এই মিসিসিপি বাবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসগুলোর মধ্যে একটা। ফ্রান্স এই সঙ্কট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি আর কখনোই। মিসিসিপি কোম্পানি শেয়ারের দাম বাড়ানো আর মানুষের মধ্যে শেয়ার কেনার উন্মাদনা সৃষ্টি করতে যেভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছিল তাতে দেশের মানুষ ফরাসি ব্যাংক ব্যবস্থা আর রাজার অর্থনৈতিক জ্ঞানের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ফলে পঞ্চদশ লুইয়ের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশদের কাছে ফরাসিদের পিছিয়ে পড়ার কারণ এটাই। ব্রিটিশরা খুব সহজে আর অল্প সুদে টাকা ধার নিতে পারত। ওদিকে ফ্রান্সে ঋণ নেওয়া আরও কঠিন হয়ে গেল, আর সুদের হারও বেড়ে গেল। সারা দেশের টাকার সঙ্কট ঠেকাতে ফ্রান্সের রাজাকে চড়া সুদে অনেক টাকা ধার নিতে হল। ১৭৮০ সালে নতুন রাজা ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসেই দেখলেন দেশের বাজেটের অর্ধেক টাকা চলে যাচ্ছে শুধু ধার নেওয়া টাকার সুদ দিতে। রাজকোষ দেউলিয়া হতে বেশি বাকি নেই। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই ১৭৮৯ সালে রাজা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেড়শ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আইনসভার সম্মেলন ডাকলেন। ফরাসি বিপ্লবের শুরুটা সেখান থেকেই হয়।
এভাবেই পৃথিবীতে যখন ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন হচ্ছে, ঠিক তখনই দুর্বার গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। ডাচ সাম্রাজ্যের মতোই তাদের সাম্রাজ্যও তৈরি হয়েছে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন যৌথ-মূলধনী কোম্পানির হাতে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর আমেরিকায় তাদের প্রথম উপনিবেশ তৈরি করেছিল লন্ডন কোম্পানি, প্লিমাউথ কোম্পানি, ডরচেস্টার কোম্পানি আর ম্যাসাচুসেটস কোম্পানির মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
ব্রিটিশ রাজ্য কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করেনি, করেছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী। তাদের সাফল্য ভিওসির চেয়েও বেশি। লন্ডনের লিডেনহল স্ট্রিটের প্রধান কার্যালয় থেকে তারা একশ বছর ধরে এই বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করেছে। ভারতে তাদের সেনাবাহিনীতে সাড়ে তিন লাখ সৈন্য ছিল, এত সৈন্য খোদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরও ছিল না। ১৮৫৮ সালে কোম্পানির সৈন্যসমেত এই বিপুল ভূখণ্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন হয়। নেপোলিয়ন ব্রিটিশদের ‘দোকানদারের জাত’ বলে ঠাট্টা করতেন। অথচ এই দোকানদারের জাত নেপোলিয়নকে তো পরাজিত করেছেই, আর পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের মালিকও ছিল কিন্তু এই ব্রিটিশরাই।
পুঁজির নামে
এই যে ইন্দোনেশিয়ার ডাচ সাম্রাজ্যের বা ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া- এখানেই কিন্তু শেষ নয়, বরং এর পর থেকে সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদের সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হয়েছে। উনিশ শতকে দেখা গেল, যৌথ-মূলধনী কোম্পানিগুলোর আর দেশ দখল করে শাসন করার দরকার নেই, বরং কোম্পানির ম্যানেজার আর শেয়ারমালিকরাই লন্ডন, আমস্টারডাম আর প্যারিসে বসে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছে। আর সাম্রাজ্যই তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করছে। এজন্যই মার্ক্সের মতো লোকেরা বলে গেছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার আস্তে আস্তে একটা পুঁজিবাদী ট্রেড ইউনিয়ন হয়ে যাচ্ছে।
সরকার কীভাবে টাকার পিছনে ছোটে তার সবচেয়ে বিশ্রী উদাহরণ হল ১৮৪০ থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে হওয়া ব্রিটেন ও চীনের প্রথম আফিমের যুদ্ধ। উনিশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছাড়াও অনেক ব্রিটিশ লোক চীনে আফিমসহ বিভিন্ন রকম মাদক পাচার করে প্রচুর টাকা কামিয়েছিল। এতে চীনের লাখ লাখ লোক আফিমে আসক্ত হয়ে গোটা দেশটাকেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ১৮৩০ এর দশকের শেষে চীনের সরকার আইন করে মাদক পাচার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ব্রিটিশরা সে আইন না মেনে তাদের কাজ চালিয়ে যায়। তখন চীনা কর্তৃপক্ষ এসব মাদকের চালান বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে ফেলতে শুরু করে। মাদক ব্যবসায়ীদের আবার ব্রিটেনের মন্ত্রী আর সংসদ সদস্যদের সাথে ভালো জানাশোনা ছিল। তাদের অনেকে আবার নিজেরাও এসব ব্যবসায়ীদের মাদক মজুদ করে রাখতেন, কাজেই তারা সহজেই এই ব্যাপারে সরকারি হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা করে ফেললেন।
১৮৪০ সালে ব্রিটেন ‘মুক্ত বাণিজ্যের’ নামে চীনের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধটা ছিল পুরোপুরি একতরফা। অতি-আত্মবিশ্বাসী চীনা সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের রণতরী, ভারী কামান, রকেট আর রাইফেলের সামনে দাঁড়াতেই পারল না। শেষে তারা ব্রিটিশ মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় বাধা দেবে না আর চীনা পুলিশের হাতে নষ্ট হওয়া মালামালের ক্ষতিপূরণ দেবে- এই শর্তে শান্তিচুক্তি করে। শুধু তাই না, ব্রিটিশরা এরপর হংকং-এও মাদক ব্যবসার সুযোগ দাবি করে এবং তা আদায়ও করে। এই হংকং মাদক চোরাচালানের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হংকং ব্রিটিশদের হাতে ছিল। উনিশ শতকের শেষদিকে চীনের প্রায় চার কোটি মানুষ (মোট জনশংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ) আফিমে আসক্ত ছিল।৩
মিশরও এই ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে সমীহ করে চলেছে। উনিশ শতকে ফরাসি ও ব্রিটিশ বিয়োগকারীরা মিশরের শাসকদের অনেক বড় অঙ্কের টাকা ঋণ দিতেন- প্রথমত সুয়েজ খাল খননের খরচ যোগাতে, আর এর পরে সেখানে অল্প লাভজনক শিল্পের প্রসারের জন্য। এতে মিশরের ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেল। কাজেই ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা মিশরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করল। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে ১৮৮১ সালে মিশরের জাতীয়তাবাদী মানুষ প্রতিবাদ শুরু করে। তারা সবরকম বৈদেশিক ঋণ বাতিলের ঘোষণা দেয়। রাণী ভিক্টোরিয়া অবশ্য এতে খুশি হতে পারেননি। বছর খানেক পরেই তিনি মিশরে স্থল ও নৌসেনা মোতায়েন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত মিশর ব্রিটিশদের দখলেই ছিল।
