কর্টেজও অ্যাজটেকদের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, কিন্তু তাঁর দল অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। অ্যাজটেকরা এইসব বাইরে থেকে আসা অদ্ভুতদর্শন দুর্গন্ধময় মানুষদের দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কিন্তু স্প্যানিশরা ঠিকই জানত যে সারা পৃথিবীতে আরও নানা জাতের মানুষ আছে। আর নতুন জায়গায় গিয়ে সেখানকার মানুষকে মেরেকেটে জায়গাটা দখল করে নেওয়ার অভিজ্ঞতায় তো তাদের ধারেকাছেও কেউ ছিল না। বিজ্ঞানীদের মতো এইসব হানাদার বাহিনীও নতুন কোনো জায়গায় যেতে একটুও ভয় পেত না।
কর্টেজ যখন ১৫১৯ সালের জুলাইয়ে মেক্সিকো যান, কর্তব্যস্থির করতে তাঁর সময় লাগেনি একটুও। আজকালকার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে যেমন দেখা যায়, বিচিত্র কোনো নভোযান থেকে ভিনগ্রহবাসীরা নেমে এসে বলে, “আমরা কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমাদেরকে তোমাদের নেতার কাছে নিয়ে চল।”, কর্টেজের আগমনও ছিল ঠিক তেমন। তিনি ওখানকার লোকদের বললেন, তিনি স্পেনের রাজার দূত, সম্রাট দ্বিতীয় মন্টেজুমার (Montezuma II) সাথে দেখা করতে চান। (একেবারে নির্লজ্জ মিথ্যে কথা। কর্টেজের অভিযান কোনো রাজার নির্দেশে ছিল না। স্পেনের তখনকার রাজা অ্যাজটেকদের তো দূরের কথা, কর্টেজকেও চিনতেন না।) এরপর কর্টেজকে পথপ্রদর্শক, খাবার আর সৈন্যপ্রহরা- সবই দেওয়া হল। তিনি নিশ্চিন্তে চলে গেলেন অ্যাজটেকদের রাজধানী টেনোকটিটলানে (Tenochtitlan)।
অ্যাজটেকরা এই নবাগতদের যথাযোগ্য মর্যাদাসহকারে রাজধানী পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে সম্রাট মন্টেজুমার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিল। সেই সাক্ষাতের এক পর্যায়ে কর্টেজের ইশারায় তার সহযোগীরা সম্রাটের দেহরক্ষীদের হত্যা করে। তাদের ইস্পাতের অস্ত্রের সামনে কাঠ আর পাথরের অস্ত্রধারী সৈনিকেরা কিছুই করতে পারেনি। ফলে খুব সহজেই অতিথি জিম্মি করে ফেলল গৃহকর্তাকে।
অবশ্য কর্টেজের অবস্থাও তখন বেশ নাজুক। সম্রাটকে তিনি জিম্মি করেছেন বটে, কিন্তু চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে আছে হাজার হাজার শত্রুসৈন্য আর লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ জনতা। আর এই অজানা অচেনা দেশে তাঁর সম্বল মাত্র কয়েকশ মানুষ। সবচেয়ে কাছের স্প্যানিশ উপনিবেশও কিউবাতে, দেড় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।
কর্টেজ মন্টেজুমাকে তাঁর প্রাসাদেই বন্দী করে রাখেন, দেখে মনে হয় সম্রাট সম্রাটের মতোই আছেন, আর এই ‘স্প্যানিশ দূত’ আছেন তাঁর অতিথি হয়ে। অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের সব ক্ষমতার মূলে ছিলেন সম্রাট, এই পরিস্থিতিতে সেটা বেশ নড়বড়ে হয়ে গেল। মন্টেজুমা সম্রাটের মতোই কাজ করতে লাগলেন, আর সমাজের অভিজাত লোকেরাও তাঁর অনুগত হয়েই রইল। এর অর্থ হল, তাদের আনুগত্যটা আসলে কর্টেজের প্রতিও ছিল। এই অবস্থা চলল কয়েক মাস। এই সময়ে কর্টেজ মন্টেজুমা আর তাঁর কর্মচারীদের জেরা করে অনেক কিছু জানলেন, কয়েকজনকে অ্যাজটেকদের ভাষা শিখিয়ে দোভাষী বানিয়ে ফেললেন আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের কোথায় কী আছে সেটা আরও ভালো করে জানতে চারদিকে লোক পাঠালেন।
