আমেরিকার বর্তমান আইন অনুযায়ী ব্যাঙ্কটা এই কাজ আরও সাতবার করতে পারে, অর্থাৎ স্টোনের অ্যাকাউন্টের অঙ্কটা ১ কোটিতে গিয়েও ঠেকতে পারে, যদিও ব্যাঙ্কের সিন্দুকে সেই দশ লাখই সম্বল। একটা ব্যাঙ্ক তার কাছে থাকা প্রতি ডলারের বিপরীতে দশ ডলার পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তার মানে হল এখনকার দিনে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে যত টাকা দেখা যায় তার ৯০ শতাংশই আসলে কাগজের নোট কিংবা ধাতব মুদ্রার আকারে নেই।২ আজ যে কোনো একটা বড় ব্যাঙ্কের সব গ্রাহক যদি একই সাথে যার যার অ্যাকাউন্টের সব টাকা তুলে নিতে চায়, সেই ব্যাঙ্ক কিছুক্ষণের মধ্যেই পথে বসবে (যদি না সরকারি সাহায্য মেলে)।
পুরো ব্যাপারটাকে কি একটা বিরাট ধোঁকাবাজি মনে হচ্ছে? তাই যদি হয়, তাহলে বর্তমান পৃথিবীর সম্পূর্ণ অর্থনীতিই একটা বিশাল ধোঁকা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু আসলে এটা ধোঁকাবাজি নয়, বরং মানুষের কল্পনাশক্তির একটা চরম নিদর্শন। আমরা অনাগত ভবিষ্যতের উপর ভরসা রাখি, আর সেই ভরসার ভিত্তিতেই ব্যাঙ্কগুলো টিকে থাকে, অর্থনীতি এগিয়ে যায়। পৃথিবীর প্রায় সবটুকু টাকাপয়সার গোড়ায় আছে এই বিশ্বাস।
উপরের গল্পে স্টোনের অ্যাকাউন্টের টাকা আর ব্যাঙ্কের সম্পদের পার্থক্যটাই হল ম্যাকডোনাটের টাকা। এই টাকাটা গ্রিডি পুঁজি হিসেবে খাটিয়েছেন আরও টাকা তৈরির আশায়। বেকারি থেকে একটা রুটিও তৈরি হয়নি এখনও, অথচ গ্রিডি আর ম্যাকডোনাট দুজনেই আশা করছেন যে বছর খানেকের মধ্যেই এই বেকারি থেকে অনেক রুটি, কেক আর বিস্কুট তৈরি হবে, সেগুলো বিক্রি করে আসবে লাভের টাকা। সেই টাকা দিয়ে ম্যাকডোনাট তার ঋণ সুদসহ শোধ করে দিতে পারবেন। তখন যদি স্টোন তার অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নিতে চান, গ্রিডিও সেটা দিতে পারবেন। তার মানে সবকিছুই হচ্ছে একটা কাল্পনিক ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস রেখে। ব্যাঙ্ক মালিক আর বেকারি মালিক বিশ্বাস করে একদিন বেকারিটা ঠিকমতো চলবে, আর ঠিকাদার বিশ্বাস করে একদিন ব্যাঙ্কে টাকা আসবে।
আমরা আগেই দেখেছি, টাকার যেকোনো কিছুতে পরিণত হওয়ার একটা বিস্ময়কর ক্ষমতা আছে, আবার যেকোনো কিছুকে অন্য যেকোনো কিছুতে পরিণত করার ক্ষমতাও আছে। তবে আগে এই ক্ষমতাও সীমিত ছিল। তখন টাকা আর টাকার বিনিময়ে পাওয়া সবকিছু ‘বর্তমানেই’ আটকে ছিল। তাই নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করাটা খুব সহজ হতো না, আর অর্থনীতির বৃদ্ধির গতিও ছিল অনেক ধীর।
বেকারির কথাটাই ভাবুন। ম্যাকডোনাট কি নিজের টাকায়, বা নিজের কোনো সম্পদ দিয়ে বেকারিটা তৈরি করতে পারতেন? পারতেন না। বর্তমানে তার বেকারি তৈরির স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করার মতো টাকা নেই। রুটি আর কেক বিক্রি করতে না পারলে তার হাতে টাকা আসবেও না। টাকা না থাকলে কোনো ঠিকাদার তাকে বেকারি তৈরি করেও দেবে না।
কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ এই চক্রে আটকা পড়ে ছিল। তাই অর্থনীতিও এগোচ্ছিল ধীরে। এখান থেকে বেরোবার পথ মানুষ আবিষ্কার করেছে এই আধুনিক যুগে এসে, ভবিষ্যতে বিশ্বাস রেখে কাজ করার এই নতুন পদ্ধতি তৈরি করে। এখন মানুষ কাল্পনিক পণ্যে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ যে জিনিসটা বর্তমানে নেই, সেটাও তারা ‘ক্রেডিট’ নামক ধার করা টাকা দিয়ে কেনে। ক্রেডিটের মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যৎ বিক্রি করে বর্তমানকে সাজায়। এর গোড়ায় আছে একটাই বিশ্বাস- ভবিষ্যতে আমরা যে সম্পদের মালিক হব সেটা আমাদের বর্তমান সম্পদের চেয়ে ঢের বেশি। সেই ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ খরচ করে বর্তমানের পণ্য কেনার এই সুযোগটাই দারুণ সব সম্ভাবনা তৈরি করল।
