এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে স্পেনের রাজা আবারও ছোট ছেলের কাছে একই অঙ্কের টাকা দাবি করে বসলেন। তার কাছে তখন একটা টাকাও নেই। উপায় নেই, তাই সে অনেক বুঝিয়ে টাকা চেয়ে বাবাকে একটা চিঠি দিল। হাজার হলেও ছোট ছেলের আবদার, বাবাও ফেলতে পারলেন না। কাজেই আরও দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা স্পেনের রাজকোষের ভিতরে কোথায় যে হারিয়ে গেল, তার হদিস আর পাওয়া গেল না। ওদিকে আমস্টারডামের অবস্থা পুরো উলটো। বড় ছেলে সেখানে একের পর এক ব্যবসায়ীদের টাকা ধার দিচ্ছে আর সময়মতো ফেরতও পাচ্ছে পুরোপুরি। তবে সুসময় তো আর চিরদিন থাকে না, তাই একবার ঘটল অঘটন। এক ফরাসি ব্যবসায়ী ভাবল কাঠের জুতো সামনে খুব চলবে, তাই সে বড় ছেলের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে প্যারিসে একটা জুতোর দোকান দিল। কিন্তু কপাল খারাপ, তার দোকানের জুতো বিক্রিই হল না। কাজেই সে জানিয়ে দিল তার পক্ষে ধার শোধ করা সম্ভব নয়।
সব শুনে বাবা এবার ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। দুই ছেলেকেই পরামর্শ দিলেন আইনের আশ্রয় নিতে। তারপর ছোট ছেলে মাদ্রিদে মামলা করল স্পেনের রাজার বিরুদ্ধে, আর বড় ছেলে আমস্টারডামে মামলা করল প্যারিসের জুতোওয়ালার বিরুদ্ধে। স্পেনের আদালত আবার রাজার কথায়ই ওঠে-বসে। কিন্তু নেদারল্যান্ডের আদালত দেশের সরকারেরই আলাদা শাখা, সেখানে রাজপরিবারের জন্য কোনও বাড়তি খাতির নেই। কাজেই ছোট ছেলের মামলা মাদ্রিদের আদালতে পাত্তাই পেল না, ওদিকে আমস্টারডামের আদালত ধার শোধ করার জন্য জুতোওয়ালার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ফেলল। সবকিছু দেখে ছেলেদের বাবাও বুঝলেন, ব্যবসা করতে হলে সেটা ব্যবসায়ীদের সাথেই করা উচিত, রাজাদের সাথে নয়। আর করলেও সেটা মাদ্রিদের চেয়ে আমস্টারডামে করাটাই সঙ্গত।
ছোট ছেলের বিপদ শুধু বাড়ছেই। স্পেনের রাজার আরও টাকা দরকার, আর কোথায় টাকা পাওয়া যাবে সেটাও এতদিনে বুঝে ফেলেছেন। এবার তিনি গুপ্তচরবৃত্তির সাজানো অভিযোগ চাপিয়ে দিলেন ছোট ছেলের উপর, সাথে এটাও জানিয়ে দিলেন যে খুব তাড়াতাড়ি বিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এনে দিতে না পারলে বাকি জীবনটা তাকে কারাগারেই কাটাতে হবে।
বাবারও শিক্ষা হয়ে গেছে। তিনি টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনলেন, আর প্রতিজ্ঞা করলেন, স্পেনে আর না। এরপর তিনি মাদ্রিদের ব্যবসা গুটিয়ে ছোট ছেলেকে পাঠালেন রটারডামে। হল্যান্ডেই দুই জায়গায় ব্যবসা করার বুদ্ধিটা খারাপ না। শোনা যাচ্ছে স্পেনের ব্যবসায়ীরাও নাকি তাদের টাকা স্পেনের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। তারাও বুঝে গেছে কোথায় ব্যবসা করা লাভজনক আর নিরাপদ।
এভাবেই একসময় স্পেনের রাজা বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারালেন, আর ডাচ ব্যবসায়ীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। ডাচদের সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়েছে এই ব্যবসায়ীরাই। স্পেনের রাজা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে অন্যায্যভাবে খাজনা আদায় করে প্রজাদের বিরাগভাজন হচ্ছেন, তখন ডাচ ব্যবসায়ীরা টাকা ধার নিয়ে আর ব্যবসার লভ্যাংশ বিক্রি করে সাম্রাজ্যবিস্তারে সাহায্য করছে। স্পেনের সরকারকে টাকা দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, যেসব সতর্ক ব্যবসায়ী ডাচ সরকারকে টাকা দেওয়ার আগেও দুবার ভাবত, তারাও ডাচ ব্যবসায়ীদের টাকা দিয়েছে নির্দ্বিধায়।
যৌথ মূলধনী ব্যবসার শুরু তখন থেকেই। কোনো কোম্পানির সামনে বেশি লাভ করার সুযোগ দেখা গেলে মানুষ সেই কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে, একটু বেশি দামে হলেও। আবার কোম্পানির লোকসানের সম্ভাবনা দেখা গেলে কম দামে শেয়ার বিক্রিও করে দেয়। এই শেয়ার কেনাবেচার সুবিধার্থে ইউরোপের বেশিরভাগ বড় শহরে স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সবচেয়ে বিখ্যাত ডাচ যৌথ-মূলধনী কোম্পানি Vereenigde Oostindische Compagnie, সংক্ষেপে ভিওসি (VOC) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০২ সালে, ঠিক যখন ডাচরা একটু একটু করে স্প্যানিশ শাসন থেকে বেরিয়ে আসছে। ভিওসি শেয়ার বিক্রির টাকায় জাহাজ বানিয়ে এশিয়ায় পাঠাত আর চীন, ভারত আর ইন্দোনেশিয়া থেকে মালামাল আনত। প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি বা জলদস্যুদের মোকাবেলা করার জন্যও তারা টাকা দিত। এমনকি ইন্দোনেশিয়া জয় করার অভিযানের খরচও দিয়েছে এই কোম্পানি।
ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপপুঞ্জ। এর হাজার হাজার দ্বীপ সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই শতশত রাজা, সুলতান আর দলের শাসন দেখে এসেছে। ১৬০৩ সালে যখন ভিওসির ব্যবসায়ীরা প্রথমবার ওখানে যায়, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই ব্যবসা। কিন্তু দিনে দিনে ব্যবসা ও ব্যবসার অংশীদারদের স্বার্থেই তাদের নানারকম সংঘাতে জড়াতে হয়েছে। স্থানীয় ক্ষমতাবানদের বাড়তি কর আদায়ের বিরুদ্ধে কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নানাভাবে লড়তে হয়েছে ভিওসিকে। এসব বিরোধের জন্যই একদিন ভিওসির বাণিজ্যিক জাহাজে দেখা গেল কামান। তারা ইউরোপ, জাপান, ভারত আর ইন্দোনেশিয়া থেকে সৈনিক জোগাড় করল, নানা জায়গায় দুর্গ বানাল, এমনকি রীতিমতো সামনাসামনি যুদ্ধও করতে শুরু করল। একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ড দেখে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সে সময়ে বেসরকারি কোম্পানির যুদ্ধের আয়োজন করাটা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। একটা বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান একটা আস্ত সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলছে- এটা সারা পৃথিবীতেই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
