বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকার আর ব্যাংকগুলো টাকা ছেপে কূল পাচ্ছে না। বর্তমান সঙ্কটময় অবস্থায় অর্থনীতির অগ্রগতি থেমে যেতে পারে, এই ভয়ে ক্রেডিটের নামে তৈরি হচ্ছে কোটি কোটি ডলার, ইউরো আর ইয়েন। অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠছে একটা বিরাট বুদবুদের মতো, যেটা যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে জেনেও মানুষেরা সেটাকে আরও ফুলিয়ে তুলছে। তারপরেও মানুষ আশা করছে যে পৃথিবীর বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ আর প্রকৌশলীরা আরও নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে বৃদ্ধিটা অব্যাহত রাখবে, অর্থনীতির বুদবুদটাকে ফেটে যেতে দেবে না। এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণাই সবার ভরসা। জৈবপ্রকৌশল বা ন্যানোপ্রকৌশলের মতো বিষয়ে এখনও নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। সেটা সম্ভব হলে ২০০৮ থেকে আগাম তৈরি হওয়া কোটি কোটি টাকা সার্থক হবে। আর যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায় সামনের দিনগুলো হবে অনেক কঠিন।
কলম্বাসের টাকা চাই
পুঁজিবাদ শুধু বিজ্ঞানের বিকাশেই নয়, ইউরোপের সাম্রাজ্যবিস্তারের পিছনেও একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। পুঁজিবাদে ক্রেডিটের ধারণাটাও এসেছে তখন থেকেই। না, ক্রেডিট জিনিসটা আধুনিক ইউরোপের আবিষ্কার নয়। প্রায় সব কৃষিভিত্তিক সমাজেই ক্রেডিটের ধারণা ছিল আরও আগে থেকেই, আর এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের সম্পর্কটাও বেশ ঘনিষ্ঠ। এখানে মনে রাখা দরকার, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিক পর্যন্তও এশিয়া ছিল পৃথিবীর অর্থনৈতিক কেন্দ্র। চীন, মধ্যপ্রাচ্য বা ভারতের তুলনায় ইউরোপের পুঁজির পরিমাণ ছিল খুবই কম।
তবে চীন, ভারত আর মুসলিম বিশ্বের তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় ক্রেডিট জিনিসটা খুব বেশি গুরুত্ববহন করত না। ইস্তাম্বুল, ইস্পাহান, দিল্লী আর বেইজিঙের ব্যবসায়ী ও ব্যাংক-মালিকদের মধ্যে পুঁজিবাদী চিন্তা কিছুটা থাকলেও রাজা আর সেনাপতিরা সেটা পছন্দ করত না। ইউরোপের বাইরে বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হয় নুরহাচি বা নাদির শাহের মতো দখলদার মানুষের হাতে অথবা চিং আর অটোমান সাম্রাজ্যের মতো রাজা-রাজড়াদের হাতে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে টাকাপয়সা দরকার হতো সেটা আদায় করা হতো খাজনা আদায় করে অথবা লুট করে (যদিও এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য ছিল সামান্যই)। যেহেতু নগদেই সব কাজ হতো, তাই ক্রেডিট, ঋণ, সুদ, বিনিয়োগ- এসব নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা ছিল না।
অন্যদিকে ইউরোপের অবস্থা ছিল ঠিক এর বিপরীত। ব্যবসায়ী আর ব্যাংকাররা ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসার আগে থেকেই সেখানকার রাজা আর সেনাপতিদের চিন্তাধারা ছিল ব্যবসায়ীদের মতো। ইউরোপীয়দের বিশ্বজোড়া অভিযানের খরচ যোগানোর ক্ষেত্রে প্রজাদের খাজনার চেয়ে ক্রেডিটের ভূমিকাই বেশি ছিল। পুঁজিবাদী মানুষেরা বেশি লাভের আশায় ক্রমে এসব অভিযানে আগ্রহী হয়েছে। এই হ্যাট-কোট পরা ব্যবসায়ীদের তৈরি সাম্রাজ্যই কিন্তু একদিন রেশমি রাজপোশাক আর ধাতব বর্মধারী মানুষের সাম্রাজ্য দখল করে নিয়েছে। অভিযানের পিছনে টাকা ঢালার ব্যাপারে ইউরোপীয়রা অনেক বেশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। খাজনা কেউই দিতে চায় না, অথচ বিনিয়োগে আপত্তি নেই কারও।
১৪৮৪ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ইউরোপ থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার নতুন পথ খুঁজতে যাবেন বলে আর্থিক সাহায্য চাইলেন পর্তুগালের রাজার কাছে। সে তো যেমন তেমন অভিযান নয়, জাহাজ বানাতে হবে, অনেক দিনের রসদ নিতে হবে, নাবিক আর সৈনিকদের বেতন দিতে হবে- অনেক টাকার ব্যাপার। আবার এতগুলো টাকার বিনিময়ে যে অভিযানটা সফল হবে, তার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই। কাজেই রাজা সোজা না করে দিলেন।
আজকের দিনে নতুন উদ্যোক্তারা যা করে, কলম্বাস ঠিক তাই করলেন। তিনি একে একে আবেদন জানালেন ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর পর্তুগালের ধনী লোকদের কাছে। কেউই রাজি হল না। শেষমেশ তিনি গেলেন স্পেনের নতুন রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার কাছে। একা গেলেন না, গেলেন তদবির করার জন্য কয়েকজন ঝানু লোককে সাথে নিয়ে। তাদের সাহায্যেই শেষ পর্যন্ত রানি ইসাবেলার কাছ থেকে সাহায্যের আশ্বাস মিলল। আজ তো সবাই জানে, ইসাবেলা কী দারুণ বিনিয়োগটা করেছিলেন সে সময়। কলম্বাসের অভিযানের পর স্প্যানিয়ার্ডরা আমেরিকা দখল করে নেয়। সেখানে তারা সোনা আর রুপার খনি খুঁজে পেল, পাশাপাশি চিনি আর তামাকের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করল। আর তাতেই স্পেনের রাজা, ব্যাংকার আর ব্যবসায়ীদের সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করল।
এর শ খানেক বছর পর ইউরোপের ব্যাংকার আর রাজবংশীয়রা এসব অভিযানে বিনিয়োগ করা আরও বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকা থেকে আনা সম্পদ তো তাদের কাছে ছিলই। শুধু টাকাপয়সাই নয়, এই ধরনের অভিযানের উপর তাদের আস্থাও বেড়েছিল অনেকখানি। এইভাবেই শুরু হল সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদের লাভের চক্র- টাকা দিয়ে নতুন নতুন অভিযান শুরু হচ্ছে, তাতে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কৃত হচ্ছে, সেসব জায়গায় উপনিবেশ তৈরি হচ্ছে, উপনিবেশ থেকে আরও টাকা আসছে, তাতে মানুষের ভরসা বাড়ছে, তাই বিনিয়োগও বাড়ছে। নুরহাচি (Nurhaci) আর নাদির শাহের (Nader Shah) অভিযান কয়েক হাজার কিলোমিটার গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল, অথচ এসব পুঁজিবাদী অভিযান দিনে দিনে আরও গতি পেয়েছে।