একসময় অ্যাজটেকদের অভিজাত সমাজ বিদ্রোহ করে, মন্টেজুমা আর কর্টেজ দুজনের বিরুদ্ধেই। তারা একজন নতুন সম্রাট নির্বাচন করে, আর স্প্যানিশদের টেনোকটিটলান থেকে হটিয়ে দেয়। কিন্তু ততদিনে শাসনব্যবস্থায় ফাটল ধরে গেছে। কর্টেজ সেটারই সুযোগ নিলেন। তিনি অ্যাজটেকদের ভিতরে বিভেদ তৈরি করতে থাকেন। তিনি রাজ্যের অনেক প্রজাকেই দলে ভিড়িয়ে ফেলেন। এখানেই তারা একটা বড় ভুল করে বসে। প্রজাদের অনেকেই শাসকদের অপছন্দ করত, কিন্তু ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোতে স্প্যানিশরা এর আগে কী করে এসেছে সেই খবর তো তারা রাখত না। তাই তাদের অনেকেই ভাবল, স্প্যানিশদের সাহায্য নিয়ে এবার তারা অ্যাজটেক শাসন থেকে মুক্তি পাবে। ফাঁকতালে স্প্যানিশরাও যে দেশটা দখল করে ফেলতে পারে- এটা তাদের মাথায়ই আসেনি। তারা ভেবেছিল কর্টেজের তো লোকজন বেশি নেই, তারা যদি পরে উল্টোপাল্টা কিছু করেও বসে, তাহলেও তাদের সহজেই শায়েস্তা করে ফেলা যাবে। এই বিদ্রোহী জনতাকে সাথে নিয়ে কর্টেজ পেয়ে গেলেন একটা বিরাট সেনাবাহিনী। সেই বাহিনীকে সাথে নিয়ে কর্টেজ টেনোকটিটলান শহরটা দখল করে নিলেন।
এর মধ্যে প্রচুর স্প্যানিশ সৈন্য আর দখলদার মানুষ মেক্সিকোতে এসে পড়ে- কেউ কিউবা থেকে, আবার কেউ সেই স্পেন থেকেই। লোকজন যখন ব্যাপারটা ধরতে পারল, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই কর্টেজের ভেরা ক্রুজে আগমনের দিন থেকে একশ বছরের মধ্যেই সেখানকার আদি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই শেষ হয়ে গেল। এর প্রধান কারণ ছিল স্প্যানিশদের সাথে আসা নতুন কিছু রোগব্যাধি। আর যারা টিকে ছিল, তাদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। এর চেয়ে অ্যাজটেক শাসনের সময়েই তারা আরও ভালোভাবে বেঁচে ছিল।
কর্টেজের মেক্সিকো যাওয়ার দশ বছর পর পিজারো ইনকা সাম্রাজ্যে পৌঁছান। তাঁর সৈন্যসংখ্যা ছিল কর্টেজের চেয়েও কম- মাত্র ১৬৮ জন। কিন্তু তাতে কী, পিজারোর সাথে ছিল আগের সব অভিযানের অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা। ওদিকে ইনকারা অ্যাজটেকদের পরিণতির কথা কিছুই জানত না। পিজারো পুরোপুরি কর্টেজের দেখানো পথেই চললেন। প্রথমে নিজের পরিচয় দিলেন স্পেনের দূত হিসেবে, সম্রাট আটাহুয়ালপাকে (Atahualpa) আমন্ত্রণ জানালেন, তারপর তাঁকে আটকে রাখলেন। তারপর পিজারো সেই ভঙ্গুর সাম্রাজ্যের কিছু মানুষকে দলে ভেড়ালেন, তারপর পুরো দেশটাই দখল করে নিলেন। অথচ ইনকারা যদি একটুও অ্যাজটেকদের খবর রাখত, তাহলে কিছুতেই তারা নিজেদের ভাগ্য পিজারোর হাতে সঁপে দিত না।
