এই পরিস্থিতিটা সবার জন্যই খারাপ। ক্রেডিট সীমিত বলে মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করতে পারছে না। তাই অর্থনীতির উন্নতিও থেমে যাচ্ছে। আবার অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে না বলে মানুষ আশা হারাচ্ছে, যারা পুঁজির মালিক তারাও ক্রেডিট বাড়াচ্ছে না। সমস্যাগুলো নিজেরাই নিজেদের জিইয়ে রাখে।
কেকটা বড় হচ্ছে
এরকম একটা সময়ে বিজ্ঞানের জগতে ঘটল বিপ্লব, শুরু হল প্রগতির যুগ। এই প্রগতির ধারণার মূলে যে চিন্তা ছিল সেটা এরকম, যদি আমরা আজ আমাদের অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নিই আর আমাদের সম্পদ গবেষণার কাজে লাগাই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে আরও ভালো হবে। খুব দ্রুতই এর অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা গেল। যারা এই প্রগতির ধারণায় বিশ্বাস করে, দেখা গেল তারা এটাও বিশ্বাস করে যে বিভিন্ন ভৌগোলিক আবিষ্কার, প্রযুক্তির উদ্ভাবন আর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন আমাদের উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। ভারত মহাসাগরের ব্যবসা পুরোপুরি চালু রেখেই পাশাপাশি এবার আটলান্টিক মহাসাগরেও নতুন নতুন ব্যবসার পথ তৈরি হল। আগের সব সম্পদের উৎপাদন ঠিক রেখেই নতুন সম্পদের উৎপাদন শুরু হল। এই যেমন কোনো বেকারি কেক তৈরি শুরু করলে তাতে অন্য কোনো বেকারির রুটি তৈরিতে ভাটা পড়ল না। বরং তাতে মানুষের খাবারে বৈচিত্র্য এল, মানুষ আরও বেশি খেতে শুরু করল। কারও সম্পদ কেড়ে না নিয়েও যে কেউ আরও ধনী হতে পারে, সেটা এবার দেখা গেল। একটু আগে যে কেক ভাগাভাগির কথা হচ্ছিল, সেই কেকটা এবার দিনে দিনে আরও বড় হতে লাগল। তাই অন্য কারও ভাগ থেকে না নিয়েও আরও বড় টুকরো পাওয়া সম্ভব হল।
গত ৫০০ বছরে এই প্রগতির কারণেই মানুষের ভবিষ্যতের উপর আস্থা আরও বেড়েছে। এই আস্থার কারণে বেড়েছে ক্রেডিটের পরিমাণ, তার ফলে এসেছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আর সেই অগ্রগতিই ভবিষ্যতের উপর আস্থা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে আরও ক্রেডিট তৈরি হচ্ছে। এটা একদিনে হয়নি। শুরুতে অনেক উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে এলেও এখন সেটা অনেকটাই মসৃণ হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীতে আজ ক্রেডিটের ছড়াছড়ি। তাই এখন সরকার, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সাধারণ মানুষেরাও অল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে পারে।

সম্পদের পরিমাণ যে দিনে দিনে বাড়ছে- এই ধারণাটাই অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। ১৭৭৬ সালে স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ “The Wealth of Nations” নামে একটা যুগান্তকারী বই লেখেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অর্থনীতিতে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই সম্ভবত আর লেখা হয়নি। সে বইয়ের প্রথম খণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়ে স্মিথ একেবারে নতুন কিছু যুক্তি হাজির করেন। তিনি বলেন, যখন একজন জমিদার, অথবা কোনো তাঁতি, কিংবা মুচি তার নিজের পরিবারের চাহিদার চেয়েও বেশি টাকা আয় করে, তখন সে ঐ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সহকারী নিয়োগ করে আরও বেশি টাকা আয় করতে পারে। যত বেশি টাকা আয় হবে, তত বেশি সহকারী ঐ কাজে নিযুক্ত হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কোনো পেশাজীবীর ব্যক্তিগত লাভ যত বেশি হবে, সমাজের মোট সম্পদ ও উন্নয়নও ততই বাড়বে।
