পুঁজিবাদের নরক
নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তবাজারকে ভয় পাওয়ার আরও কারণ আছে। অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন লাভের উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে আরও শ্রমিক নিয়োগ করা যায়, আর লোভ জিনিসটা সবার জন্যই ভালো- এতে উৎপাদন আর কর্মসংস্থান দুই-ই বাড়ে।
এখন একজন শিল্পপতি যদি শ্রমিকদের বেতন কম দিয়ে আর অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে উৎপাদন বাড়াতে চায়? এক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতিই শ্রমিকদের রক্ষা করবে। শ্রমিকরা যদি অরিরিক্ত কাজ করেও কম বেতন পায়, তাহলে ভালো শ্রমিকরা আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে যাবে, প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পপতিদের কারখানায় কাজ খুঁজে নেবে। ফলে স্বেচ্ছাচারী শিল্পপতি দক্ষ শ্রমিক হারাবে। কাজেই তাকে হয় নিজের আচরণ ঠিক করতে হবে নয়তো কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে তার নিজের লোভই তাকে শ্রমিকদের সাথে ভালো আচরণ করতে বাধ্য করবে।
তত্ত্ব হিসাবে এসব শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু বাস্তব অন্যরকম। যে বাজার পুরোপুরি মুক্ত, অর্থাৎ যেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে একজন অসৎ শিল্পপতি একচেটিয়া ব্যবসা কিংবা শ্রমিকদের শোষণ করতেই পারে। কোনো একটা প্রতিষ্ঠান যদি দেশের কোনো শিল্পের সব কারখানা দখল করে নেয়, অথবা যদি সব কারখানা মালিকরা চক্রান্ত করে একসাথে শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে দেয়, তাহলে শ্রমিকদেরও আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকবে না।
শুধু তাই নয়, একজন লোভী মালিক তার শ্রমিকদের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতেও বাধ্য করতে পারে। মধ্যযুগের শেষদিকে ক্রীতদাস প্রথা কী তা খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইউরোপের লোকে জানতই না। আর আধুনিক যুগের শুরুতে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের সাথে সাথেই উঠে এসেছে আটলান্টিক সাগরের দাস ব্যবসা। এর জন্য কিন্তু কোনো স্বৈরাচারী শাসক বা বর্ণবিদ্বেষ দায়ী নয়, দায়ী অনিয়ন্ত্রিত বাজার।
আমেরিকা জয় করার পর ইউরোপীয়রা সোনা ও রূপার খনির সন্ধান পায়, আর চিনি, তামাক ও তুলার খামার তৈরি করে। এগুলো ছিল তাদের উৎপাদন ও রপ্তানির প্রধান ক্ষেত্র। চিনির কারখানাগুলো ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগে ইউরোপে চিনি ছিল এক দুর্লভ বস্তু। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রচুর দামে চিনি আমদানি করা হতো। বিভিন্ন মহার্ঘ্য খাবারে কিংবা সাপের তেলের ওষুধে ‘গোপন উপকরণ’ হিসেবেই সেটা ব্যবহার করা হতো। আমেরিকায় চিনিকল তৈরির পর থেকে ইউরোপে চিনির সরবরাহ বাড়তে থাকে। ফলে চিনির দাম দ্রুত কমতে শুরু করে আর ইউরোপের মানুষের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে থাকে। রাঁধুনিরাও নানা রকম মিষ্টি খাবার ও পানীয় তৈরি করতে শুরু করে। সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের একজন মানুষের বার্ষিক চিনির চাহিদা ছিল শূন্যের কাছাকাছি। অথচ ঊনবিংশ শতকের শুরুতে সেটা হয়ে গেল আট কেজির কাছাকাছি।
