ঝেং হের অভিযান দেখে বোঝা যায়, তাক লাগানোর মতো প্রযুক্তি কেবল ইউরোপীয়দের একারই ছিল না। কিন্তু তাদের নতুন জায়গা আবিষ্কার আর জয় করার যে অদম্য স্পৃহা ছিল সেটাই তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। রোমানদের ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তারা কখনও ভারত কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়া দখল করতে যায়নি। পারস্যের মানুষও যায়নি স্পেন বা মাদাগাস্কার দখল করতে। চীনের শাসকেরা সবচেয়ে কাছের দেশ জাপানের দিকেও হাত বাড়ায়নি। কিন্তু সেটা তো অস্বাভাবিক কিছু না। অস্বাভাবিক এটাই যে ইউরোপের মানুষকে দূরের অজানা সব দেশে যাওয়ার নেশায় পেয়ে বসেছিল। তাই তারা সম্পূর্ণ অজানা কোনো দেশে, অচেনা মানুষ আর রীতিনীতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় বলত, “আজ থেকে এটা আমার রাজার দেশ!”

বাইরের আক্রমণ
১৫১৭ সালের দিকে ক্যারিবিয়ান সাগরে একটা কানাঘুষা শুরু হল- মেক্সিকোর মাঝামাঝি জায়গায় নাকি একটা শক্তিশালী রাজ্য আছে। ক্যারিবিয়ান সাগরে বিচরণরত স্প্যানিশ দখলদারদের কানেও গেল কথাটা। এর বছর চারেকের মধ্যেই দেখা গেল, অ্যাজটেকদের (Aztec) রাজধানীটা একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। অ্যাজটেক সাম্রাজ্য হয়ে গেল অতীতের কথা, সেই জায়গায় হার্নান কর্টেজের (Hernán Cortés) প্রতিষ্ঠিত স্প্যানিশ রাজ্যটাই হয়ে গেল বর্তমান।
রাজ্যটা জয় করে স্প্যানিশরা নিজেরদের পিঠটা একটু চাপড়ে দিতেও সময় নষ্ট করেনি। এখান থেকেই তারা সব দিকে ‘আবিষ্কার ও জয়ের’ অভিযান শুরু করে। মধ্য আমেরিকায় এতদিন যারা ছিল, অর্থাৎ অ্যাজটেক, টোলটেক (Toltecs) বা মায়ারা (Maya) – তারা কেউ জানতোই না যে তাদের দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ আমেরিকা বলে কিছু একটা আছে, সেদিকে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। দুই হাজার বছর ধরে ওই জায়গাতে তাদের বাস, অথচ তাদের কেউ দক্ষিণ দিকে পা বাড়ায়নি। এদিকে স্প্যানিশদের মেক্সিকো জয়ের মাত্র দশ বছরের মধ্যেই ফ্রান্সিসকো পিজারো (Francisco Pizarro) ইনকা সভ্যতা (Inca Empire) আবিষ্কার করে ফেলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ইনকা সভ্যতা ১৫৩২ সালের মধ্যে বিলুপ্ত হয়।
এই অ্যাজটেক আর ইনকারা যদি নিজেদের দেশ ছেড়ে একটু বাইরে বের হতো, যদি জানতে পারত স্প্যানিশরা তাদের উত্তরের এলাকাটা কীভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে, তাহলে হয়ত আজ ইতিহাস অন্যরকম হতো। হয়ত তারা স্প্যানিশদের আক্রমণটা ঠেকিয়েও দিতে পারত। কলম্বাস প্রথম আমেরিকা যান ১৪৯২ সালে। আর হার্নান কর্টেজ মেক্সিকো যান ১৫১৯ এ। এই সময়ের মধ্যে স্প্যানিশরা ক্যারিবীয় সাগরের অধিকাংশ দ্বীপ দখল করে নেয়। ওইসব দ্বীপে থাকা আদিবাসীদের জন্য জীবনটা নরক হয়ে