এই কারণেই পুঁজিবাদকে ‘পুঁজিবাদ’ বলা হয়, কারণ এখানে ‘পুঁজি’ আর ‘সম্পদ’- এ দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। পুঁজি হল টাকা, মালামাল বা যেকোনো সম্পদ যা উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করা হয়। অন্যদিকে সম্পদ হল মাটির নিচে পুঁতে রাখা টাকার বান্ডিল, যা কোনো কিছু উৎপাদনের কাজে লাগে না। যে ফারাও অনেক টাকা খরচ করে একটা বিশাল পিরামিড বানিয়েছে সে পুঁজিবাদী নয়। যে জলদস্যু স্প্যানিশ নৌবহর লুট করে পাওয়া কাঁড়ি কাঁড়ি সোনার মোহর কোনো ক্যারিবিয়ান দ্বীপের বালিতে পুঁতে রেখেছে, সেও পুঁজিবাদী নয়। পুঁজিবাদী হল সেই শ্রমিক, যে তার প্রতি মাসের যৎসামান্য বেতন থেকে কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটায়।
‘লাভের টাকা উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হবে’ এই ধারণাটা আমাদের কাছে খুব সাধারণ মনে হলেও একসময় মানুষের কাছে এটা অস্বাভাবিক ছিল। এই আধুনিক যুগ শুরু হওয়ার আগেও মানুষ মনে করত মোট উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি একই রকম। কাজেই উৎপাদন যদি আর না-ই বাড়ে, তবে আরও বেশি বিনিয়োগ করে কী হবে? তাই মধ্যযুগের অভিজাত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দান আর ভোগ- এ দুটো ব্যাপার খুব বেশি দেখা যেত। তাদের লাভের টাকা খরচ হতো নানারকম প্রতিযোগিতায়, যুদ্ধে, পান-ভোজনে আর ভোগ-বিলাসে, নয়তো খরচ হতো গরিবকে কিংবা ধর্মীয় কাজে দান করে। খুব কম মানুষই লাভের টাকা দিয়ে চাষবাস বা নতুন কোনো ব্যবসার কথা ভাবত।

অথচ বর্তমানে সেই অভিজাতদের জায়গাটা নিয়েছে পুঁজিপতিরা। এই পুঁজিবাদী সমাজে আগেকার সেই সামন্ত কিংবা জমিদারদের গুরুত্ব নেই, গুরুত্ব আছে ব্যবসায়ী আর শিল্পপতিদের। আজকের পুঁজিপতিরা মধ্যযুগের সেই অভিজাতদের চেয়ে অনেক বেশি ধনী, কিন্তু তারা ভোগ করে অনেক কম। এইসব মানুষ তাদের আয়ের খুব অল্প অংশই অনুৎপাদনশীল কাজে খরচ করে।
মধ্যযুগে অভিজাত মানুষেরা সোনা আর রেশমের সুতোয় বোনা কাপড় পরত, বড় বড় ভোজসভা, উৎসব আর প্রতিযোগিতায় অনেকটা সময় দিত। অথচ আজকের দিনের কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাকেও দেখা যায় স্যুট নামের ইউনিফর্ম পরতে, আর কাজের বাইরে দেওয়ার মতো সময় তাদের নেই বললেই চলে। একজন পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীর সারা দিন কাটে মিটিঙে মিটিঙে, আর কীভাবে নতুন নতুন জায়গায় বিনিয়োগ করা যায়, শেয়ারের দাম বাড়ল না কমল সেই চিন্তা করে করে। হ্যাঁ, তার স্যুটটা অনেক দামি কাপড়ের হতে পারে, তার চলাচলের জন্য নিজের একটা বিমানও থাকতে পারে- কিন্তু তার পরেও, তার বিনিয়োগের তুলনায় ভোগের পরিমাণটা নগণ্য।
শুধু যে দামী স্যুট পরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই বিনিয়োগ করে তা নয়। সাধারণ মানুষ অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও একই রকম চিন্তা করে। এজন্যই খাবার টেবিলের আড্ডাতেও প্রায়ই উঠে আসে জমানো টাকা দিয়ে শেয়ার কিনলে ভালো হবে নাকি জমি কিনলে, এই ধরনের বিষয়। সরকারও করের টাকা এমনভাবে খরচ করতে চায় যেন ভবিষ্যতে আরও বেশি কর আদায় করা যায়। এই যেমন, সরকার যদি নতুন একটা সমুদ্র বন্দর বানায়, তাহলে সেটা দিয়ে আরও বেশি পণ্য রপ্তানি হবে, তাতে পণ্য উৎপাদনকারীর আয় বাড়বে, সেখান থেকে সরকার আরও বেশি আয়কর পাবে। আবার কোনো সরকার হয়তো শিক্ষাখাতে বেশি বিনিয়োগ করে, যাতে শিক্ষিত মানুষেরা আরও ভালো ভালো কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আর সেখান থেকে আরও বেশি কর পাওয়া যায়।
