সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে বিকাশ লাভ করেছে ভাষাবিজ্ঞান। ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করত যে ঠিকমতো সাম্রাজ্য চালাতে হলে প্রজাদের ভাষা ও সংস্কৃতি খুব ভালোভাবে জানতে হবে। ভারতে আসা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কলকাতা কলেজে তিন বছর ধরে পড়াশোনা করতে হতো। সেখানে তাঁরা ইংরেজ আইনের পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলিম আইন শিখতেন, গ্রিক আর ল্যাটিন ভাষার সাথে সাথে সংস্কৃত, উর্দু আর ফারসি শিখতেন, গণিত, অর্থনীতি আর ভূগোলের সাথে শিখতেন তামিল, বাংলা আর ভারতীয় রীতিনীতি। ভারতীয় ভাষাগুলোর ব্যাকরণ শেখার জন্যও এই ভাষাশিক্ষা অনেক কাজে লাগত।
এই উইলিয়াম জোনস আর হেনরি রলিনসনের মতো মানুষদের কাজের জন্যই ইউরোপের শাসকেরা তাদের বিস্তৃত সাম্রাজ্যকে খুব ভালোভাবে জানতে পেরেছিল। অনেক ব্যাপারে তারা আগের শাসক, এমনকি স্থানীয় মানুষের থেকেও বেশি জানত। জ্ঞানের প্রত্যক্ষ সুফল তারা পেয়েছিল। এই জ্ঞান না থাকলে অল্প কিছু ব্রিটিশের পক্ষে কোটি কোটি মানুষের ভারতকে দুইশ বছর ধরে শাসন করা কিছুতেই সম্ভব হতো না। ঊনবিংশ শতকের পুরোটা আর বিংশ শতকের শুরুর দিক জুড়ে এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ৫ হাজারেরও কম। সৈন্য ছিল ৪০ থেকে ৭০ হাজার, আর ব্যবসায়ী, পরিদর্শক আর তাদের স্ত্রী ও সন্তান মিলে ছিল এক লাখের মতো। আর এই মানুষগুলোই শাসন করেছে ভারতের প্রায় ৩০ কোটি মানুষকে।৯
ইউরোপীয় সাম্রাজ্য যে শুধু শাসনের সুবিধার জন্যই ভাষাবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ভূগোল আর ইতিহাস গবেষণায় টাকা ঢেলেছে- তা কিন্তু নয়। বরং এইসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা তাদের সাম্রাজ্যবিস্তারের পেছনে আদর্শগত সমর্থন দিত। আধুনিক ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করত, নতুন জ্ঞান অর্জন করাটা সবসময়ই ভালো কাজ। এই সাম্রাজ্য থেকে যে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জ্ঞান আসছে, এটাই ছিল তাদের প্রগতিশীলতার পরিচায়ক। আজও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ইতিহাসে দেখা যায়, বিজ্ঞানের অগ্রগতির পেছনে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পরোক্ষ হলেও অবদান আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের করুণ পরিণতির কথা নেই, কিন্তু জেমস কুক আর জোসেফ ব্যাঙ্কসের প্রশস্তি আছে ঠিকই।
এ ছাড়াও, সবসময় বাস্তবে না হলেও অন্তত কাগজে কলমে দেখানো যায়, সাম্রাজ্যবিস্তারের সাথে আসা নতুন জ্ঞান নতুন প্রজাদের মধ্যে ‘প্রগতি’ সঞ্চার করেছিল। এই প্রজারা পেয়েছে উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা, দেশে রেললাইন বসেছে, খাল খনন করা হয়েছে, সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সাম্রাজ্যবাদী মানুষেরা অনেক সময় এটাও দাবি করে যে, তাদের এই সাম্রাজ্যবিস্তার শুধু দখল করা আর নিজেদের লাভের জন্য নয়, বরং ইউরোপের বাইরের মানুষকে অগ্রগতি এনে দেওয়ার এক নিঃস্বার্থ অভিযান। এ নিয়ে রাডইয়ার্ড কিপলিংএর (Rudyard Kipling) একটা কবিতা আছে ‘সাদা মানুষের বোঝা’ (The White Man’s burden) নামে-
Take up the White Man’s burden –
Send forth the best ye breed –
Go bind your sons to exile
To serve your captives’ need;
To wait in heavy harness,
On fluttered folk and wild –
Your new-caught, sullen peoples,
Half-devil and half-child.