আমাদের কাছে এই জিনিসটা খুবই সাদামাটা মনে হবে, ‘যুগান্তকারী’ তো কোনোভাবেই না। এর কারণ হলো, আমরা বাস করি একটা পুঁজিবাদী পৃথিবীতে, যেটা কিনা ইতোমধ্যেই স্মিথের কথা অনুযায়ী চলছে। স্মিথের এই কথাগুলোই ঘুরেফিরে নানাভাবে আমরা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখতে পাই, তাই এটাকে আর বিশেষ কিছু বলে মনে হয় না। অথচ ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজ করে, ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়ে সমাজের সমন্বিত সমৃদ্ধি অর্জন করা’ – এই ধারণাটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানুষের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও একটা ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। স্মিথ বলেন যে, লোভ জিনিসটা আসলে খারাপ নয়। আমি ধনী হলে আসলে আমার একার নয়, সবারই কোনো না কোনোভাবে উপকার হয়। অর্থাৎ স্বার্থপরতার মধ্যেই আছে পরার্থপরতা।
স্মিথ মানুষকে শেখালেন এক নতুন অর্থনীতি, যেখানে সবারই লাভ হয়, ঠকে না কেউই। আমার লাভ মানে তোমারও লাভ। মানে শুধু আমি যে কেকের বড় টুকরোটা পাব তা-ই নয়, আমি বেশি পেলে তোমার টুকরোটাও বড় হবে। আমি অভাবে থাকলে তোমার অভাবও যাবে না, কারণ তোমার তৈরি জিনিসটা তখন আমি কিনতে পারব না। আমি ধনী হলেই কেবল তোমার তৈরি জিনিস আমার কাছে বেচে তুমিও ধনী হতে পারবে। সম্পদ আর নৈতিকতার মধ্যেকার দ্বন্দ্বটাকে স্মিথ একেবারে উড়িয়ে দিলেন। বলা যায় স্বর্গের যে দরজাটা ধনীদের জন্য এতদিন বন্ধ ছিল, স্মিথ সেটা খুলে দিলেন। এখন ধনী হওয়াটাই নৈতিক। স্মিথের ভাষ্যমতে, মানুষ অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে ধনী হয় না, বরং নিজে ধনী হতে গিয়ে সবার মোট সম্পদের পরিমাণটাই আরও বাড়িয়ে দেয়। তাতে সবারই লাভ। তাই এখন ধনীরা আর পাপী নয়, বরং তারাই সমাজের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী, কারণ তারাই অর্থনীতিকে সচল রেখে সবার উপকার করে।
অবশ্য এর সবটাই নির্ভর করে ধনীদের কাজের উপর। সম্পদের মালিকেরা যদি তাদের লাভের টাকা ফেলে না রেখে সেটা নতুন কিছু তৈরি করতে বা আরও শ্রমিক নিয়োগ করতে কাজে লাগায়, তাহলেই শুধু এটা সম্ভব। বেশি লাভ হলে সেই অতিরিক্ত টাকা সিন্দুকে ফেলে রাখলে কদিন পরপর সেটা গুনে দেখা ছাড়া আর কোনও কাজেই আসবে না। বরং সেই টাকাকে আরও বেশি উৎপাদনের জন্য খরচ করতে হবে। এটাই স্মিথের প্রস্তাবিত অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আধুনিক পুঁজিবাদের মূল কথা এটাই- লাভের টাকা উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে, তাতে আরও বেশি লাভ হবে, সেই টাকাও আবার বিনিয়োগ করতে হবে, তাতে আরও লাভ আসবে- এভাবে চলতেই থাকবে, থেমে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিনিয়োগ নানাভাবে করা যায়। কারখানাটাকে আরও একটু বড় করা যায়, গবেষণা করা যায়, নতুন কোনো পণ্যও বানানো যায়। এই সবকিছুই বিনিয়োগ, কোনো না কোনোভাবে উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। তাই পুঁজিবাদের প্রথম ও প্রধান নীতিই হল- লাভের টাকাকে আরো বেশি উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।