ক্রীতদাস ব্যবসা ছাড়াও আরও উদাহরণ আছে। আগের অধ্যায়ে যে বাংলার দুর্ভিক্ষের কথা বলা হয়েছে, তার কারণটাও এমনই। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এক কোটি বাঙালির জীবনের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওদিকে ইন্দোনেশিয়ায় ভিওসির অভিযানের জন্য টাকা দিয়েছে যারা, তারাও সাংসারিক মানুষই ছিল- তাদের পরিবার ছিল, সন্তান ছিল, তারা দান-খয়রাত করত, গান শুনত, শিল্পের কদর বুঝত। অথচ জাভা, সুমাত্রা ও মালাক্কার নিপীড়িত মানুষদের জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি তাদের ছিল না। বর্তমান অর্থনীতির এই অগ্রগতির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে পৃথিবী জুড়ে অগণিত অপরাধ ও শোষণের ইতিহাস।
উনিশ শতকের পুঁজিবাদও তেমন কোনো মানবিকতার পরিচয় দেয়নি। ইউরোপজুড়ে শিল্পবিপ্লবের সময়ে ব্যাংকার আর শিল্পপতিদের পকেট ফুলেফেঁপে উঠেছে, কিন্তু লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনে এনে দিয়েছে অন্তহীন ভোগান্তি। ইউরোপের উপনিবেশগুলোর অবস্থা ছিল আরও খারাপ। ১৮৭৬ সালে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড একটা বেসরকারি মানবকল্যাণ সংস্থা তৈরি করেন। সেই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল মধ্য আফ্রিকা আবিষ্কার ও কঙ্গো নদীপথে দাস ব্যবসা প্রতিরোধ। অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল সেখানে রাস্তাঘাট, বিদ্যালয় আর হাসপাতাল বানিয়ে ওখানকার মানুষের জীবনমান উন্নত করা। ১৮৮৫ সালে ইউরোপের কিছু দেশ ঐ সংগঠনকে কঙ্গো নদীর অববাহিকায় ২৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা দান করে। আকারে সেই এলাকাটা বেলজিয়ামের প্রায় ৭৫ গুণ। তখন থেকে সেই এলাকাটাকেই আমরা কঙ্গো নামক দেশ হিসেবে জানি। তবে এত বড় একটা পরিবর্তনের আগে কেউ সেখানকার ২-৩ কোটি অধিবাসীর মতামত জানতে চায়নি একবারও।
এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই মানবকল্যাণ সংস্থাটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যার উদ্দেশ্য যথারীতি প্রবৃদ্ধি আর মুনাফা অর্জন। স্কুল আর হাসপাতাল মাথায় উঠল, কঙ্গো নদীর দুই তীর ভরে গেল খনি আর খামারে। সেসবের মালিকেরা অবশ্যই বেলজিয়ামের লোক। তারা স্থানীয় মানুষদের শোষণের কোনো কমতি রাখেনি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ওখানকার রাবার শিল্প। তখন রাবারের প্রয়োজনীয়তা হু হু করে বাড়ছে, আর কঙ্গোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল রাবার রপ্তানি। রাবারচাষীদের কাছে অনেক বেশি রাবার দাবি করা হতো। সে দাবি পূরণ করতে না পারলে এই ‘অলসতার’ জন্য তাদের দেওয়া হতো নির্মম শাস্তি। তাদের হাত কেটে ফেলা হতো। অনেক সময় পুরো একটা গ্রামের সব মানুষকে হত্যা করা হতো। ধারণা করা হয়, ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে কম করে হলেও ৬০ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে শুধু এই রাবারের জন্য, যা কিনা কঙ্গোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ)। কোনো কোনো সমীক্ষা অনুযায়ী এই সংখ্যাটা এক কোটিও হতে পারে।৪
১৯০৮ সালের পর, বিশেষ করে ১৯৪৫ এর পরে পুঁজিবাদের লোভ একটু সংযত হল, এর পেছনে অবশ্য কম্যুনিজমের অবদান কম নয়। তাই বলে সাম্য কিন্তু আসেনি। ১৫০০ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে পৃথিবীর সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু এখনও সেটা এত অসমভাবে বণ্টিত যে আফ্রিকার কৃষক আর ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকেরা আজও দিনশেষে তাদের ৫০০ বছর আগের পূর্বসূরীদের চেয়েও কম মজুরি নিয়ে ঘরে ফেরে। কৃষিবিপ্লব যেমন মানবজাতির জন্য একটা বিরাট ধোঁকা ছিল, এই অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঠিক তাই। পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে, সাথে প্রসারিত হচ্ছে অর্থনীতিও, কিন্তু তার মাঝেও অসংখ্য মানুষের জীবন চাপা পড়ে আছে অভাব ও ক্ষুধার কালো ছায়ায়।
এই অভিযোগের বিপরীতে পুঁজিবাদ দুটো যুক্তি দেখাতে পারে। প্রথমটা হল, একটা পুঁজিবাদী পৃথিবী শাসন করতে পারবে কেবল পুঁজিবাদী মানুষই। এর বিপরীত ধারা কম্যুনিজমের ব্যর্থতার পরিমাণ এত বেশি যে সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা মনে হয় কেউই করবে না। ৮৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মানুষেরা যদি কৃষিবিপ্লবের বিপক্ষে অবস্থান নিত, তা হলেও যেমন আর ফেরার পথ ছিল না, ঠিক তেমনি হাজারটা দোষ নিয়েও আজ পুঁজিবাদ টিকে থাকবে, কারণ এখানেও ফেরার পথ বন্ধ।
আর দ্বিতীয় যুক্তিটা হল, পুঁজিবাদের সুফল পেতে হলে আমাদের আরও ধৈর্য ধরতে হবে। পুঁজিবাদ যে স্বর্গের স্বপ্ন দেখায়, সেখানে পৌঁছাতে আমাদের আর একটু বাকি। হ্যাঁ, ভুল অনেক হয়েছে। কিন্তু ভুল থেকে তো শিক্ষাও হয়েছে। এভাবেই আমাদের সম্পদ আরেকটু বাড়বে, সবাই আরও বেশি সম্পদের মালিক হবে। বৈষম্যটুকু হয়তো পুরোপুরি দূর হবে না, কিন্তু তাতেও মানুষ তার চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট পাবে- এমনকি কঙ্গোর মানুষও।
আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি এখনও। কিছু কিছু বিষয়, যেমন গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুহার, খাবারের সরবরাহ- এসব দিয়ে বিচার করলে ২০১৪ সালের গড়পড়তা একজন মানুষের জীবনের মান ১৯১৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। সারা পৃথিবীতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের পরেও।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এভাবে কি অনন্তকাল চলতেই থাকবে? সম্পদ বৃদ্ধি করতে হলে কাঁচামাল ও শক্তি লাগে- কিন্তু দুটোই তো সীমিত। আজ হোক বা একশ বছর পরেই হোক, একদিন কি এ দুটোই শেষ হয়ে যাবে না? তখন কী করবে মানুষ?
———————
1 Maddison, World Economy, vol. 1, 261, 264; ‘Gross National Income Per Capita 2009, Atlas Method and PPP’, the World Bank, accessed 10 December 2010, http://siteresources.worldbank.org/DATASTATISTICS/Resources/GNIPC.pdf.
