বৈজ্ঞানিক বিষয়ে ব্রিটিশদের কৌতূহলের আরেকটা উদাহরণ হল তাদের কুনিফর্ম (Cuneiform) লিপির অর্থোদ্ধার। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৩ হাজার বছর ধরে এই লিখন-পদ্ধতি চলেছে, কিন্তু এই ভাষা পড়তে পারার মতো সর্বশেষ মানুষটিও মারা যায় খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে। এরপর থেকে ওই এলাকার মানুষেরা নানান জায়গায় এই লেখা দেখেছে- বড় বড় সৌধে, প্রস্তরফলকে কিংবা ভাঙা কোনো মাটির পাত্রের গায়ে। কিন্তু এইসব বিচিত্র চিহ্নের মধ্য দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা যে কী বলতে চেয়েছে, তা তাদের কেউ পড়তে পারেনি, বা বলা ভালো পড়ে দেখার চেষ্টাই করেনি। ১৬১৮ সালে এইসব লেখা ব্রিটিশদের নজরে আসে। পারস্যে থাকা স্প্যানিশ দূত যখন পার্সিপোলিসের (Persepolis) প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে যান, তখন এই চিহ্নগুলো তাঁর চোখে পড়ে। এগুলোর অর্থ কী, সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার মতো কাউকে পেলেন না তিনি। এই খবর ইউরোপীয় পণ্ডিতদের কানে গেলে তাঁরা কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। তাঁরা ১৬৫৭ সালে পার্সিপোলিসের কুনিফর্ম লিপির একটা লেখা প্রকাশ করেন। এরপর আরও অনেক লেখাই প্রকাশিত হয়, কিন্তু দুইশ বছর ধরে পশ্চিমা পণ্ডিতেরা অনেক চেষ্টা করেও সেগুলোর অর্থ বের করতে ব্যর্থ হন।
১৮৩০ এর দশকে পারস্যের শাহকে তাঁর সৈন্যদের ইউরোপীয় কায়দায় প্রশিক্ষণ দিতে হেনরি রলিনসন (Henry Rawlinson) নামক এক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা আসেন। অবসর সময়ে তিনি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন। একদিন তিনি কয়েকজন গাইডকে সাথে নিয়ে জাগরোস (Zagros) পর্বতশ্রেণী দেখতে যান। সেখানেই তিনি দেখেন বেহিস্তুনের বিরাট শিলালিপি (Behistun Inscription)। পনের মিটার লম্বা আর পঁচিশ মিটার চওড়া এই প্রস্তরফলকটি ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে রাজা প্রথম দারিউসের (Darius I) নির্দেশে এক উঁচু পাহাড়ের একপাশে খোদাই করা হয়। ওটাতে কুনিফর্ম লিপিতে তিন ভাষার লেখা ছিল- প্রাচীন পারসিক ভাষা, এলামাইট (Elamite) আর ব্যাবিলনীয় ভাষা। ওখানকার সব মানুষই ওটার কথা জানত, কিন্তু কেউই ওটা পড়তে পারত না। রলিনসন বুঝলেন, ওই লেখাটার পাঠোদ্ধার করতে পারলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যত লেখা আবিষ্কৃত হয়েছে, তার সবগুলোই বোঝা যাবে। একটা হারানো জগতের দরজা খুলে দিতে পারে এই লেখাটা।
কাজের প্রথম ধাপ ছিল ওই লেখাটার হুবহু অনুলিপি তৈরি করে ইউরোপে পাঠানো। রলিনসন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সেই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে কাজটা করেন। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজন লোকও তাঁকে সাহায্য করে। একটা কুর্দি ছেলে সবচেয়ে উপরের সবচেয়ে দুর্গম জায়গার লেখাটা লিখে নিয়ে আসে। ১৮৪৭ সালে এই কাজ শেষ হয়। পুরো লেখাটার একটা নিখুঁত অনুলিপি পাঠানো হয় ইউরোপে।
এটুকু করেই রলিনসন কিন্তু বসে থাকেননি। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য তো ছিলই, কিন্তু তার মধ্যেও তিনি এই লেখার জন্য নিয়মিত সময় দিতেন। বিভিন্নভাবে তিনি এই লেখার অর্থ বের করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাচীন পারসিক লিপির অর্থ বের করতে সমর্থ হন। প্রাচীন পারসিক লিপি আধুনিক লিপির খুব কাছাকাছি, রলিনসনও সেটা জানতেন, তাই এই পদ্ধতিটাই ছিল সবচেয়ে সহজ। লেখার একটা অংশের অর্থ জেনে যাওয়ার কারণে এলামাইট আর ব্যাবিলিনীয় লিপির অর্থ বের করার উপায় পেয়ে গেলেন তিনি। সেই হারানো জগতের দরজা শেষমেশ খুলল। সে দরজার ওপাশ থেকে সুমেরীয় বাজারের হাঁকডাক, রাজা-রাজড়াদের আদেশ-নির্দেশ, রাজকর্মচারীদের তর্কবিতর্ক- সব এক এক করে সামনে এসে হাজির হল। রলিনসন কিন্তু বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন রাজকর্মচারী। অথচ তাঁরই কৌতূহল ও চেষ্টার কারণে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অজানা তথ্য পৃথিবীর মানুষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে গেল।
এরকম আরেক রাজকর্মচারী পণ্ডিত ছিলেন উইলিয়াম জোনস (William Jones)। ১৭৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসার পর থেকে তিনি বাংলার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভারত তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে আসার ছয় মাসের মধ্যে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থাটির কাজ ছিল এশিয়ার, বিশেষ করে ভারতের সংস্কৃতি, ইতিহাস আর সমাজব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করা। মাত্র দুই বছরের মধ্যে জোনস সংস্কৃত ভাষার উপর তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো প্রকাশ করেন। এটাকেই তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের (Comparative Linguistics) এর সূচনা বলা যায়।
জোনস তাঁর লেখায় প্রাচীন ভারতের পবিত্র ভাষা সংস্কৃতের সাথে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষার কিছু বিস্ময়কর মিল তুলে ধরেন। সংস্কৃতে ‘মা’কে বলা হয় ‘মাতা’, ল্যাটিন ভাষায় সেটা ‘মাতের’ (mater) আর প্রাচীন কেল্টিক ভাষায় ‘মাথির’ (mathir)। এসব মিল খেকে জোনস ধারণা করেন যে পৃথিবীতে প্রচলিত সবগুলো ভাষারই উদ্ভব হয়েছে অধুনালুপ্ত একটা ভাষা থেকে। পরবর্তীতে এই ভাষাগুলোকে একসাথে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমষ্টি নাম দেওয়া হয়।
জোনস যে এরকম একটা বড়সড় ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন, এটাই কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান নয়। বরং দুটো ভাষার তুলনা করতে তিনি যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতেন, সেগুলো পরবর্তীতে ভাষা গবেষণায় সারা পৃথিবীর ভাষাবিদদের অনেক সাহায্য করেছে।
