তারপরেও, এসব অভিযানে অনেক রকম ঝুঁকিও ছিল, তাই বিনিয়োগও অনেকটা সীমিত ছিল। এরকম অনেক অভিযান খালি হাতে ফিরে এসেছে। ইংরেজরা উত্তর-পশ্চিম দিকে মেরু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এশিয়ায় যাওয়ার পথ খুঁজতে অনেক টাকা নষ্ট করেছে। এর মধ্যে অনেক অভিযান আর ফেরেইনি। হিমশৈলের ধাক্কায়, সামুদ্রিক ঝড়ে অথবা জলদস্যুদের হাতে অনেক জাহাজ হারিয়েছে তারা। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়াতে আর ঝুঁকির পরিমাণ কমাতে তখন ইউরোপীয়রা যৌথ-মূলধনী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (limited liability joint-stock company) তৈরি করে। এর পরের অভিযানগুলোতে একজন মানুষের পরিবর্তে এরকম প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করতে শুরু করে। তাতে অনেকজন মানুষ মিলে টাকা দেয়, তাই জনপ্রতি ঝুঁকির পরিমাণ অনেক কমে যায়। তবে ঝুঁকি সীমিত হলেও লাভ কিন্তু সীমিত নয়। অনেক সময় সামান্য বিনিয়োগে শুরু হওয়া অভিযান থেকেই আসত লক্ষ লক্ষ টাকা।
এভাবে কয়েক দশকের মধ্যেই পশ্চিম ইউরোপে বেশ মজবুত একটা অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই বিনিয়োগের জন্য অনেক টাকা জোগাড় করার ব্যবস্থা হলো। সেই টাকা সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যেত। অভিযান পরিচালনার জন্য রাজ্যের চেয়ে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি সফলতার পরিচয় দিয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ষোড়শ শতকে স্পেন আর নেদারল্যান্ডের রেষারেষির মধ্যে। স্পেন তখন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ, তার এলাকাও বিশাল। ইউরোপের অনেকখানি, উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার বিরাট এলাকা, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ আর এশিয়া ও আফ্রিকার উপকূলের অনেক জায়গা স্পেনের দখলে। প্রতি বছর আমেরিকা আর এশিয়ার প্রচুর সম্পদ নিয়ে সেভিয়া (Seville) আর কাদিজ (Cadiz) বন্দরে ফিরত স্প্যানিশ নৌবহর। নেদারল্যান্ড তখন স্পেনের এক কোনায় পড়ে থাকা একটা সম্পদহীন ছোট জলা এলাকা।
ডাচদের বেশিরভাগই ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট। ১৫৬৮ সালে তারা স্প্যানিশ ক্যাথলিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। ডন কুইক্সোট (Don Quixote) যেমন উইন্ডমিলের সাথে লড়তে গেছিলেন, শুরুতে ডাচ বিদ্রোহীদের অবস্থা ছিল ঠিক তেমনি। অথচ আশি বছরের মধ্যে তারা স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা তো আদায় করেছেই, তার উপর সমুদ্রে স্প্যানিশ ও তাদের মিত্র পর্তুগিজদের চেয়েও বেশি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। নিজেদের একটা সাম্রাজ্য তৈরি করে তারা ইউরোপের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে পরিণত হয়।
ডাচদের এই সাফল্যের মূলে আছে সেই ক্রেডিট। ডাচদের মধ্যে যারা সাধারণ নাগরিক, যুদ্ধে যাদের কোনো আগ্রহই নেই, তারাই স্প্যানিশদের সাথে লড়াই করার জন্য ভাড়াটে সৈনিক জোগাড় করল। ওদিকে সমুদ্রেও তারা নামিয়ে দিল বড় বড় সব যুদ্ধজাহাজ। ভাড়াটে সৈন্য আর যুদ্ধজাহাজের পিছনে অনেক টাকা খরচ হল, কিন্তু সেটা জোগাড় করতে তাদের কোনো সমস্যাই হয়নি। কারণ সে সময়ে স্পেনের রাজার চেয়ে দেশের অর্থব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা বেশি ছিল। বিনিয়োগকারীরা ডাচদের সৈন্য সংগ্রহ ও জাহাজ তৈরিতে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। ডাচদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাণিজ্যপথগুলো থেকে লাভ হচ্ছিল ভালোই। সেই লাভের টাকা দিয়ে ডাচরা তাদের ঋণ শোধ করে দিল, ফলে বিনিয়োগকারীরাও আরও বিনিয়োগ করার ভরসা পেল। আমস্টারডাম ইউরোপের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর তো বটেই, তার সাথে ইউরোপের অর্থনৈতিক কেন্দ্রেও পরিণত হল।
এখন প্রশ্ন হল, ডাচরা কীভাবে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আস্থা অর্জন করল? প্রথমত, তারা সময়মতো সম্পূর্ণ ঋণ শোধ করতে কখনও ভুল করত না। তাই বিনিয়োগকারীরাও আরও টাকা দিতে দ্বিধা করত না। দ্বিতীয় কারণ হল, সে দেশের বিচারব্যবস্থা ছিল স্বাধীন, আর সেটা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তাও দিত। এই নিশ্চয়তা না থাকলে ব্যবসা করতে গিয়ে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই দেশের আইনও বিনিয়োগের জন্য সহায়ক ছিল।
ধরুন জার্মানির এক বিরাট পুঁজিপতি ব্যবসায়ীর দুই ছেলে। তিনি ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাঁর ব্যবসার শাখা খোলার একটা দারুণ সম্ভাবনা দেখলেন। তিনি তাঁর দুই ছেলেকেই মূলধন হিসেবে দশ হাজারটা করে সোনার মোহর দিয়ে বড় ছেলেকে পাঠালেন আমস্টারডামে, আর ছোটটিকে পাঠিয়ে দিলেন মাদ্রিদে। সে সময়ে স্পেনের সাথে ফ্রান্সের যুদ্ধ চলছে, ছোট ছেলে গিয়েই স্পেনের রাজাকে সৈন্য জোগাড় করার জন্য তার সব টাকা ধার দিয়ে দিল। আর বড় ছেলে তার টাকাগুলো ধার দিল এক ডাচ ব্যবসায়ীকে। সেই ব্যবসায়ী ম্যানহাটন নামের একটা ঝোপেঝাড়ে ঢাকা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে কিছু জমি কিনতে চান, কারণ হাডসন নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হলেই ওই দ্বীপে জমির দাম হুহু করে বেড়ে যাবে। দুই ভাইই আশা করছে এক বছরের মধ্যে ধার দেওয়া টাকা ফেরত পাবে।
বছর গেল। ডাচ ব্যবসায়ী তাঁর কেনা জমি বেচে দিয়ে প্রচুর লাভ করলেন। কথামতো ধারও শোধ করলেন, সুদসহ। বড় ছেলের সাফল্যে বাবাও খুশি হলেন। এদিকে ছোট ছেলে পড়ল বিপদে। ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে স্পেনের রাজা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই আছেন, কিন্তু এর মধ্যে তিনি আবার নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়েছেন তুর্কিদের সাথে। এই মুহূর্তে ধার শোধ করার চেয়ে নতুন যুদ্ধ সামাল দেওয়া বেশি দরকার। ছোট ছেলে রাজাকে চিঠি দিচ্ছে, দরবারের একে ওকে দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু রাজার সেদিকে ভ্রূক্ষেপও নেই। কাজেই ধার দেওয়া টাকার সুদ তো দূরের কথা, ছোট ছেলে এখন আসলটাও হারিয়ে বসে আছে। স্বাভাবিকভাবেই বাবাও অসন্তুষ্ট।
