শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকার মনোভাবের জন্যই আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের এই চড়া মূল্য দিতে হল। এশিয়ার যত বড় বড় সাম্রাজ্য ছিল- অটোমান, সাফাভিদ, মুঘল আর চীন- সবাই দ্রুতই জানতে পারে যে ইউরোপের মানুষ অনেক বড় বড় আবিষ্কার করে ফেলছে। তারপরেও তারা সেসবে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তখনও তারা ভাবত এশিয়াই পৃথিবীর সবকিছু। আমেরিকা মহাদেশ বা প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের দখল নিতে তারা ইউরোপের সাথে পাল্লা দিতে যায়নি। ইউরোপের পুঁচকে দেশ স্কটল্যান্ড আর ডেনমার্কের মানুষও আমেরিকায় দুয়েকটা অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু এশিয়ার বড় বড় তিনটা সাম্রাজ্যের একটাও ওদিকে যায়নি- আবিষ্কার করতেও না, দখল করতেও না। ইউরোপের বাইরে আমেরিকায় প্রথম সামরিক অভিযানটা শুরু করে জাপান। ১৯৪২ সালের জুনে জাপানের একটা নৌবহর আলাস্কার উপকূলের দুটো ছোট ছোট দ্বীপ কিস্কা আর আতু (Kiska and Attu) দখল করে। সে অভিযানে তারা বন্দী করে দশজন আমেরিকান সেনা আর একটা কুকুরকে। ওখানেই শেষ- আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের দিকে জাপান আর এগোয়নি।
অটোমান আর চীন যে অনেক দূরবর্তী রাজ্য ছিল, কিংবা প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক আর সামরিক দিকে থেকে তারা পিছিয়ে ছিল- এমন কিন্তু নয়। ১৪২০ এর দিকে ঝেং হে যে পরিমাণ সম্পদ নিয়ে চীন থেকে আফ্রিকায় গেছিলেন সেটা দিয়ে আমেরিকায়ও পৌঁছানো যেত। কিন্তু সেই ইচ্ছাটুকুই তাদের ছিল না। ১৬০২ সালের আগে চীনের মানচিত্রগুলোতে আমেরিকার নামগন্ধও ছিল না। আর প্রথম যে চীনা মানচিত্রে আমেরিকা দেখা যায়, সেটাও এঁকেছিল ওখানকার ইউরোপীয় মিশনারিরা।
তিনশ বছর ধরে ইউরোপের মানুষ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে আর প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরে নির্বিঘ্নে রাজত্ব করে গেছে। সেখানে বলার মতো যেসব রেষারেষি হতো, সেগুলো হতো ইউরোপের দুটো দেশের মধ্যেই। এতদিন ধরে ইউরোপ যে পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তার ভরসাতেই তারা এরপর এশিয়ার সাম্রাজ্যগুলোকে একে একে জয় করে নিজেরা ভাগাভাগি করে নেয়। অটোমান, পারস্য, ভারত আর চীন সাম্রাজ্যের মানুষ সেদিকে ভালোভাবে মনোযোগ দিতে গিয়ে বুঝতে পারে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বিংশ শতাব্দীর দিকে এসে ইউরোপের বাইরের মানুষ পুরো পৃথিবী সম্পর্কে জানতে শুরু করে। পৃথিবীব্যাপী ইউরোপের আধিপত্য খর্ব হওয়ার এটা অন্যতম প্রধান কারণ। এর ফলেই আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে (১৯৫৪-১৯৬২) আলজেরিয়ার গেরিলারা সংখ্যায়, প্রযুক্তিতে আর অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে থাকার কারণে ফরাসী সৈন্যদের হারিয়ে দেয়। তাদের জয়ের