উঠেছিল। দখলদার লোভী মানুষেরা তাদের জোর করে খনি আর ক্ষেতখামারে কাজ করতে বাধ্য করে। কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই তাকে খুন করে ফেলা হতো। এই প্রচণ্ড পরিশ্রম, অত্যাচার আর বাইরের নাবিকদের সাথে আসা নানা রকম রোগের কারণে সেসব জায়গার অধিকাংশ আদিবাসী মানুষই মারা যায়। বিশ বছরের মধ্যে ওখানকার আদিবাসী মানুষেরা একেবারে শেষ হয়ে যায়। তাদের শুন্যস্থান পূরণ করতে স্প্যানিশরা আফ্রিকা থেকে দাস আনতে শুরু করে।
এই গণহত্যা কিন্তু চলছিল অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের একেবারে দোরগোড়ায়। অথচ কর্টেজ অ্যাজটেক রাজ্যের পূর্ব উপকূলে হাজির হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সেটা টেরই পায়নি। আজকাল মাঝেমধ্যে যেসব ভিনগ্রহের প্রাণীর আগমনের গল্প শোনা যায়, অ্যাজটেকদের কাছে স্প্যানিশদের আগমনটা ছিল অনেকটা সেরকম। অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করত তারা পুরো পৃথিবীটা দেখে ফেলেছে, আর তাদের রাজ্যটাই হল সম্পূর্ণ পৃথিবী, এর বাইরে আর কিছু নেই। আজ আমরা যে জায়গাটাকে ভেরা ক্রুজ (Vera Cruz) বলি, কর্টেজ সেইখানে এসে হাজির হলে অ্যাজটেকরা প্রথম বাইরের মানুষ দেখে।
কী করতে হবে এটাই অ্যাজটেকরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি। এই নতুন আসা মানুষগুলো তাদের ভীষণ বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এরা সবাই মানুষের মতোই দেখতে, অথচ এদের গায়ের রঙ সাদা। সবার মুখে প্রচুর গোঁফদাড়ি। কারো কারো চুলের রঙ আবার সোনালি। আর প্রত্যেকের গায়ে ভয়াবহ দুর্গন্ধ। তখন স্প্যানিশদের চেয়ে অ্যাজটেকদের অবস্থা অনেক স্বাস্থ্যকর ছিল। প্রথম প্রথম স্প্যানিশরা যেখানেই যেত, আদিবাসীরা তাদের সাথে ধূপ জ্বালিয়ে নিয়ে যেত। সেটা দেখে স্প্যানিশরা ভাবত তাদের দেবতা ভেবে সম্মান দেখানো হচ্ছে। কিন্তু পরে অ্যাজটেকদের কিছু লেখা থেকে জানা যায়, তারা আসলে এটা করত দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচার জন্য।
এই বহিরাগতদের ব্যবহার্য সামগ্রী ছিল আরও বিচিত্র। তারা যেসব জাহাজে চড়ে এসেছিল, অ্যাজটেকরা অত বড় জাহাজ দেখেইনি কোনোদিন। তারা বড় বড় দ্রুতগামী জন্তুর পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের হাতের ধাতব লাঠিগুলো থেকে বজ্র বের হত। তাদের হাতে ছিল লম্বা লম্বা তরবারি আর গায়ে ছিল কঠিন সব বর্ম। আজটেকদের কাঠের তলোয়ার আর পাথরের বর্শা তাতে আঁচড়ও কাটতে পারত না।
অ্যাজটেকদের কেউ কেউ ভাবত এরা বোধহয় দেবতা। আবার কেউ বলত দেবতা নয়, এরা শয়তান, ভূত কিংবা জাদুকর। স্প্যানিশদের নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ না করে তারা বরং আপোষে যাওয়ার চেষ্টা করল। তারা ভেবেছিল, কর্টেজের দলে আছে বড়জোর সাড়ে পাঁচশ লোক। এই লাখ লাখ মানুষের দেশে এরা আর কীই বা এমন করবে?