১৮২৫ সালে খনির কয়লাভর্তি বগিওয়ালা একটি ট্রেনের সাথে একজন ব্রিটিশ প্রকৌশলী একটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন জুড়ে দিলেন। এই ইঞ্জিন লোহার তৈরি একটি রেললাইনের উপর দিয়ে বগিগুলোকে কয়লাখনি থেকে বিশ কিলোমিটার দূরের এক বন্দরে পৌছে দিল। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম বাষ্পচালিত যান। এরপরের হিসেব আরও সহজ, বাষ্পচালিত ইঞ্জিন যদি কয়লাভর্তি বগি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, তবে অন্যান্য জিনিস কেন নয়? আর তাতে মানুষই বা চড়তে পারবে না কেন? ১৮৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মানুষ বহন করার জন্য লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত প্রথম বাণিজ্যিক রেললাইন চালু হল। যে বাষ্পের শক্তি কয়লা খনির পানি নিষ্কাশন আর তাঁতকল চালাতে ব্যবহৃত হতো, সেই একই শক্তি ব্যবহার করেই চলতে শুরু করল এই ট্রেন। পরবর্তী বিশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটেনে দশ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের রেললাইন জুড়ে রেলগাড়ি চলতে শুরু করল।
এইসব ঘটনা থেকে মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মাল যে, যন্ত্র ব্যবহার করে একরকম শক্তিকে অন্য শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। উপযুক্ত যন্ত্র থাকলে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে, যে কোন ধরনের শক্তিকে আমরা অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ যখন জানলো যে, পরমাণুর মধ্যে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে, তৎক্ষণাৎ তার মনে চিন্তা জন্মাল, কীভাবে পরমাণুর এই শক্তিকে অবমুক্ত করা যায় এবং তা দিয়ে বিদ্যুৎ, যুদ্ধের সাবমেরিন বা নগর ধ্বংসকারী পারমাণবিক বোমা বানানো যায়। চীনাদের বারুদ আবিষ্কার এবং তা ব্যবহার করে বানানো কামান দিয়ে তুর্কিদের কনস্টানটিনোপলের দেয়াল ধ্বংস করার মধ্যবর্তী সময় ছিল ছয়শ’ বছর। অথচ আইনস্টাইনের ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করার গাণিতিক সূত্র E=mc2 আবিষ্কার আর পারমাণবিক বোমা দিয়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরকে ধুলিসাৎ করে দেওয়া বা বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র গজিয়ে ওঠার মধ্যবর্তী সময় ছিল মাত্র চল্লিশ বছর!
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল অন্তর্দহ (internal combustion) ইঞ্জিনের আবিষ্কার, যেটি এক প্রজন্মের কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যেই পরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে এবং পেট্রোলিয়াম পরিণত হয় তরল রাজনৈতিক শক্তিতে। এর হাজার বছর আগে থেকেই পানিরোধী ঘরের ছাদ তৈরিতে বা গাড়ির চাকার পিচ্ছিলকারক পদার্থ হিসেবে পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কিন্তু, গত একশ বছরের আগে পেট্রোলিয়ামের অন্য কোন সম্ভাবনার কথা কারও মাথায়ই আসেনি। সে সময় তেলের মালিকানা লাভের জন্য যুদ্ধ ও রক্তস্রোত বইয়ে দেবার মত ধারণাই ছিল হাস্যকর। হ্যাঁ, রাজ্য, সোনাদানা, মরিচ কিংবা দাস অধিকার করার জন্য যুদ্ধ হতেই পারে, কিন্তু তেলের জন্য যুদ্ধ, অসম্ভব!
