু করল। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, হ্যাবারের আবিষ্কার না থাকলে জার্মানি ১৯১৮ সালের অনেক আগেই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হত। হ্যাবারের এই আবিষ্কার (যুদ্ধের সময় বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও যিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব) তাকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার। অবশ্য তাকে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে রসায়নে।
খাঁচায় বন্দী জীবন
শিল্প বিপ্লব এনে দিয়েছে ব্যয়সাশ্রয়ী শক্তি ও কাঁচামালের প্রাচুর্য। ফলশ্রুতিতে অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে উৎপাদন। উৎপাদনের এই বিস্ফোরক গতির পরিচয় প্রথম পাওয়া যায় কৃষিক্ষেত্রে। এমনিতে শিল্প বিপ্লবের কথা চিন্তা করলেই আমাদের চোখে ভাসে কালো ধোঁয়া উঠা চিমনি সমতে একটি শহরের ছবি বা মাটির তলদেশের কয়লাখনিতে খননকাজে লিপ্ত ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত শ্রমিকদের ছবি। কিন্তু, এ সবকিছুর পরেও শিল্প বিপ্লব প্রধানত দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লব।
