এরপর ব্রিটিশ, ফরাসি ও জার্মান বিশেষজ্ঞরা এই ভাষাতত্ত্বের সাথে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বকে মিলিয়ে নতুন একটা তত্ত্ব দিলেন। তাঁরা বললেন, আর্যরা শুধু একটা বিশেষ ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠী নয়, আর্য হল সম্পূর্ণ আলাদা একটা জাতি। তাও যে সে জাতি নয়, মানুষের মধ্যে সেরা জাতি। এই লম্বা, হালকা রঙের চুল ও নীল চোখের পরিশ্রমী ও যুক্তিবাদী মানুষেরা পৃথিবীর উত্তর দিক থেকে এসে সারা পৃথিবীতে সভ্যতার সূচনা করে দিয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় হল, ভারত আর পারস্যে যে আর্যরা গিয়েছিল, তারা সেখানকার মানুষের সাথে মিলে মিশে যায় আর তাদের সাথেই সন্তানের জন্ম দেয়। তাই পরবর্তী প্রজন্মের মানুষদের মধ্য থেকে আর্যদের ফর্সা গায়ের রঙ, সোনালি চুল, যুক্তিবাদী ও পরিশ্রমী স্বভাব- সবই হারিয়ে যায়। তাই ভারত ও পারস্যের সভ্যতাও বেশি এগোতে পারেনি। অন্যদিকে ইউরোপে আর্যরা তাদের জাতিগত বিশুদ্ধতা ধরে রাখতে পেরেছিল বলেই তারা একদিন পুরো পৃথিবী করায়ত্ব করতে পেরেছে। তারাই এই পৃথিবীর যোগ্য শাসক, আর অন্যান্য নিচু জাতের মানুষের সাথে না মিশলে তারা এই শ্রেষ্ঠত্ব ধরেও রাখতে পারবে।
এই ধরনের জাতিবিদ্বেষী তত্ত্ব কয়েক দশক ধরে অনেক প্রতাপের সাথে টিকে ছিল। বিজ্ঞানী আর রাজনীতিবিদ- উভয়েই এই তত্ত্বকে সাদরে গ্রহণ করে। তবে এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম চলতেই থাকে। তবে এর মধ্যেই এই শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিটা ‘জাতি’ থেকে সরে যায় ‘সংস্কৃতি’র দিকে। আজকের দিনে দেখা যায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্যের আলোচনায় শারীরিক পার্থক্যের চেয়ে সাংস্কৃতিক পার্থক্যটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এখন আর কেউ বলে না, ‘এটা ওদের রক্তে মিশে আছে’, বরং বলে ‘ওদের সংস্কৃতিই এরকম’।
এসব কারণেই ইউরোপের যে ডানপন্থী দলগুলো মুসলিমদের অনুপ্রবেশের বিরোধিতা করে, তারাও তাদের কথায় জাতিবিদ্বেষের সুর যেন না থাকে সেই চেষ্টা করে। ফরাসি রাজনীতিবিদ মেরিন লা পেনকে (Marine le Pen) যদি কখনও টেলিভিশন বক্তৃতায় বলতে শোনা যায়, “আমরা চাইনা আরব বিশ্বের এসব নিচু জাতের মানুষ এখানে এসে আমাদের আর্য রক্তকে কলুষিত করুক”, তাহলে তাঁর বক্তৃতালেখকদের তাড়িয়ে দিতে একটুও সময় লাগবে না। তাই ইউরোপের রাজনৈতিক দলগুলো বলে, ইউরোপে বিকশিত হওয়া পশ্চিমা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হল গণতান্ত্রিক চেতনা, পরমতসহিষ্ণুতা ও লিঙ্গবৈষম্যহীনতা। ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে আছে একদলীয় শাসন, ধর্মীয় উগ্রতা আর নারীদের অবমাননা। তাই তাদের সংস্কৃতি ইউরোপের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া মুসলিম প্রবাসীরা ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতেও অনিচ্ছুক কিংবা অনেক ক্ষেত্রে অপারগ। তাই ইউরোপের গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার্থে এবং অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা কমাতে মুসলিমদের ইউরোপে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত না।
এই যুক্তির সমর্থনে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের অনেক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় বিভিন্ন সভ্যতার বিরোধ ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য তুলে ধরা হয়। সব ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিক অবশ্য এই যুক্তিগুলো মানেন না। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা যত সহজে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক পার্থক্যকে নগণ্য বলে জাতিবিদ্বেষকে উড়িয়ে দিতে পারেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্যের বেলায় সমাজবিজ্ঞানীরা কিন্তু এত সহজে সেটা পারেন না। সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে পার্থক্য যদি সামান্যই হতো, তাহলে যুগ যুগ ধরে ইতিহাসবিদ আর নৃতাত্ত্বিকেরা সেটা নিয়ে এত পড়াশোনাই বা করছে কেন?
ইউরোপের সাম্রাজ্যবিস্তারে বিজ্ঞানীরা বাস্তব জ্ঞান, আদর্শগত ন্যায্যতা আর প্রযুক্তিগত উপকরণ সরবরাহ করেছেন। তাঁদের সাহায্য ছাড়া ইউরোপ পৃথিবী দখল করতে পারত কি না সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। আর এই দিগ্বিজয়ী সাম্রাজ্যও তাঁদেরকে দিয়েছে তথ্য, নিরাপত্তা, নতুন নতুন জ্ঞানের ভাণ্ডার আর পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা। সাম্রাজ্যের সাহায্য ছাড়া আজকের বিজ্ঞানও এই অবস্থায় কোনোভাবেই আসতে পারত না। বিজ্ঞানের খুব কম শাখাই আছে যা এই সাম্রাজ্যবাদের ছায়ায় বেড়ে ওঠেনি।
তবে এটুকুই সব নয়। বিজ্ঞান তার বিকাশের জন্য সাম্রাজ্য ছাড়াও আরও অনেক জায়গা থেকেই সাহায্য পেয়েছে। আর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের উত্থান আর প্রসারের পেছনে বিজ্ঞান ছাড়াও আরও অনেক বিষয়ই ছিল। বিজ্ঞান ও সাম্রাজ্যবাদের এই হঠাৎ বেড়ে ওঠার পেছনে আরও একটা শক্তি কাজ করেছে। সেটা হল পুঁজিবাদ। ব্যবসায়ীরা যদি টাকার পেছনে না ছুটত, তাহলে কলম্বাসও আমেরিকায় পৌঁছাতেন না, জেমস কুকও অস্ট্রেলিয়ায় যেতেন না, আর নিল আর্মস্ট্রংয়েরও কখনও চাঁদের মাটিতে পা রাখা হতো না।
—————
1 Stephen R. Bown, Scurvy: How a Surgeon, a Mariner and a Gentleman Solved the Greatest Medical Mystery of the Age of Sail (New York: Thomas Dunne Books, St. Martin’s Press, 2004); Kenneth John Carpenter, The History of Scurvy and Vitamin C (Cambridge: Cambridge University Press, 1986).
2 James Cook, The Explorations of Captain James Cook in the Pacific, as Told by Selections of his Own Journals 1768–1779, ed. Archibald Grenfell Price (New York: Dover Publications, 1971), 16–17; Gananath Obeyesekere, The Apotheosis of Captain Cook: European Mythmaking in the Pacific (Princeton: Princeton University Press, 1992), 5; J. C. Beaglehole, ed., The Journals of Captain James Cook on His Voyages of Discovery, vol. 1 (Cambridge: Cambridge University Press, 1968), 588.