পুঁজিবাদের শুরুটা হয়েছিল বইয়ের পাতা থেকে। টাকা জিনিসটা কীভাবে কাজ করে আর লাভের টাকা বিনিয়োগ করলে অর্থনীতি কীভাবে দ্রুত এগোয়- সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিল এই তত্ত্ব। কিন্তু পুঁজিবাদ শেষ পর্যন্ত স্রেফ একটা তত্ত্ব হয়ে বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। এটা এখন আমাদের জীবনধারায় মিশে গেছে। মানুষের আচরণ কেমন হবে, শিশুদের কী শেখাতে হবে, কীভাবে চিন্তা করতে হবে- সবকিছুতেই পুঁজিবাদের ছায়া। পুঁজিবাদের মূল কথা হল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই হল আসল সমৃদ্ধি। এমনকি সুবিচার, স্বাধীনতা, এমনকি মানুষের সুখে থাকাও নির্ভর করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপর। একজন ঘোর পুঁজিবাদী মানুষের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তানে ন্যায়বিচার আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে কী করা দরকার, তাহলে সম্ভবত তার কাছে থেকে “একটা স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ” সম্পর্কে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা শুনে আসতে হবে।
আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির পিছনেও এই পুঁজিবাদ নামক ‘ধর্মের’ অনেকটা প্রভাব আছে। সাধারণত বৈজ্ঞানিক গবেষণার পিছনে টাকা ঢালে সরকার অথবা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যখন কোনো পুঁজিবাদী সরকার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো একটা গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে যায়, তখন তাদের মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা আসে সেটা হল, “এখানে বিনিয়োগ করে কি উৎপাদন বাড়বে? কোনও লাভ হবে? এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি কতটুকু হবে?” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে সে গবেষণা আর এগোয় না। তাই আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে কোনোভাবেই পুঁজিবাদকে বাদ দেওয়া যায় না।
আবার উল্টোটাও সত্যি। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে পুঁজিবাদের ইতিহাস লেখাও অসম্ভব। পুঁজিবাদ বিশ্বাস করে যে অর্থনীতির বৃদ্ধি চলতেই থাকবে, থামবে না কখনো। কিন্তু এই বিশ্বাস ধরে রাখতে হলে তো সামনে কি আছে সেটা জানতে হবে। একটা নেকড়ের পাল যদি মনে করে ভেড়ার সংখ্যা সবসময় বাড়তেই থাকবে- তাহলে সেটা হবে স্রেফ বোকামি। মানবসমাজের অর্থনীতি অনেক বছর ধরে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলেছে এবং এখনও বেড়ে চলছে- এর পিছনে একচেটিয়া কৃতিত্ব বিজ্ঞানীদের ও তাঁদের সব আবিষ্কারের। আমেরিকা আবিষ্কার, অন্তর্দহন (internal combustion) ইঞ্জিন আবিষ্কার কিংবা উন্নত প্রজাতির গবাদিপশু আবিষ্কার- এসব নিত্যনতুন আবিষ্কারই অর্থনীতির বিকাশের পিছনে ভূমিকা রেখে চলেছে। সরকার আর ব্যাংক কাগজে টাকা ছাপে বটে, কিন্তু সেই টাকাকে মূল্যবান করে তোলে বিজ্ঞানীরাই।