আখের চাষ ও তা থেকে চিনি তৈরি করাটা খুবই শ্রমসাধ্য কাজ। আমেরিকার ক্রান্তীয় এলাকার গরম আবহাওয়ায় ম্যালেরিয়া হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে কেউই চাইত না। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের হাতে তৈরি জিনিস জনসাধারণের হাতে কম দামে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু বাজারে চাহিদা প্রচুর। সবকিছু দেখে, লাভের আশায় আর অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য লোভী মালিকেরা চিনি উৎপাদনের কাজে ক্রীতদাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল।
ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আফ্রিকা থেকে প্রায় এক কোটি ক্রীতদাস আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের ৭০ শতাংশই কাজ করত চিনিকলে। সেখানে ক্রীতদাসদের জীবন ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। তারা বেশি দিন বাঁচতও না। আফ্রিকার ভিতর থেকে আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত যাওয়ার পথে নানা যুদ্ধবিগ্রহে মারাও পড়ত অনেকে। ইউরোপের মানুষের চায়ে চিনির যোগান দিতে আর চিনিকল মালিকদের পকেটে টাকা আনতে এভাবেই শেষ হয়ে গেছে অসংখ্য ক্রীতদাসের জীবন।
এই ক্রীতদাস ব্যবসা কিন্তু কোনো দেশ বা সরকার চালায়নি। এর কারণ সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক। চাহিদা ও যোগানের সব সূত্র মেনে মুক্তবাজারের নীতিতে এই বাণিজ্য চলেছে। দাস-ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো আমস্টারডাম, লন্ডন আর প্যারিসের স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার বিক্রি করত। ইউরোপের মধ্যবিত্তরা এসব শেয়ার কিনত। শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া টাকায় দাস ব্যবসায়ীরা জাহাজ কিনত, নাবিক ও সৈনিক জোগাড় করে যেত আফ্রিকায় আর সেখান থেকে দাস কিনে আমেরিকায় পাঠাত। আমেরিকার নানান ক্ষেতখামারে সেই দাসদের বিক্রি করে তারা কিনে নিয়ে আসত চিনি, কোকো, কফি, তামাক, তুলা ও রাম। সেসব নিয়ে ইউরোপে ফিরে ভালো দামে চিনি আর তুলা বিক্রি করে আবার চলে যেত আফ্রিকায়, আরেক দফা ব্যবসার জন্য। এই ব্যবস্থায় শেয়ারমালিকরাও খুশি। পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে বছরে প্রায় ৬ শতাংশ লাভে চলেছে এই দাস ব্যবসা। আজকের দিনেও যেকোনো বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ একে অত্যন্ত লাভজনক বলে স্বীকার করে নেবেন নির্দ্বিধায়।
এটাই হল মুক্তবাজার অর্থনীতির সমস্যা। ব্যবসায় সৎ পথে লাভ হচ্ছে কি না বা লাভের টাকা সুষমভাবে সবার মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে কি না- তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দেয় না। বরং উল্টোটাই হয়- আরও বেশি উৎপাদন ও লাভের নেশা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কোনো বাধা-বিপত্তি সে আর মানতে চায় না। অগ্রগতির পথ থেকে যখন নৈতিক বাধাটুকু সরে যায়, তখন বিপর্যয় ঘটতে আর দেরি হয় না। কোনো কোনো ধর্ম, যেমন খ্রিস্টধর্ম বা নাৎসিবাদ কেবল ঘৃণার কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। আর পুঁজিবাদ লাখ লাখ মানুষ মেরেছে লোভ আর নির্লিপ্ততা দিয়ে। আটলান্টিকের দাস ব্যবসার পিছনে কোনো বর্ণবিদ্বেষ নেই। যেসব মানুষ এই ব্যবসার শেয়ার কিনেছে, যারা বিক্রি করেছে, আর যারা এই ব্যবসা চালিয়েছে- আফ্রিকার মানুষদের নিয়ে তাদের কেউ কখনও ভাবেইনি। ভাবেনি চিনিকলের মালিকরাও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কারখানা থেকে দূরে থাকত, সেখান থেকে লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখেই তারা খুশি।