বাস্তবতা কিন্তু অন্য কথা বলে। ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ ছিল বাংলা। ১৭৬৪ সালে ব্রিটিশরা বাংলা দখল করে। বাংলার এই নতুন শাসকেরা লুটপাট ছাড়া আর তেমন কোনো দিকেই মনোযোগ দেয়নি। তারা এমন একটা অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করে যার ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এখানে দুর্ভিক্ষ লেগে যায় (The Great Bengal Famine)। ১৭৬৯ এ শুরু হওয়া এই দুর্ভিক্ষ ১৭৭০ এ চরমে পৌঁছায়, চলতে থাকে ১৭৭৩ পর্যন্ত। এই কয়েক বছরে বাংলার প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায়, যা ছিল বাংলার সম্পূর্ণ জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ।১০
এই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সাথে শোষণ ও অত্যাচার কিংবা মহিমান্বিত ‘সাদা মানুষের বোঝা’- যেটাই বলা হোক, কোনোটাই পুরোপুরি মেলে না। আসলে ইউরোপের মানুষ এত বেশি জায়গা দখল করেছে যে তাদের সম্পর্কে যে যাই বলুক তা কিছুটা হলেও খাটে। কেউ যদি বলতে চায় এই সাম্রাজ্যবাদ সারা পৃথিবীতে কেবল অত্যাচার, অবিচার আর মৃত্যুই ছড়িয়ে দিয়েছে, তাহলে তাদের সমস্ত অপরাধের বিবরণ দিয়ে মোটা মোটা বইয়ের পাতা ভরিয়ে ফেলা যাবে। আবার কেউ যদি বলে এই সাম্রাজ্যবিস্তারের কারণেই তাদের প্রজারা উন্নত চিকিৎসা, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আর নিরাপদ জীবন পেয়েছে, তাহলে সেটা নিয়েও অনেক অনেক বই লিখে ফেলা যায়। বিজ্ঞানকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য অপরিমেয় ক্ষমতার অধিকারী হয়। এই ক্ষমতা দিয়ে তারা পৃথিবীকে এতটাই বদলে দিয়েছে যে তাদেরকে সরাসরি ভালো কিংবা খারাপ কোনোটাই বলার উপায় নেই। আজকের পৃথিবীকে আমরা যেভাবে জানি আর যেসব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তার বিচার করি- তার সবকিছু এই সাম্রাজ্য অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছে।
কিন্তু বিজ্ঞানকে যে সবসময় ভালো কাজেই ব্যবহার করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। অনেক জীববিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ, এমনকি ভাষাবিদও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, ইউরোপীয়রাই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জাতের মানুষ, তাই তারা যদি বাকি পৃথিবী শাসন করে তাহলে সেটা ভুল কিছু নয়। উইলিয়াম জোনস যখন বললেন সব ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষারই উৎপত্তি হয়েছে কোনো একটা প্রাচীন ভাষা থেকে, তখন এ বিষয়ের অনেক বিজ্ঞানীই সেই ভাষাভাষী মানুষের ব্যাপারে উৎসাহী হন। তাঁরা দেখলেন প্রাচীন সংস্কৃতে কথা বলা মানুষেরা মধ্য এশিয়া থেকে এসে তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে ভারত আক্রমণ করে। এই মানুষেরা নিজেদেরকে বলত ‘আর্য’ (Arya)। আবার প্রাচীন ফারসি ভাষাভাষী লোকেরাও নিজেদের বলত ‘আইরিয়া’ (Airiia)। এসব দেখে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা ধারণা করলেন, যে প্রাথমিক ভাষা থেকে এই দুটো প্রাচীন ভাষার (এবং সাথে গ্রিক, ল্যাটিন, গথিক আর কেল্টিক ভাষারও) উৎপত্তি হয়েছে, সেই ভাষায় যারা কথা বলত, তারাই নিশ্চয়ই আর্য। এমন কি হতে পারে, যে সেই আর্যদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে ভারতীয়, পারস্য, গ্রিক আর রোমান সভ্যতা?
