সুতরাং, এতদিন মানুষের ইতিহাস নির্ভরশীল ছিল দু’টো প্রধান চক্রের উপর- গাছপালার বেড়ে ওঠার চক্র আর সূর্যের আলোর চক্র (দিন বা রাত, গ্রীষ্ম কিংবা শীত)। কোন অঞ্চলে যখন সূর্যের আলো কম, ক্ষেতে শস্য এখনও পেকে ওঠে নি, সেখানে তখন মানুষের শক্তি থাকত কম। ফাঁকা থাকত গোলা, কর সংগ্রহকারী পাইক পেয়াদারও করার কিছু থাকত না, সৈন্যদের পক্ষে যুদ্ধ জয় করতে যাওয়া সম্ভব হত না আর রাজারাও তখন তাঁবু টানিয়ে শান্তিতে ঝিমোতেন। আবার সূর্য যখন পূর্ণ তেজে জ্বলে উঠত, ফসলের ক্ষেত ভরে উঠত পাকা ফসলে, কৃষকেরা তখন ফসল কাটতে আর গোলায় ফসল জমানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তো। কর সংগ্রহকারী পাইক-পেয়াদারা কর সংগ্রহে হন্যে হয়ে উঠতো। সৈন্যদের পেশীর জোর আর তলোয়ারের ধার যেত বেড়ে। রাজামশাই আয়োজন করতেন বড় বড় সভার এবং সিদ্ধান্ত নিতেন রাজ্যের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে। সকলেরই চালিকা শক্তি ছিল ভুট্টা, ধান এবং আলুর মাঝে জমে থাকা সৌর শক্তি।
হেঁশেলে লুকিয়ে থাকা মানিক
হাজার হাজার বছর ধরে শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি দিনরাত মানুষের হাতের কাছেই ঘুরঘুর করেছে। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে, কেউ সেটা খেয়াল করে দেখেনি। একজন গৃহিণী বা চাকর যতবার চায়ের জন্য কেটলিতে পানি ফুটিয়েছে বা আলু সিদ্ধ করার জন্য হাঁড়িতে পানি চড়িয়ে উনুনে রেখেছে, ততবার এই আবিষ্কার মানুষের চোখে চোখ রেখে মুখ টিপে হেসেছে। পানি যখনই ফুটতে শুরু করেছে, কেটলি বা হাঁড়ির ঢাকনা ঠিক একটু পরেই লাফিয়ে উঠেছে। তাপ রূপান্তরিত হয়েছে বস্তুকে নাড়িয়ে দেয়ার শক্তিতে। কিন্তু, পানি ফোটার পর সময়মত কেটলি বা হাঁড়ির ঢাকনা না সরানো হলে বারবার ঢাকনার লাফিয়ে ওঠা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার। তাই, কেউ এই বিষয়টাকে আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।
উনবিংশ শতকে বারুদ আবিষ্কারের পরপরই তাপকে বস্তুর নড়াচড়া বা সরণে রূপান্তর করার একটি প্রক্রিয়ার আংশিক উদ্ভাবন হয়। প্রথম প্রথম কামানের গোলায় বারুদ ব্যবহারের চিন্তাটাই এত আজগুবি ছিল যে মানুষ শত শত বছর ধরে কেবলমাত্র আতশবাজি তৈরির কাজেই বারুদ ব্যবহার করে এসেছে। পরবর্তীতে, সম্ভবত যেদিন বারুদ গুঁড়ো করতে গিয়ে হামানদিস্তা থেকে পেষণীটা ছুটে বেরিয়ে গেল, সেদিনই তৈরি হলো প্রথম বন্দুক।- আর সেদিন থেকেই জন্ম হল বন্দুকের। বারুদের আবিষ্কার এবং সত্যিকারের যুদ্ধাস্ত্রে তার ব্যবহার হতে প্রায় ছয়শ বছর লেগে গেল।