কারণ ছিল অন্যান্য উপনিবেশবিরোধীদের সমর্থন আর গণমাধ্যমে নিজেদেরকে তুলে ধরা। এমনকি ফ্রান্সের মানুষও তাদের সমর্থন দেয়। উত্তর ভিয়েতনামের মতো ছোট একটা দেশেও বিরাট দেশ আমেরিকার পরাজয়ের কারণও ছিল এটাই- নিজেদের দেশের সংগ্রামটাকে পুরো পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। সম্রাট মন্টেজুমাও যদি স্পেনের মানুষকে তাঁদের কথা জানাতে পারতেন আর ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা অটোমান সাম্রাজ্যের সমর্থন আদায় করতে পারতেন, ইতিহাস হয়তো আজ অন্যভাবে লেখা হতো।
বিরল মাকড়সা, হারানো লিপি
আধুনিক বিজ্ঞান আর আধুনিক সাম্রাজ্য- দুটোর পেছনেই আছে একই রকম চিন্তাধারা, জানার সীমানার বাইরে কোথায় কী আছে সেটা জানার অদম্য তাড়না। তাই এ দুটোর সম্পর্ক এত গভীর। শুধু তাড়নাটুকুই নয়, দুটোর কাজের পদ্ধতিও একই রকম। আধুনিক ইউরোপীয়দের জন্য সাম্রাজ্য তৈরি করাটা অনেকটা বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের মতো, আবার বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এক একটা রাষ্ট্রীয় প্রকল্প।
মুসলিমরা যখন ভারত দখল করে, তাদের সাথে কোনো পুরাতত্ত্ববিদ এসে ভারতের ইতিহাস জানতে চায়নি, কোনো নৃতত্ত্ববিদ এসে সেখানকার সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করেনি, নতুন জায়গার মাটির গুণাগুণ দেখতে আসেনি কোনো ভূতত্ত্ববিদ, কিংবা ভারতের জীবজন্তুগুলো কাছে থেকে দেখার জন্য কোনো প্রাণিবিজ্ঞানীও আসেনি। অথচ ব্রিটিশরা যখন ভারত দখল করে, তখন তাদের সাথে এদের প্রত্যেকেই এসেছিল। ১৮০২ সালের ২ এপ্রিলে সারা ভারতব্যাপী জরিপ শুরু হয়। এই জরিপ চলেছিল ৬০ বছর ধরে। হাজার হাজার দেশী শ্রমিক আর বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে তারা সমগ্র ভারতের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করে। এমনকি এভারেস্টসহ হিমালয়ের প্রত্যেকটা পর্বতের উচ্চতাও তারা নির্ণয় করে ফেলে। ব্রিটিশরা ভারতের সামরিক শক্তি আর সোনার খনির খোঁজে যে আগ্রহ নিয়ে সারা ভারত চষে বেড়িয়েছে, ঠিক সমান আগ্রহ নিয়ে তারা খুঁজে বেড়িয়েছে বিরল প্রজাতির মাকড়সার খবর জানতে, প্রজাপতির তালিকা বানাতে, ভারতের বিলুপ্ত হওয়া ভাষাগুলোর মূল খুঁজতে আর মাটি খুঁড়ে প্রাচীন সভ্যতার হারানো নিদর্শন বের করতে।
গাঙ্গেয় উপত্যকার মানবসভ্যতার অন্যতম প্রধান শহর ছিল মহেঞ্জোদারো (Mohenjo-daro)। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তৈরি হওয়া এই শহর ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটিশদের আগে যারা ভারত শাসন করেছে- মৌর্য, গুপ্ত, দিল্লীর সুলতান, এমনকি পরাক্রমশালী মুঘল- কেউই সেসব ধ্বংসস্তূপের দিকে ফিরেও তাকায়নি। ওদিকে ১৯২২ সালের এক জরিপে ব্রিটিশরা সেটা খুঁজে পায়, তারপর ব্রিটিশদেরই একটা দল মাটি খুঁড়ে বের করে আনে ভারতীয় সভ্যতার এই প্রাচীনতম নিদর্শনটি। অথচ ভারতীয়রাই এ কাজে কোনোরকম আগ্রহ দেখায়নি।