বিদ্যুতের গল্প আরও বেশি রোমাঞ্চকর। দুইশ বছর আগেও অর্থনীতিতে বিদ্যুতের কোন অবদানই ছিল না। কিছু গোপন বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর সস্তা জাদুর খেলা দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এর ব্যবহার। কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বিদ্যুৎকে পরিণত করলো জাদুর প্রদীপের দৈত্যে। আজকে আমাদের এক তুড়িতে বিদ্যুৎ ছাপিয়ে ফেলে বই, সেলাই করে কাপড়, তরতাজা রাখে শাকসবজি, জমিয়ে তোলে আইসক্রিম, রান্না করে খাবার আর মৃত্যুদণ্ড দেয় অপরাধীদের, লিপিবদ্ধ করে আমাদের ভাবনা-চিন্তা আর ফ্রেমে বন্দী করে আমাদের হাসি-কান্না, রাতকে জাগিয়ে তোলে দিনের আলোয় আর টিভির অগণিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের দেয় বিনোদনের খোরাক। বিদ্যুৎ কীভাবে এগুলো করে সেটা খুব কম লোকই জানে, অথচ বিদ্যুৎ ছাড়া জীবনের কথা কেউ আজ কল্পনাও করতে পারে না।
শক্তির সাগর
একবারে শিকড় থেকে চিন্তা করলে, শিল্প বিপ্লব আসলে শক্তির রূপান্তরের বিপ্লব। এটা বারবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, মানুষের ব্যবহারযোগ্য শক্তির যোগান সীমাহীন। আরও সঠিক ভাবে বললে, শক্তির পরিমাণকে একমাত্র সীমাবদ্ধ করে তুলতে পারে মানুষের অজ্ঞতা। কয়েক দশক পর পরই আমরা শক্তির নতুন একটি উৎসের সন্ধান পাই এবং মানুষের ব্যবহারযোগ্য শক্তির পরিমাণ বাড়তে থাকে।
তাহলে, দুনিয়াজুড়ে এত মানুষ শক্তির ফুরিয়ে যাবার আশঙ্কায় ভীত কেন? কেন তারা জীবাশ্ম জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে দুনিয়াজুড়ে আসন্ন মহাবিপর্যয় সম্পর্কে বারবার আমাদের সতর্ক করেন? এটা তো নিশ্চিত পৃথিবীতে শক্তির কোন অভাব নেই। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো সে শক্তিকে আহরণ করা এবং আমাদের প্রয়োজন অনুসারে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব। গোটা দুনিয়ায় যে পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানির যোগান আছে, সূর্য একদিনে বিনামূল্যে তার বহুগুণ শক্তি আমাদের দিয়ে থাকে। সূর্যের মোট শক্তির মাত্র সামান্য একটা অংশ পৃথিবীতে আসে। এই সামান্য অংশটুকুরই বাৎসরিক পরিমাণ ৩,৭৬৬,৮০০ এক্সাজুল (১ এক্সাজুল = ১০১৮ জুল, জুল হলো মেট্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী শক্তি পরিমাপের একক, মোটামুটিভাবে এক জুল হলো একটি আপেলকে মাটি থেকে এক গজ উপরে তুলতে প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ। এক্সাজুল মানে এক কোটি কোটি জুল। অর্থাৎ, এক এক্সাজুল শক্তি দিয়ে এক কোটি কোটি আপেলকে মাটি থেকে উপরে তোলা যাবে)।২ পৃথিবীর সকল গাছপালা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদনের জন্য এর মধ্যে মাত্র ৩,০০০ এক্সাজুল শক্তি ব্যবহার করে।৩ মানুষ এক বছরে সকল কর্মকাণ্ড এবং শিল্প কারখানায় মোট খরচ করে ৫০০ এক্সাজুল, যা নব্বই মিনিটে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা সৌরশক্তির সমান।৪ এসব তো গেল কেবল সৌরশক্তির কথা। সূর্য ছাড়াও পারমাণবিক শক্তি এবং অভিকর্ষের মত শক্তিগুলো আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। এর মাঝে চাঁদের পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণের কারণে সাগরে সৃষ্ট জোয়ার থেকে অভিকর্ষ শক্তির ধারণা সহজেই বোঝা যায়।