তাহলে ক্রেডিটের মতো এই চমৎকার জিনিসের কথা মানুষ আরও আগে ভাবেনি কেন? ভেবেছে তো বটেই। ক্রেডিটের কাছাকাছি কিছু না কিছু সেই প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে আমাদের জানা প্রায় সব সভ্যতাতেই ছিল। কিন্তু তখনকার মানুষ সেটাকে কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ ভবিষ্যৎ যে বর্তমানের চেয়ে ভালো হবে- এই বিশ্বাসটা তাদের মধ্যে এত জোরালো ছিল না। সাধারণত তারা ভাবত অতীতের দিনগুলোই ভালো ছিল, আর ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে খুব একটা ভালো হবে না। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে, তারা ভাবত তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ নির্দিষ্ট, সেটা কমলেও কমতে পারে, কিন্তু বেড়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। তাই দশ বছর পরে তাদের ব্যক্তিগত, রাষ্ট্রীয়, এমনকি পৃথিবীর মোট সম্পদের উৎপাদন যে আরও বাড়তে পারে, এটা তারা চিন্তাই করতে পারত না। ব্যবসা বাণিজ্যের সব যোগ-বিয়োগের ফল হতো শূন্য। হ্যাঁ, একটা বেকারি হয়তো অনেক লাভ করতে পারে, কিন্তু সেজন্য পাশের বেকারিটাকেই হয়তো লোকসান গুনতে হবে। ভেনিস শহরের উন্নতি করতে গেলে দেখা যাবে জেনোয়া পথে বসে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের সম্পদ বাড়াতে গেলে হয়তো ফ্রান্স থেকেই লুট করে আনতে হবে। একটা কেককে যেভাবেই কাটা হোক না কেন, সেই টুকরোগুলো জোড়া দিলে কি আর সেটা ঐ কেকটার চেয়ে বড় হতে পারে?
এই কারণেই অনেক সমাজে বেশি টাকার মালিক হওয়াটাকে পাপের কাজ হিসেবে দেখা হতো। যিশুখ্রিস্ট তো বলেছেনই, “ধনী মানুষের ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করার চেয়ে সুঁইয়ের ছিদ্রের ভিতর দিয়ে উটের চলে যাওয়া সহজ।” (ম্যাথিউ ১৯ঃ২৪)। একটা কেক কেটে কেউ যদি বড় টুকরোটা নিয়ে যায়, তাহলে নিশ্চয়ই সে অন্য কারও ভাগেরটুকুও নিয়ে যাচ্ছে। এইজন্যই ধনী মানুষেরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ দান করে পাপক্ষালন করত।

কেকটার আকার যদি না বাড়ে, তাহলে আসলে ক্রেডিটের ব্যাপারটাই আর থাকে না। আজকের কেকের আকার আর আগামীকালের কেকের আকারের পার্থক্যটাই হল ক্রেডিট। কেকের আকার যদি না বাড়ে, তাহলে ক্রেডিট আসবে কোত্থেকে? সেক্ষেত্রে অন্য কারো ভাগেরটা দখল করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেখানে ঝুঁকি আছে। এজন্যই আগেকার দিনে টাকা ধার নেওয়াটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। ধার নিতে পারলেও সেই টাকার অঙ্কটা হতো অনেক কম, পাওয়া যেত অল্প সময়ের জন্য, আর ফেরত দেওয়ার সময় দিতে হতো চড়া সুদ। তাই নতুন ব্যবসা শুরু করাটা তখন এত সহজ ছিল না। রাজারাও নতুন একটা প্রাসাদ বানানোর আগে, কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রজাদের উপর কর বাড়িয়ে দিয়ে টাকা জোগাড় করতেন।
রাজাদের জন্য এটা তেমন কোনো সমস্যাই ছিল না (যদি প্রজারা ক্ষেপে না যায়), কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এটা ছিল অনেক বড় বাধা। যার চোখে একটা নতুন বেকারি তৈরির স্বপ্ন ছিল, তাকে হয়তো টাকার জন্য অন্য কারও রান্নাঘরের মেঝে পরিষ্কার করতে হতো।