এতকিছুর পরেও, সে সময় তাপকে সরণে পরিণত করার ধারণাটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে, তাপ ব্যবহার করে বস্তু সরানোর প্রথম যন্ত্রটি তৈরি করতে মানুষের আরও তিনশ বছর লেগে গেছে। প্রায় তিনশ বছর পর এই নতুন প্রযুক্তি জন্ম নিল ব্রিটেনের কয়লা খনিতে। সে সময়, জনসংখ্যা বাড়ার দরুন বর্ধিত জনগণের আবাস আর চাষের জমির জন্য ব্রিটেনের বনভূমি উজাড় হতে শুরু করেছে। ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে জ্বালানি কাঠের যোগান। মানুষ কাঠের বদলে খনিজ কয়লাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তখনকার ব্রিটেনে অনেক কয়লাখনিই ছিল জলমগ্ন এলাকায়। বন্যার কারণে এসব কয়লাখনির নিচের স্তরগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন করা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ল। সবার কাছেই তাই এ সমস্যার আশু সমাধান জরুরি হয়ে পড়ল। অবশেষে, আনুমানিক ১৭০০ সালের দিকে এক নতুন, অচেনা শব্দের গুঞ্জনে ব্রিটেনের কয়লাখনিগুলো সচকিত হয়ে উঠল। সেই গুঞ্জন- একসময় হয়ে উঠল শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত। প্রথমে মৃদু, তারপর কয়েক দশকে ক্রমশই উচ্চগ্রামে উঠতে লাগল সেই শব্দ, ছড়িয়ে পড়ল এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত পৃথিবীকে সে তার বিপুল শব্দের চিৎকারে ভরিয়ে তুলল। এই শব্দ ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিনের।
বাষ্পীয় ইঞ্জিনের অনেক রকমফের থাকলেও তাদের সবারই মূলনীতি এক। আপনি কয়লা বা কাঠের মত কোন একটি জ্বালানী পোড়াবেন, তা দিয়ে পানি ফুটানো হবে আর তার ফলে তৈরি হবে বাষ্প। বাষ্প যখন গরম হয়ে প্রসারিত হবে তখন এটি পিস্টনকে ঠেলে দেবে। পিস্টনের নড়াচড়ার ফলে এর সাথে সংযুক্ত কোন জিনিসও নড়াচড়া করতে শুরু করবে। ব্যাস, তাপশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল! অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনের কয়লাখনিতে পিস্টনগুলো একটি পানি সেচ করার পাম্পের সাথে যুক্ত থাকত যেগুলো খনির তলদেশ থেকে পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হতো। প্রথম দিককার ইঞ্জিনগুলোতে অনেক বেশি জ্বালানির অপচয় হতো। একগাদা কয়লা পুড়িয়ে নামমাত্র পানি নিষ্কাশন করা যেত। কিন্তু, এর ফলেই কয়লাখনির কয়লা উত্তোলন হয়ে যেত অনেক সহজ আর পোড়ানোর জন্য কয়লারও অভাব থাকত না। সুতরাং, সেসব অপচয় নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাতো না।
পরবর্তী দশকগুলোতে ব্রিটিশ উদ্যোক্তাগণ বাষ্পীয় ইঞ্জিনের দক্ষতা অনেকখানি বাড়িয়ে তুললেন এবং কয়লাখনির গণ্ডি থেকে তুলে এনে তা দিয়ে শুরু করলেন সুতা তৈরি আর কাপড় বোনার কাজ। আর এর ফলে আমূল পাল্টে গেল বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন পদ্ধতি এবং আগের যে কোন সময়ের চেয়ে কম খরচে এবং বেশি পরিমাণ বস্ত্র উৎপাদন সম্ভবপর হলো। চোখের নিমিষে তাবৎ পৃথিবীর উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠল ব্রিটেন। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, কয়লাখনি পেরিয়ে বস্ত্রশিল্পে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার মানুষের একটি বিশাল মানসিক সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে দিল। যদি কয়লা পুড়িয়ে তাঁত কারখানার চাকা সচল রাখা যায়, তবে তা দিয়ে গাড়ির চাকাও তো ঘোরানো যেতে পারে!
