ভিওসির সৈন্যরা একটার পর একটা দ্বীপ দখল করতে করতে ইন্দোনেশিয়ার একটা বড় অংশকেই নিজেদের উপনিবেশ বানিয়ে ফেলে। প্রায় দুইশ বছর ধরে তারা ইন্দোনেশিয়া শাসন করেছে। ১৮০০ সালে ডাচরা ইন্দোনেশিয়া দখল করে পরের দেড়শ বছর ধরে শাসন করে। এই একবিংশ শতাব্দীতে কর্পোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠছে- এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনি। অথচ স্বার্থের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে কতদূর যেতে পারে তার নমুনা এর আগের শতাব্দীগুলোতে খুব ভালোভাবেই দেখা গেছে।
ভিওসি যখন ভারত মহাসাগরে তাদের ‘বাণিজ্য’ চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে আটলান্টিকে একই কাজ করছিল ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোম্পানি বা ডব্লিউআইসি। হাডসন নদীতে নিজেদের দখল ধরে রাখার জন্য তারা ঐ নদীর মুখেই একটা দ্বীপে ‘নিউ আমস্টারডাম’ নামের উপনিবেশ তৈরি করে। ইন্ডিয়ানরা মাঝেমধ্যেই সেখানে আক্রমণ করত। আর ব্রিটিশদের আক্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশরা জায়গাটা দখল করে নিয়ে তার নাম দেয় ‘নিউ ইয়র্ক’। আক্রমণ ঠেকাতে ডব্লিউআইসির লোকেরা যে দেয়াল তুলেছিল, আজ তার উপর দিয়ে তৈরি রাস্তাকে সবাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ নামে চেনে।
নিজেদের আধিপত্যের আত্মপ্রসাদে আর এইসব যুদ্ধ চালাতে গিয়েই একসময় ডাচরা নিউ ইয়র্কের দখল হারায়, হারায় ইউরোপের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের জায়গাটাও। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার প্রতিযোগিতায় নামে ফ্রান্স আর ব্রিটেন। শুরুতে ফ্রান্সই এগিয়ে ছিল। ফ্রান্স দেশটা আকারে ব্রিটেনের চেয়ে বড়, তার মানুষ আর সম্পদও ছিল বেশি। সেনাবাহিনীও ছিল দক্ষ। তারপরেও ইউরোপের অর্থনীতিতে ফ্রান্সের চেয়ে ব্রিটেনই এগিয়ে ছিল। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় যে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয় সেটা মিসিসিপি বাবল (Mississippi Bubble) নামে পরিচিত। সেই সময়ে ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। আর তখনই ব্রিটেনের অর্থনীতি মানুষের আস্থা অর্জন করে। ঠিক তখনই একটা যৌথ মূলধনী কোম্পানির হাতে তৈরি হচ্ছে একটা সাম্রাজ্য।
১৭১৭ সালে ফ্রান্সের মিসিসিপি কোম্পানি মিসিসিপির অববাহিকায় উপনিবেশ তৈরির জন্য যাত্রা করে। নিউ অর্লিয়ন্স শহরটা সে সময়েই তৈরি হয়। এই বিরাট পরিকল্পনা সফল করতে প্রচুর টাকা দরকার। ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের দরবারে মিসিসিপি কোম্পানির ভালো জানাশোনা ছিল। তারা তখন প্যারিস স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে। কোম্পানির পরিচালক জন ল ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। রাজা তাঁকে অর্থায়ন-নিয়ন্ত্রকের পদও দেন (যেটা আজকের দিনের অর্থমন্ত্রীর পদের সমতুল্য)। ১৭১৭ সালে মিসিসিপির আশেপাশে কুমির ভরা জলা জায়গা ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিন্তু তা নিয়ে মিসিসিপি কোম্পানি মানুষকে অঢেল সম্পদ-সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে ফ্রান্সের ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি আর অভিজাতরা প্রচুর বিনিয়োগ করে। মিসিসিপি কোম্পানির শেয়ারের দাম অনেক বেড়ে যায়। শুরুতে এক একটা শেয়ারের দাম ছিল ৫০০ লিভ্রা (পাউন্ড)। ১৭১৯ এর অগাস্টের ১ তারিখে এর দাম ছিল ২৭৫০ লিভ্রা, আর ৩০ তারিখে সেটাই হয়ে গেল ৪১০০ লিভ্রা। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে এর দাম ৫০০০ আর ডিসেম্বরের ২ তারিখে ১০০০০ ছাড়িয়ে গেল। সারা প্যারিসে সাড়া পড়ে গেল। মানুষেরা তাদের সবকিছু বিক্রি করে না হয় ধার নিয়ে ছুটল মিসিসিপির শেয়ার কিনতে। রাতারাতি ধনী হওয়ার নেশায় পেল সবাইকে।

কিছুদিনের মধ্যেই নেশা কেটে গিয়ে এল আতঙ্ক। অনেকেই টের পেল, শেয়ারের এই উচ্চমূল্য আসলে অস্থায়ী আর অবাস্তব। তারা বুঝতে পারল দাম বেশি থাকতে থাকতেই শেয়ার বেচে দেওয়া উচিত। সবাই শেয়ার বিক্রি শুরু করতেই বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়ার কারণে দাম কমে গেল। দাম পড়ে যেতে দেখে বাকিরাও যার যার শেয়ার তাড়াতাড়ি বেচে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কাজেই শেয়ারের দামে ধস নামে। শেয়ারের দাম স্থিতিশীল করতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- বলা বাহুল্য, গভর্নর জন লয়ের নির্দেশে- মিসিসিপির শেয়ার কিনে নিতে থাকে। কিন্তু সব শেয়ার তো আর কিনে ফেলা সম্ভব নয়, ব্যাংকের টাকাও তো ফুরিয়ে যাবে। এই অবস্থায় দেশের অর্থায়ন-নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ সেই জন ল, বাকি শেয়ার কেনার জন্য নতুন টাকা ছাপানোর নির্দেশ দিলেন। এর ফলে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা হয়ে গেল একটা বুদবুদের মতো। সবাই মিলে আগেপিছে না ভেবে ফুঁ দিয়ে (টাকা ঢেলে) সেটাকে ফুলিয়ে তুলেছে, কিন্তু ফুলতে ফুলতে বুদবুদটা যখন ফেটেই গেল, তখন সবাই নিঃস্ব, কারও আর কিছু করার নেই। নতুন টাকা ছেপেও শেষরক্ষা হল না। মিসিসিপি শেয়ারের দাম ১০০০০ থেকে ১০০০ হয়ে গেল, তারপর আরও কমতে কমতে একেবারে শূন্যে এসে ঠেকল। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর রাষ্ট্রীয় কোষাগার ভরা কেবল মিসিসিপির শেয়ারে, একটা টাকাও নেই। বড় বড় ব্যবসায়ীদের গায়ে আঁচড়ও লাগল না, তারা পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তাদের শেয়ার বেচে দিয়েছে আগেই। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সর্বনাশ হয়ে গেল। অনেকে আত্মহত্যাও করেছিল তখন।