পুঁজিপতিদের স্বার্থে সংঘটিত যুদ্ধের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। আসলে এখানে যুদ্ধও আফিমের মতোই একটি পণ্য। ১৮২১ সালে গ্রিকরা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ব্রিটেনের রোমান্টিক ও স্বাধীনচেতা মানুষদের কাছ থেকে এই বিপ্লব প্রচুর সমর্থন পায়। ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রন তো নিজেই গ্রিসে চলে গিয়েছিলেন লড়াইয়ে যোগ দিতে। পুঁজিপতিরাও এখানে একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। তারা বিদ্রোহী নেতাদের অনুরোধ করে লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জে নিজেদের বন্ড চালু করতে। শর্ত ছিল গ্রিকরা স্বাধীন হলে এসব বন্ডের দাম সুদসহ শোধ করবে। বিনিয়োগকারীরা লাভের আশায় অথবা গ্রিকদের সমর্থন দিতে এসব বন্ড কিনত। এসব বন্ডের দাম আবার যুদ্ধে গ্রিকদের অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে উঠত-নামত। শেষে তুর্কিরা যখন যুদ্ধে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেল, তখন বন্ডমালিকদের চোয়াল ঝুলে পড়তে লাগল। যেহেতু ব্যবসায়ীদের স্বার্থই ব্রিটিশদের জাতীয় স্বার্থ, কাজেই ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের একটি নৌবহর নাভারিনোর যুদ্ধে (Battle of Navarino) অটোমানদের একটা নৌবহর ডুবিয়ে দিল। অনেক শতাব্দী ধরে পরাধীন থাকার পর অবশেষে গ্রিস স্বাধীন হল। কিন্তু স্বাধীনতার সাথে সাথে তার মাথায় এমনই এক বিরাট ঋণের বোঝা চাপল যে সেটা শোধ করার আর কোনো উপায় রইল না। এরপর দশকের পর দশক ধরে গ্রিসের অর্থনীতি ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের হাতে জিম্মি হয়ে রইল।
পুঁজিবাদ আর রাজনীতির এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে পুঁজিবাজারে। কোথাও নতুন তেলের খনি পাওয়া গেছে, অথবা কেউ নতুন কোনো যন্ত্র আবিষ্কার করেছে- এ ধরণের অর্থনৈতিক প্রভাবক যেমন আছে, তেমনি কোথাও সরকার পরিবর্তন হচ্ছে কিংবা কোনো দেশ নতুন বৈদেশিক নীতি তৈরি করছে- এ ধরনের রাজনৈতিক বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নাভারিনোর যুদ্ধের পর অনেক ব্রিটিশ পুঁজিপতিই বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। কারণ তারা এখন জানে, কেউ যদি টাকা ধার নিয়ে ঠিকমতো শোধ না করে, তবে তাকে শায়েস্তা করার জন্য রাণীর সৈন্যবাহিনী তো আছেই!
এই জন্যই আজকের দিনে একটা দেশের সম্পদের পরিমাণের চেয়ে তার ক্রেডিট রেটিং অর্থনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেডিট রেটিং হল টাকা ধার নিলে সেটা শোধ করার সম্ভাবনার পরিমাপ। কোনো দেশের ক্রেডিট রেটিং নির্ধারণ করার জন্য বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি সে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি সাংস্কৃতিক অবস্থাও আমলে নেওয়া হয়। একটা দেশে যদি স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় থাকে, সবসময় যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকে আর বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে দেশ তেলের উপরে ভাসলেও তার ক্রেডিট রেটিং কম হবে। এর ফলে সে দেশ ঐ তেল ব্যবহার করে পুঁজি তৈরি করতে পারবে না, সেটা দরিদ্র দেশ হয়েই থাকবে। অন্যদিকে যে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ নেই কিন্তু শান্তি আছে, সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা আর উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা (যেখানে সরকারের ক্ষমতা আইন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকে) আছে, সে দেশের ক্রেডিট রেটিং বেশি হবে। ক্রেডিট রেটিং বেশি হওয়ার কারণে সেখানে বেশি বিনিয়োগ হবে, ফলে সহজে আরও বেশি পুঁজি তৈরি হবে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে শিক্ষা ও শিল্পের উন্নতিও বেশি হবে।
মুক্তবাজারের ভূত
পুঁজিবাদ আর রাজনীতি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এই দুটোর সম্পর্ক নিয়ে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ আর আমজনতা- কারও মধ্যেই বিতর্কের শেষ নেই। ঘোর পুঁজিবাদীরা বলেন পুঁজিবাদ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতেই পারে, তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু রাজনীতি যেন পুঁজিবাজারে প্রভাব না ফেলে। কারণ সরকার যখন বাজারে হস্তক্ষেপ করে, তখন রাজনৈতিক প্রভাবে মানুষ বিনিয়োগে ভুল করে আর তাতে অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যাহত হয়। ধরুন সরকার ভোট বাড়ানোর জন্য শিল্পপতিদের উপর বেশি কর চাপিয়ে দিয়ে বেকারদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিল। তাতে পুঁজিপতিরা নাখোশ হবে। কারণ তাদের মতে, শিল্পপতিদের যদি কর একটু কম দিতে হয় তাহলে তারা আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, ফলে আরও বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
এদিক থেকে দেখলে সর্বোত্তম অর্থনৈতিক কাঠামোতে রাজনীতিকে অর্থনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত, কর কমিয়ে দেওয়া উচিত, সরকারের নিয়ন্ত্রণ যথাসম্ভব কমানো উচিত আর বাজারকে নিজ গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত না হয়ে সর্বোচ্চ লাভের খাতে তাদের টাকা বিনিয়োগ করবে। ফলে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। তাতে মালিক ও শ্রমিক সবারই সুবিধা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ যত কম হয় তত ভালো। এই মুক্তবাজার নীতিই আজকের দিনে পুঁজিবাদের সবচেয়ে চেনা রূপ। মুক্তবাজার সমর্থকরা দেশের বাইরে সামরিক অভিযান আর দেশের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড- এ দুটোকেই একই রকম অপছন্দ করে। সরকারের প্রতি তাদের পরামর্শ অনেকটা বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের মতোই- “কিচ্ছু করার দরকার নেই, সব যেভাবে চলছে চলতে দাও”।
তবে একটু তলিয়ে দেখলে মুক্তবাজারে বিশ্বাস করা অনেকটা সান্তা ক্লজে বিশ্বাস করার মতোই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। আসলে কোনো বাজারের পক্ষেই রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। আজকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হল ভবিষ্যতের উপর মানুষের আস্থা। এই সম্পদও কিন্তু চুরি কিংবা জালিয়াতির ঊর্ধ্বে নয়। বাজার কখনও জালিয়াতি, চুরি বা সন্ত্রাসের হাত থেকে সম্পদ বাঁচানোর দায়িত্ব নেয় না। সেটা কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামোর কাজের মধ্যেই পড়ে। সম্পদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করাটা সরকারেরই দায়িত্ব। সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, এর ফলে পুঁজি আর বিনিয়োগ কমে যায় আর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। ১৭১৯ সালের মিসিসিপি বাবল থেকে পাওয়া মূল শিক্ষা কিন্তু এটাই। এই শিক্ষা যে নিতে পারেনি তার জন্য আছে ২০০৭ সালের যুক্তরাষ্ট্রের হাউজিং বাবল (US housing bubble)।
